ব্যাংকিং খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৫ ১৬:০১ পিএম
নিরঞ্জন রায়
আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি নতুন কোনো সমস্যা নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা কখনও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, আবার কখনও উদ্বেগের পর্যায়ে চলে যায়। সত্যি বলতে কী আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই মূলধন ঘাটতি আছে। দেশের হাতেগোনা কয়েকটি বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে, অবশিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই মূলধন সমস্যা আছে। বলা যেতে পারে যে সঠিকভাবে মূলধন গঠন এবং সংরক্ষণ করতে না পারা আমাদের বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৃহৎ সমস্যা। ব্যাংক যেহেতু একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাই তাদের মূলধনের বিষয়টি ঘটা করে প্রকাশ হয় এবং সাধারণ মানুষ জানতে পারে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতির বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন এবং ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের যে অনুপাত (ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও), তা হ্রাস পেয়ে ৩.০৮%এ নেমে এসেছে। ব্যাসেল তিনের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্যাংকের এ সংক্রান্ত যে বিধিবিধান আছে, তাতে প্রতিটি ব্যাংকের মূলধন এবং ঝুঁকিভিত্তিক সপদের অনুপাত হতে হবে কমপক্ষে ১০%। শুধু তাই নয়, এই ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন অনুপাতের সঙ্গে কিছুটা বাফার রাখার জন্য আরও ২-৫০% অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের হার ১২.৫০%।
এই মূলধন সংরক্ষণের অনুপাত এখন হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে মাত্র ৩.০৮%এ। ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতির এই মারাত্মক অবনতি দেশের ব্যাংক, আর্থিক খাত এবং সর্বোপরি অর্থনীতির জন্য এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। শুধু তাই নয়, দেশের ১৪টি ব্যাংকের এই মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ঋণাত্মক, যার অর্থ দাঁড়ায় যে এই ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অর্থে মূলধনই নেই। এ রকম অবস্থায় এসব ব্যাংকের কোনোভাবেই টিকে থাকার কথা নয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেও এই অনুপাত ছিল ১১.৬৪%, অথচ মাত্রে এক বছরের ব্যবধানে এই অনুপাত একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে অর্থাৎ ১১.৬৪% থেকে ৩.০৮% হয়ে গেছে। এক বছরে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে এবং সেসব ঘটনাকে এই মূলধন ঘাটতির কারণ হিসেবে দেখিয়ে হয়ত পার পাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের চরম অব্যবস্থা, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা এবং মূলধন গঠনে অবহেলার পুঞ্জীভূত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এই মূলধন ঘাটতির চরম অবনতি।
ব্যাংক ব্যবসার জন্য অত্যাবশ্যক উপাদান হচ্ছে মূলধন। ব্যাংক মূলত অন্যের অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে থাকে। সঞ্চয় সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যাংক এক পক্ষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, যার একটি অংশ আবার অন্যের কাছে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। এই দুই কার্যক্রমের মাঝে আছে দুই ধরনের ভিন্ন মাত্রার ঝুঁকি। ব্যাংক যে সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা গ্রাহকদের চাহিদা মোতাবেক ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। এমনকি মেয়াদি আমানত যা নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে ফেরত দেওয়ার কথা নয়, সেই অর্থও যদি আমানতকারী তাৎক্ষণিক দাবি করে বসে, তাহলে ব্যাংক সেই অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য। অর্থাৎ যে ধরনের আমানতই সংগ্রহ করুক না কেন, ব্যাংক সবসময় সেই অর্থ তাৎক্ষণিক ফেরত প্রদানের ঝুঁকিতে থাকে। পক্ষান্তরে ঋণ হিসেবে ব্যাংক যে অর্থ বিনিয়োগ করে, সেই অর্থ সময়মতো ফেরত পাওয়ার কোনো রকম নিশ্চয়তা নেই। মেয়াদি ঋণ তো মেয়াদ পূর্তির আগে ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। মেয়াদ পূর্তিতে যে প্রদত্ত ঋণের পুরোটা ফেরত আসবে সেই সম্ভাবনাও অনেক কম। এমনকি চাহিবামাত্র ফেরত দিতে হবে এমন ঋণও সময়মতো ফেরত আসে না। ফলে ঋণ প্রদানের আগে যত বিশ্লেষণই করা হোক না কেন, যে ধরনের ঋণই দেওয়া হোক না কেন, ব্যাংক সবসময়ই সেই ঋণের অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই দুই ধরনের ঝুঁকির মাত্রা লাঘব করা হয় পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের মাধ্যমে।
উন্নত বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ২০০৮ সালে আমেরিকার সাবপ্রাইম মর্টগেজে কেলেঙ্কারির কারণে আর্থিক খাতে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং তখন কয়েকটি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক বন্ধের উপক্রম হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল ব্যাংকের অপর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ। পরবর্তীতে আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের সব দেশ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ ব্যাংকে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের নীতি অনুসরণ করে। একই কারণে ব্যাসেল-তিনে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত প্রচলন করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের নীতি গৃহীত হলেও সেভাবে মেনে চলা হয়নি। যার ফলে আজকে সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে একেবারে ৩.০৮%এ নেমে এসেছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। এর মধ্যে এই মূলধন ঘাটতির বিষয়টি সমগ্র ব্যাংকিং খাতকে মারাত্মক এক সমস্যার মধ্যে ফেলে দেবে। আবার ব্যাংকং খাতে এই সমস্যার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করতে সমস্যা হবে। এমনিতেই আমাদের দেশের সঙ্গে উন্নত বিশ্বের ব্যাংক করেসপনডেন্ট রিলেশনশিপ রাখতে চায় না। আমাদের ব্যাংকের সঙ্গে কোনো রকম কাউন্টার-পার্টি লিমিট রাখে না। আমাদের দেশের আমদানিকারকরা উন্নত বিশ্বের পণ্য সরবরাহকারীদের কাছে সরাসরি এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) ইস্যু করতে পারে না।
ফলে আমদানি ব্যায় বেড়ে যায়, যা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। একইভাবে বিদেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যাংকিং চ্যানেলে সরাসরি অর্থ প্রেরণ করতে সমস্যার সম্মুখীন হয়।
শুধু তাই নয়, দেশে দুর্বল ব্যাংকিং ব্যাবস্থা থাকায় আন্তর্জাতিক এবং ক্রস-বর্ডার লেনদেনের যে সুযোগ-সুবিধা আছে তা আমাদের ব্যবসায়ীরা গ্রহণ করতে পারে না। যেমনÑ স্বল্প সুদের বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারে ঋণ, রিফাইন্যান্স সুবিধা, রিস্ক পার্টিসিপেশন, সাপ্লায়ারস ক্রেডিট, ট্রেড লোনসহ অন্য যেসব আধুনিক ট্রেড ফাইন্যাস সুবিধা আছে, সেগুলো আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা গ্রহণ করতে পারেন না। অথচ আমাদের আশপাশের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক সুবিধা গ্রহণ করে খুব সহজেই পর্যাপ্ত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন করছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত মারাত্মক হ্রাস পাওয়ায় এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে। আর এ কারণেই অতি দ্রুত এই মূলধন ঘাটতির সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একটি কথা এখানে বলে রাখা ভালো যে ব্যাসেল তিন চালু করা হয়েছিল উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কথা মাথায় রেখে। অথচ উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। যেমনÑ উন্নত বিশ্বে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান অনেক নিচের সারির ব্যাংকিং কার্যক্রম। পক্ষান্তরে সঞ্চয় সংগ্রহ এবং ঋণদান আমাদের দেশে অন্যতম এবং একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যাংকিং কার্যক্রম। ফলে যে পদ্ধিত উন্নত বিশের জন্য গৃহীত, তা আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করলে কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। ব্যাসেল তিন অনুযায়ী আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো মূলধন সংরক্ষণে কীভাবে বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন যার সুযোগ এখানে নেই। তাই অন্য কোনো পরিসরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল। এ কথাও ঠিক যে ব্যাসেল তিন নিয়ে আলোচনা এখন অপ্রাসঙ্গিক। কেননা ব্যাসেল তিন অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
ব্যাসেল তিনের অন্যতম শর্ত হচ্ছে মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সপদের অনুপাত মেনে চলা। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতকে এই মূলধন সংরক্ষণের শর্তটি মেনে চলতেই হবে। এই মূলধন অনুপাত এখন যে পর্যায় এসেছে, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন আছে। যেমনÑঅতি দ্রুত সিএলের (ক্লাসিফিকেশন অব লোনস) মাধ্যমে ঋণের শ্রণিবিভাগ বন্ধ করে খেলাপি হওয়া মাত্র সেই ঋণ সম্পূর্ণরূপে অবলোপন করার পদ্ধতি অনুসরণ করা, ব্যাংকে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা, ব্যাংকের মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সপদের অনুপাত ব্যাসেল তিনের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ এবং ইনসেন্টিভ বোনাস প্রদান বন্ধ রাখা এবং যেসব ব্যাংকে মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত বেশি হ্রাস পেয়েছে বা ঋণাত্মক হয়ে গেছে সেসব ব্যাংকে মূলধন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া।
মূলকথা হচ্ছে ব্যাসেল তিনে যা-ই থাকুক না কেন, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রতিটি ব্যাংকের পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। কেননা সংকটকালে এই মূলধনই দেশের ব্যাংকিং খাতকে রক্ষা করবে এবং এটা আন্তর্জাতিকভাবে একাধিকবার প্রমাণিত। আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবসা বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকের মতো এত বিস্তৃত এবং জটিল হয়নি। বরং ডিপোজিট সংগ্রহ এবং ঋণদানের মতো সাধারণ ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে, তাই এখানে মূলধন সংরক্ষণের কাজটিও বেশ সহজ। প্রয়োজন শুধু গুরুত্ব দেওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।