প্রস্তাবিত মনোরেল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৫ ১৬:২১ পিএম
দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতে রেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাহিদাকে সামনে রেখে গত এক দশকে এই খাতে অব্যাহতভাবে বেড়েছে বিনিয়োগও। বর্তমানে দেশে রেলওয়ে খাতে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। এরই মধ্যে সম্পন্ন হলো পদ্মা সেতু রেল, যমুনা রেল সেতু ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বড় বাজেটের রেল সংযোগ প্রকল্প। এসব প্রকল্প দেশে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে উন্মোচন করেছে নতুন দিগন্ত। এমন এক বাস্তবতায়, রেলের ক্ষেত্রে আরও একটি সুখবর পাওয়া গেল। চট্টগ্রাম নগরীতে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিন লেনের মনোরেল (উঁচুতে চলা এক চাকার ট্রেন) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। রবিবার নগরীর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে জার্মানির প্রতিষ্ঠান ওরাসকম এবং মিসরের প্রতিষ্ঠান আরব কন্ট্রাক্টর গ্রুপ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার গেটওয়ে খ্যাত এই নগরীর যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় ভিন্নমাত্রা সংযোজন করবে। আমরা মনে করি, চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও টেকসই নগরীতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে মনোরেল প্রকল্প প্রস্তাবনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘চট্টগ্রামে হচ্ছে দেশের প্রথম মনোরেল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগ করা হবে এনএএস ইনভেস্টমেন্ট ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইজিপ্টের মাধ্যমে। প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্য তিনটি রুট বিবেচনা করা হচ্ছে। এগুলো কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার (বহদ্দারহাট, চকবাজার, লালখান বাজার, দেওয়ানহাট ও পতেঙ্গা)। সিটিগেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান চত্বর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার (একেখান, নিমতলী, সদরঘাট ও ফিরিঙ্গি বাজার)। অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গি বাজার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার (মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, আন্দরকিল্লা ও কোতোয়ালি)। প্রথমে প্রতিষ্ঠান দুটি নগরীতে ফিজিবিলিটি স্টাডি করবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করতে অন্তত ৯ মাস থেকে ১ বছর লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। তিনটি দেশের অর্থায়ন ও সমন্বয়ে তৈরি করা হবে প্রকল্পটি। ৩২ থেকে ৩৩টি স্টেশনসহ তিনটি রুটে বিস্তৃত হবে মনোরেল। এতে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটেই পুরো শহর ঘুরে দেখা যাবে। তবে এতে শুধু লজিস্টিক সাপোর্ট ও ভূমি দেবে সিটি করপোরেশন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে প্রায় ৫৪.৫ কিলোমিটার মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছিল, তবে তা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান চসিককে মনোরেল প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। এখন সিটি করপোরেশন মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে।
মনোরেল সাধারণত উঁচু ট্র্যাকের ওপর দিয়ে ছোট ট্রেনে যাত্রী পরিবহন করে, যা শহরের ভূমি ব্যবহার কমায় এবং ট্র্যাফিক জট এড়িয়ে চলাচল নিশ্চিত করে। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এই মনোরেল দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের একটি আধুনিক সেতুবন্ধ তৈরি করবে। আমার একের পর এক চেষ্টার মধ্যে ছিলÑ এই শহরটাকে কীভাবে সুন্দর ও পরিকল্পিত করা যায়। কীভাবে ট্রাফিক জ্যাম কমানো যায়। আমরা ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়, স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম চালু, নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণসহ অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। তবে মনোরেল এই সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর সমাধান হবে। তিনি বলেন, আমরা চট্টগ্রামকে একটি ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ কাঠামোতে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই। এই মনোরেল প্রকল্প তা বাস্তবায়নের পথে আমাদের অনেক এগিয়ে দেবে।
এ কথা সত্য যে, দেশের যোগাযোগ খাত আজ উন্নয়নের শিখরে। তবে এই সন্তুষ্টিতে থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। দেশের যোগাযোগ খাত যেন বিশ্বের কাছে রোল মডেল হতে পারে সে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে রেল খাতে বড় বড় প্রকল্পের কমতি নেই। এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিঃসন্দেহে দেশের সড়কনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার বিপরীতে বিকল্প সুযোগ খুলে দিচ্ছে। অর্থাৎ যোগাযোগব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দেশেরে ৬৪ জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের কাজ চলমান রয়েছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, এখন দেশের ৪৯টি জেলায় রেল সংযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় মেট্রোরেলের মাধ্যমে আধুনিক যোগাযোগের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে ভ্রমণকারীদের কাছে এটি এখন বেশ জনপ্রিয়।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। এই নগরজীবনে এখনও অনেকের দিনটা শুরু হয় যানজট ঠেলে। আবার দিন শেষেও সেই ক্লান্তিকর ঠেলাঠেলি-ভিড়ভাট্টা পাশ কাটিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। বলা চলে, এখানকার যানজট ও পরিবহন সংকট ক্রমবর্ধমান। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মনোরেল একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে। আমরা মনে করি, প্রকল্পটি শুধু যানজট নিরসনেই নয়, বরং চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশ, পর্যটন ও ব্যবসাবান্ধব নগরীতে রূপান্তর করার দিকে এগিয়ে নেবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজধানী ঢাকার আশীর্বাদ যেমন মেট্রোরেল তেমনি চট্টগ্রামের আশীর্বাদ হয়ে উঠুক প্রস্তাবিত মনোরেল। নগরবাসীর ভোগান্তি কমানোর এই প্রকল্প সফল হোক– এটাই প্রত্যাশা।