পুঁজিবাজার
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৫ ১৬:৪২ পিএম
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য; যেকোনো ক্রান্তিকালে পর্যুদস্ত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে দেশকে নানামুখী প্রয়াসে গতিশীল করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রণিধানযোগ্য উপজীব্য। পুঁজিবাজারের প্রকৃষ্ট সঞ্চারণে ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারাবাহিক চলমানতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য শেয়ারবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট যে, টানা দরপতনের বৃত্তে আটকে আছে দেশের পুঁজিবাজার। বিগত সরকারের আমলে তারল্য সংকট, কারসাজি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কদর্য হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে পুঁজিবাজারে অতি নাজুক পরিস্থিতি নির্মিত হয়। দুর্নীতি-অনিয়ম-অদক্ষতা ও বিচারহীনতা পুঁজিবাজারকে ভীষণভাবে সংকুচিত এবং পঙ্গু করে রেখেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) নেতৃত্বের বদল হলেও বাজারে কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। বিদ্যমান সংকটেরও যেন কোনো সমাধান নেই। বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত সমস্যা, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার ভয়াবহ পরিস্থিতি নির্মিত হয়েছে। যে কারণে বাজার কেবলই দরপতনের আবহে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত দেড় মাসে কমেছে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দাম এবং প্রতিদিনই বিনিয়োগকারীদের পুঁজি উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে সর্বমহলে ক্ষোভ-হতাশার চিত্র পরিলক্ষিত।
১১ মে ২০২৫ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ মাসে ১৭৯টি কার্যদিবসের মধ্যে ১০৫ দিনই শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেছে। উক্ত সময়কালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩৬০ কোম্পানির মধ্যে ৩৩৬টির দর কমেছে। ৩৭টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৭টির মূল্য হ্রাস পেয়েছে। গড় দরপতনের হার ছিল ২৬ শতাংশ। ১১ আগস্টের পর থেকে ২৬১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের দর কমেছে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এই সময়ে ১ হাজার ১১৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯০২ পয়েন্টে। তাছাড়া ১৪ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ছয় কর্মদিবসের প্রতিদিনই দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা এক্সচেঞ্জে ৩০০ কোটি টাকারও কম মূল্যের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ধস নামার পর গত ১৪ বছরের বেশি সময়ে ৪৭২ দিন ঢাকার শেয়ারবাজারের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার নিচে। এর মধ্যে ৩৪৬ দিন ছিল ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে। তা ছাড়া ২০২০ সালে ছিল ৩৩ দিন, ২০২১ সালে এক দিন, ২০২২ সালে ছয় দিন, ২০২৩ সালে ১৪ দিন এবং ২০২৪ সালে ৯ কর্মদিবসে এমন শেয়ার বেচাকেনা হয়। ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি, লাগাতার দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে আসা ছেড়ে দিয়েছেন। ব্রোকারেজ হাউসের ফ্লোর শূন্য পড়ে আছে। শেয়ারের দর তলানিতে নামলেও নতুন করে বিনিয়োগকারী আসছেন না। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা কাজ করছে। তাদের সামনে এমন কিছু নেই, যে কারণে আশাবাদী হয়ে নতুন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৯ জানুয়ারি ২০২৫ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, বিগত ৮ বছরে পুঁজিবাজার থেকে ১২ লাখ বিনিয়োগকারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ২০১৬ সাল থেকে লগ্নিকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ঢাকার পুঁজিবাজারে মোট বিও অ্যাকাউন্ট ছিল ২৯ লাখ ২৯ হাজার ১৮৯টি। ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৫২টি। উল্লেখ্য হিসাবমতে, আট বছরে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী হারিয়েছে ১২ লাখ ৬৪ হাজার ২৩৭ জন। ২০২৩ সালের ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ১০৪ বিও হিসাবের তুলনায় এক বছরে বিনিয়োগকারী কমেছে ৯০ হাজারের বেশি। ১১ মে সমসূত্রে প্রকাশিত তথ্যানুসারে, গত ৯ মাসে প্রায় ৩০ হাজার বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে তাদের বিও হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে আরও ৫৭ হাজার বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার কারণে তারা বাজারে বিনিয়োগে আস্থা হারাচ্ছেন। অনেকে মার্জিন ঋণের খপ্পড়ে ফোর্স সেলের শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে বাজার ছেড়েছেন। প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীরা টাকা হারাচ্ছেন।
সাম্প্রতিককালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আয়োজিত ‘পুঁজিবাজার বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই নেতৃবৃন্দ জানান, দেশের পুঁজিবাজার ভীষণভাবে সংকুচিত বিধায় অর্থনীতিতে এই খাত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। উক্ত সম্মেলনে তারা ১০ বছরে সংঘটিত অনিয়ম শনাক্ত করতে একটি নিরপেক্ষ ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ কমিটি গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্যে ডিএসইর চেয়ারম্যান বলেন, ‘অতীতে অনেক কিছু রেগুলেটরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি করতে গিয়ে অনেক অনিয়ম হয়েছে। অনেক সময় বাজারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। আমরা বাজারে হস্তক্ষেপ করছি না। আগামী দিনেও করব না। বাজার বাজারের মতো চলবে। বিনিয়োগকারীদের আচরণের সঙ্গে বাজার চলবে। গত দেড় দশকে পুঁজিবাজারে সুশাসনের অবনতি সর্বনিম্ন স্তরে গেছে। বাজারের মৌলিক অবস্থা নষ্ট হয়েছে। এত পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করব, এত সক্ষমতা এখন আমাদের নেই।’
২৪ মে, ২০২৫ ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কর্তৃক পুঁজিবাজার নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত মূল নিবন্ধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘পুঁজিবাজারের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব কমেছে। বাজারের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করে বাজারের গতি বাড়াতে হবে। মোট দেশজ উৎপাদনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজার এগোচ্ছে কি না, বাজার ব্যবস্থাপনায় যারা সংশ্লিষ্ট তারা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, তা খেয়াল রাখতে হবে। পুঁজিবাজার একা সঠিকভাবে চলতে পারে না যদি সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে না চলে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করেছিলেন। পুঁজিবাজার থেকে ২০১০-১১ সালে ২০ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তখন যেভাবে আইন দ্বারা কেস ফাইল করা দরকার ছিল, সেটা হয়নি। যা করা হয়েছে সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। লুটপাটের শাস্তি দিতে না পারলে কোনো পদক্ষেপ কাজে আসবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কাঠামো শক্তিশালী না করলে পুঁজিবাজার ঠিক থাকবে না। দুর্নীতি করলে শাস্তি না পেলে অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন। বারবার রাজনৈতিক সিন্ডিকেট কাজ করেছে।’
আশাজাগানিয়া বিষয় হচ্ছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার জন্য বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ভালো ভালো কোম্পানিকে বাজারে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেজন্য করের সুবিধাসহ সরকারি যেসব নীতি-সহায়তার প্রয়োজন, সেসব বিষয় সরকারের বিবেচনাধীন। অতিসম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনাগুলো হলোÑ সরকারের মালিকানায় রয়েছে এমন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে সরকারের শেয়ার কমিয়ে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, বেসরকারি খাতের দেশীয় বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রণোদনাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজি রুখতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসে তিন মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার সংস্কার করা, পুঁজিবাজারে অনিয়মে জড়িতদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় ধরনের ঋণ প্রয়োজনÑ এমন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার থেকে বন্ড ও ইক্যুইটির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে আগ্রহী করে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।
সার্বিক বিশ্লেষণে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, শেয়ারবাজারের দরপতন বা ঊর্ধ্ব-নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটুকু সিন্ডিকেটেড মাফিয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থ-সম্পদলিপ্সু মানবরূপী কিছু দানব দেশের সবকিছু গিলে খাওয়ার অভিশপ্ত অভিপ্রায় থেকে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও কদর্য কর্মকৌশল গ্রহণ করে। গণমানুষের জীবনোন্নয়নে বা শেয়ারবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী-ব্যক্তিদের আর্থিক লয়-ক্ষয় তাদের বোধে ন্যূনতম আঘাত করে না। সুনামির মতো সংশ্লিষ্টদের চরম ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে তাদের লোলুপ শকুনি দৃষ্টিভঙ্গি অধিকতর উল্লসিত হয়ে ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি-পর্যবেক্ষণ-নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণের ব্যর্থতায় শেয়ার-পুঁজিবাজারের উত্থান-পতনের দোলাচলে অর্থব্যবস্থাও যেকোনো সময় পঙ্গুত্ববরণ করতে পারে। বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে শেয়ারবাজারের সামগ্রিক দিক এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব গভীরভাবে উপলব্ধিতে আনা একান্ত আবশ্যক। অন্যথায় শেয়ারবাজারের চক্রাকার পুঁজি নষ্ট চরিত্রের মানুষগুলোর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারকে অধিকতর শক্তিমান করে তুলবে- অবস্থাদৃষ্টে নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।