× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কোরবানির পশু

কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে গবাদিপশু পালনে

ড. জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৫ ১৬:১১ পিএম

ড. জাহাঙ্গীর আলম

ড. জাহাঙ্গীর আলম

সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা, কোরবানির ঈদ। বাংলাদেশে সারা বছর যত পশু জবাই হয়, তার প্রায় অর্ধেক জবাই হয় কোরবানির ঈদে। ২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে জবাই করা হয়েছিল এক কোটি চার লাখ আট হাজার ৯১৮টি পশু। এর মধ্যে ছিল ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৯টি গরু, এক লাখ ১২ হাজার ৯১৮টি মহিষ, ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৯টি ছাগল, চার লাখ ৭১ হাজার ১৪৯টি ভেড়া এবং এক হাজার ২৭৩টি অন্যান্য পশু (উট, হরিণ ইত্যাদি)।

২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কোরবানি করা পশুর সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৬৭ হাজার ১০৬টি বা ৩.৬৬ শতাংশ বেশি। এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় এক কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি পশু। এ বছর ৫ শতাংশ হারে চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা ধরে নিয়ে পশুর চাহিদা হতে পারে এক কোটি ৯ লাখ ২৯ হাজার ৩৬৪টি পশু। এতে উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ২৫ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৩টি পশু।

করোনা মহামারি ও আর্থিক স্থবিরতার কারণে গত চার বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল কম। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে পশুর মূল্য বেশি হতে পারে। সে কারণে পশু বিক্রি কম হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন খামারিরা। 

২০২৪ সালে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল এক কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি পশু। এবারের জোগান তার চেয়ে পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৩০টি কম। এর প্রধান কারণ বন্যা। গত বছর দেশের ১৬টি জেলায় মারাত্মক বন্যা হয়েছে। এতে গরু-ছাগলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও এবার পশুর মোট জোগান থাকবে চাহিদার তুলনায় বেশি।

বাংলাদেশে মাংসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে গরুর মাংসের দাম ছিল প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। এখন তা ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। সেই সঙ্গে ভেড়া ও খাসির মাংসের দামও বেড়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় গরুর আমদানি হ্রাস পায়। ফলে এদেশে বেড়ে যায় মাংসের দাম। এই সুযোগে দেশে উৎপাদিত গরু মোটাতাজাকরণে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হন। দ্রুত গড়ে ওঠে খামার। এখন মাংসের উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভর, কিন্তু দাম বেশ চড়া। এতে খামারিরা লাভবান হচ্ছেন, কিন্তু তাতে নিরুৎসাহ হচ্ছেন নিম্ন আয়ের অসংখ্য ভোক্তা। এমতাবস্থায় পশুপ্রতি মাংসের উৎপাদন বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট খরচ হ্রাস করা জরুরি। সাধারণত সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে পণ্যের দাম হ্রাস পায়, কিন্তু আমাদের দেশে পশুসম্পদ খাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা মাংসের দাম কমতে দিচ্ছে না। এমতাবস্থায় পশু খামার উন্নয়নে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি গ্রামীণ চিরায়ত কৃষকদের গবাদিপশু পালনে উৎসাহিত করা উচিত।

কোরবানিতে গরুই মানুষের বেশি পছন্দ। সাত নামে ভাগ করা যায়। আবার একাও একটি গরু কোরবানি করা যায়। এবার মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটের কারণে শরিকে কোরবানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। ছাগল ও ভেড়া কোরবানিও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ একজন এক নামে কোরবানি করেন একটি ছোট পশু। এর দাম কম। ২০১৫ সালে মোট ছাগল-ভেড়া বা ছোট পশু কোরবানি হয়েছিল ২৩ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২৪ সালে তা ৫৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৬৮তে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কোরবানি করা পশুর ৪৬ শতাংশ গরু, ১ শতাংশ মহিষ, ৪৮.৫ শতাংশ ছাগল, ০.৪ শতাংশ ভেড়া এবং ০.১ শতাংশ অন্যান্য পশু।

আগে প্রতিটি কৃষক পরিবারে গরু পালন করা হতো। তখন চাষাবাদ হতো লাঙল দিয়ে। এখন এসেছে কলের লাঙল। গরু দিয়ে হালচাষ ও শস্য মাড়াই প্রায় উঠেই গেছে বলা চলে। আগে যেখানে শতকরা ৯০ ভাগ হালচাষ করা হতো লাঙল দিয়ে, এখন সে পরিমাণের বেশি হয় ট্রাক্টর ও টিলার দিয়ে। বাকি অল্প চাষাবাদ হয় পশু ও মানবশক্তির মাধ্যমে। এসব কারণে গ্রামের কৃষকদের অনেকেই চিরায়ত পদ্ধতিতে গরু পালন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা এখনও গরু পালেন, তারা তা করেন মূলত দুধ অথবা মাংসের জন্য। দুগ্ধ খামার গড়ার জন্য বর্তমানে পশু ক্রয়ে স্বল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে দুগ্ধ খামার গড়ার জন্য এগিয়ে এসেছেন অনেক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা। এতে বেড়েছে দুধের উৎপাদন। বকনা তৈরি হচ্ছে মাংস উৎপাদন ও কোরবানির জন্য।

মাংসের জন্য যারা গরু পালেন, তাদের বড় সুযোগ কোরবানির ঈদ। গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা পশু খামার গড়ে তুলেছেন। একজন খামারি গড়ে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ করে উন্নত জাতের একটি বাছুর ক্রয় করেন। তারপর প্রায় এক বছর পর্যন্ত ওই গরুটির পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা খরচ করেন। এটি মোটাতাজাকরণের পর বিক্রি হয় দেড় থেকে তিন লাখ টাকায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি অনুষদের একজন ছাত্রের পিএইচডি থিসিসের বর্ণনায় দেখা যায়, মোটাতাজার জন্য বাছাই করা গরুর বেশিরভাগের বয়স দুই থেকে চার বছর। এগুলো উন্নত জাতের ষাঁড়। এগুলো প্রতিপালন করা হয় নিবিড় পরিচর্যায়। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণের যে প্যাকেজ প্রযুক্তি কৃষকদের জন্য উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে, তা তিন-চার মাসের। মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে প্রতিদিন একটি উন্নত জাতের গরুর ওজন ৭০০ থেকে এক হাজার গ্রাম পর্যন্ত এবং দেশি গরুর ওজন ১০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গরু মোটাতাজাকরণের প্রধান খরচ হলো খাদ্যমূল্য, ওষুধের দাম ও শ্রমিকের মজুরি। এসব খরচ বাদ দিয়ে একজন কৃষক প্রতিটি গরুতে গড়ে নিট লাভ করেন ১৩ হাজার ৩৫০ টাকা।

অনেকের ধারণা, মোটাতাজাকরণে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কয়েক বছর আগে হয়তো তা দেখা যেত কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সম্প্রতি তা আর চোখে পড়ে না। গোখাদ্যে এসব ক্ষতিকর উপকরণ মেশানো প্রতিরোধে এখন ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম পরিবীক্ষণ করছে। এসব নিষিদ্ধ উপকরণ গোখাদ্যে মেশানোর প্রমাণ পেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী মামলা করা যায়। এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ফলে গরু মোটাতাজাকরণে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এখন আর তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। এবার কোরবানির পশুর হাটে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম ও বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে। তারা আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দেবে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে।

কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা এবং তার উপযুক্ত দাম পাওয়া একটি বড় সমস্যা। কয়েক বছর ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়ার মূল্যে বড় ধরনের ধস আমরা লক্ষ করছি। এরও প্রতিকার দরকার। আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের অভ্যন্তরে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করা উচিত। নির্ধারিত মূল্যে যাতে কৃষকদের কাছ থেকে চামড়া ক্রয় করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থের মালিক দরিদ্রজন, এতিম ও মিসকিন। ফলে চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ ও এর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সবারই দায়িত্ব। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মহল চামড়া ক্রয়ে তৎপর। তারা কারসাজি করে অতি অল্প দামে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কিনে অনৈতিক মুনাফা লুটছে। এতে ট্যানারির মালিকদেরও যোগসাজশ থাকতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।

কোরবানির সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক ও চৌরাস্তার মোড়ে ফাঁকা জায়গা পেলেই পশুর হাট বসিয়ে দেওয়া হয়। এতে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়। মানুষের চলাচলে অসুবিধা হয়। তা ছাড়া পশুবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি হয়। এতে পশুর দাম বেড়ে যায়। সম্প্রতি সীমান্তের নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পথে গরু আমদানি করা হচ্ছে বলে খবর আসছে। এটি দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

  • কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা