সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৫ ১৬:১৩ পিএম
রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দিনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতার কালো মেঘ। জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা, রাখাইনে মানবিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া, উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজনের পদত্যাগের দাবির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর পালটাপালটি বক্তব্য ও অবস্থান পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক অঙ্গনের এই অস্থিরতা জেরেই ছড়িয়ে পড়ে নানামুখী গুজবÑ যার ডালাপালা বিস্তার লাভ করে প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জনে।
মেঘ কাটাতে গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ তিন উপদেষ্টার পদত্যাগের কথা জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) লিখিতভাবে পাঁচ দফা দাবির মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত সময়সীমা সমর্থনের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে। দলটি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অবিলম্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং যথাসময়ে জুলাই ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের আগে উপদেষ্টা পরিষদও নিজেদের মধ্যে অনির্ধারিত বৈঠক করে। সেই বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করছেন না বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে এও জানানো হয়, অন্য উপদেষ্টারাও থাকছেন এবং তাদের ওপর যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা তারা পালন করবেন। এরপর শনিবার রাতেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা এক কথার মানুষ। তিনি তো ডিসেম্বর থেকে ৩০ জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছেন। এটাই তো তার ঘোষণা।’
হঠাৎ দেখা দেওয়া উত্তেজনা বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের পর স্তিমিত হবে বলেই আমরা মনে করি। সেই সঙ্গে এও মনে করি, যে আলোচনা-বিতর্ক, নানামুখী আন্দোলন কর্মসূচি এর সবই নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কমে আসবে। যেহেতু সব পক্ষই নির্বাচন চায় কিন্তু এখনও পর্যন্ত নির্বাচনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হয়তো এক ধরনের শঙ্কা এবং অস্বস্তি কাজ করছে। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে বলছে, সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না করলেও অন্যরাও নির্বাচন চাইছে। সরকারের তরফ থেকেও ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে বলা হয়েছে। ফলে এক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্য খুব বড় নয় বলেই আমরা মনে করি।
রাজনীতিতে বিরোধ থাকবে, দ্বিমত থাকবেÑ সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিরোধ ও দ্বিমত যেন জাতিকে বিভক্ত না করে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সবার সহযোগিতা, আন্তরিকতা। আমরা কেউই আর কোনো দুঃশাসন দেখতে চাই না। আমরা প্রত্যেকেই চাই গণতন্ত্রের পথে দেশ এগিয়ে যাক। আর এই চাওয়ার বাস্তবায়ন সম্ভব সবার ঐক্যবদ্ধ থাকার মাধ্যমে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের জন্য বড় ধাপ নির্বাচন। প্রতিটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন প্রত্যাশা করে। দীর্ঘদিন দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে যেভাবে বাধাগ্রস্ত করে রাখা হয়েছিল, ভোটারবিহীন নির্বাচনের যে ধারা তৈরি করা হয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলো যেমন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার ফিরিয়ে আনতে চাইছে, তেমনি জনগণও চায় তাদের রায়ে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হোক। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব নয়। নির্বাচনে জনগণই বিচারকের ভূমিকায় থাকে, তাই তাদের হাত ধরেই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পথ প্রশস্ত হোক। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে অনিশ্চয়তার সব মেঘ কেটে যাক।
আমাদের রাজনৈতিক সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমরা আর কোনো সংকটের মুখোমুখি হতে চাই না। আমাদের প্রত্যাশা, জুলাই ঐক্য অটুট থাকুক। রাজনীতিতে মতপার্থক্য ও মতবিরোধ থাকতেই পারে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে তা যেন দ্বন্দ্ব-সংঘাতে রূপ না নেয়। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে সাধারণ মানুষ দ্বিধাবিভক্তি দেখতে চায় না। তাই দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে আমরা দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। এজন্য সরকার, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, এটাই সব পক্ষের প্রত্যাশা।