সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১৬:৫০ পিএম
অর্থনৈতিক সংকট বলতে আমরা সাধারণত বুঝি একটি দেশের অর্থনীতিতে মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, উৎপাদন হ্রাস, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং আর্থিক বাজারের অস্থিতিশীলতা। এর কারণগুলো জটিল এবং বহুবিধ। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা, যেমন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট বা সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারি, বহু দেশকে প্রভাবিত করেছে। কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব-অর্থনীতিতে এক নতুন ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে, যা সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করেছে, মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করেছে এবং অনেক দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করেছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অপর্যাপ্ত সরকারি নীতি, যেমন– অপরিকল্পিত ব্যয়, উচ্চ করের হার বা বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশের অভাবও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা, যেমনÑ ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা বা ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনও কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো এবং অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই সংকটগুলোর সবচেয়ে বড় শিকার হয় তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা সদ্য উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চাইছে। তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট হয়। অর্থনৈতিক মন্দার সময় কোম্পানিগুলো নতুন নিয়োগ কমিয়ে দেয় বা কর্মী ছাঁটাই করে। ফলে বেকারত্বের হার বেড়ে যায়। তরুণদের জন্য, যাদের কাজের অভিজ্ঞতা কম, তাদের জন্য কাজ খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে, যেখানে অভিজ্ঞতার অভাবে তারা কাজ পায় না এবং কাজ না পাওয়ার কারণে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে না।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, তারা তাদের যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হয়। একজন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটকে যদি একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজ করতে হয়, তবে তা তার মেধা এবং দক্ষতার সঠিক ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে। এতে কেবল তার ব্যক্তিগত হতাশা বাড়ে না, বরং দেশের মানবসম্পদেরও অপচয় হয়।
আমাদের সমাজে কেবল চাকরিজীবী তৈরি করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করতে হবে। তাদের সে স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। সরকারের উচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে ইনকিউবেটর এবং এক্সিলারেটর প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে, যা নতুন উদ্যোগগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা করবে। অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তরুণদের জন্য মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা, যাতে তারা ব্যবসা শুরু করার এবং পরিচালনার কৌশল শিখতে পারে, অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই খাতই কর্মসংস্থান সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উৎস। এই খাতকে প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং সহজ আর্থিক সহায়তা দিয়ে শক্তিশালী করা সম্ভব।
সরকারকে অবশ্যই এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক। অবকাঠামো উন্নয়ন, যেমনÑ সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়াও, সবুজ অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে। এর মধ্যে সহজ করনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শ্রম আইনকে আধুনিকায়ন করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
বেকারত্ব বা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাময়িক বেকারদের জন্য বেকার ভাতা বা প্রশিক্ষণকালীন সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা তাদের কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সাহায্য করবে এবং নতুন দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করবে। অর্থনৈতিক সংকট এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কিত সমস্যা। এই সংকট মোকাবিলায় কেবলমাত্র অর্থনৈতিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষা, সামাজিক নীতি, এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সমন্বিত একটি বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং তাদের মধ্যে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা কেবল তাদের ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রভাবিত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
তরুণদের মধ্যে আশা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আজ আমরা তরুণদের জন্য যে বিনিয়োগ করব, সেটাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ এবং স্থিতিশীল একটি জাতির ভিত্তি তৈরি করবে। তাদের বেকারত্বের বোঝা থেকে মুক্তি দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো এবং তাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস সঞ্চার করাÑ এগুলোই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের অগ্রযাত্রার মূলমন্ত্র। তাদের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠন করা সম্ভব, যেখানে কোনো তরুণকে তার মেধা নিয়ে হতাশ হতে হবে না।