অনিরুদ্ধ সূত্রধর
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ১৬:৪৪ পিএম
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল এলেই বাজারে নানান রঙিন ও সুস্বাদু ফলের সমাহার ঘটে। আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, তরমুজসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফল আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব ফলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদের সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকতে সহায়তা করে। কিন্তু এই উপকারী ফলগুলোই এখন আমাদের জন্য এক নীরব মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে, কারণ অধিকাংশ ফলেই ব্যবহৃত হচ্ছে এক মারাত্মক রাসায়নিক—ফরমালিন।ফরমালিন মূলত ফর্মালডিহাইড নামক গ্যাসের জলীয় দ্রবণ, যা সাধারণত ল্যাবরেটরিতে নমুনা সংরক্ষণের কাজে, মৃতদেহ সংরক্ষণ এবং জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ফলকে দীর্ঘসময় টাটকা দেখাতে এবং পরিবহনজনিত ক্ষতি ঠেকাতে এই প্রাণঘাতী রাসায়নিক ব্যবহার করছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এক প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত ৫০টি আম ও লিচুর নমুনার মধ্যে ৩৬টিতে বিপজ্জনক মাত্রায় ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।ফরমালিনযুক্ত ফল খেলে শরীরে নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এটি শ্বাসকষ্ট, চোখে পানি ও জ্বালাপোড়া, গলা ব্যথা, পাকস্থলীর সমস্যা, হজমে বাধা, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করে। ২০২১ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, খাদ্যদূষণ-সম্পর্কিত রোগের কারণে বছরে প্রায় ৩ লাখ মানুষ নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগেন, যার বড় একটি অংশের জন্য দায়ী রাসায়নিকযুক্ত ফল ও খাদ্যদ্রব্য।সরকার বিভিন্ন সময় ফরমালিন বিরোধী অভিযান চালিয়েছে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও জব্দ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ২০১৯ সালে র্যাব ও বিএসটিআই’র যৌথ অভিযানে সারা দেশে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ফরমালিনযুক্ত ফল জব্দ করা হয়। তবে এসব উদ্যোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্থায়ী ও মৌসুমভিত্তিক। অভিযান শেষ হলে পুরনো অবস্থায় ফিরে যায় বাজার।এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন। বাজারে ফল পরীক্ষার সহজ ও সাশ্রয়ী কিট সরবরাহ করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষ নিজেরাই ফল পরীক্ষার সুযোগ পায়। ২০২৩ সালে বিএসটিআই এক ঘোষণায় জানায়, দেশের ৬৪টি জেলায় ১০০টিরও বেশি ফরমালিন পরীক্ষাগার বসানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই লোকবল ও কার্যকারিতার অভাবে অকার্যকর হয়ে আছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিকতা ও জনকল্যাণবোধ জাগানো দরকার। একইসঙ্গে ফল সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত গুদাম, প্রাকৃতিক সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত নিরাপদ চেইন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।ফল আমাদের প্রকৃতির উপহার, যা সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু এই ফলই যদি বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তবে তা এক জাতিগত স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ফরমালিনমুক্ত ফলের জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতনতা, তদারকি ও নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই নীরব বিষ থেকে রক্ষা করতে।
লালমাই সরকারি কলেজ,কুমিল্লা