প্রজন্মের ভাবনা
সেতু খানম
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম
পৃথিবীজুড়ে উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে। তার মধ্যে বর্তমান সময়ে উন্নয়নশীল দেশের সংখ্যাই বেশি। এই দেশগুলো কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শিল্পায়নের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই শিল্পায়ন পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন কারণে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন বা কলকারখানা প্রতিষ্ঠা অন্যতম। বিশ্বজুড়ে একই সঙ্গে একদিকে শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেশা অন্যদিকে পরিবেশবাদী, বিশেষজ্ঞদের উৎকণ্ঠা।
কয়েকটি দেশের দিকে লক্ষ করা যাক। প্রথমেই আসি দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম একটি বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের কাছে। পৃথিবীজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো ব্রাজিলের অ্যামাজন বন। বিশ্বের মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশই সরবরাহ করে এই বন। প্রাকৃতিক কার্বন সিংক হিসেবে কাজ করে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, অ্যামাজনে প্রতি বছর প্রায় ২.৫ মিলিয়ন হেক্টর বন ক্ষতির তথ্য রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলোর সারমর্ম হলো শিল্পায়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
উন্নয়নশীল আরেকটি অন্যতম দেশ হলো ভারত। ভারতের নর্মদা জল প্রকল্প স্থাপনের জন্য ৬০ হাজার হেক্টর বনভূমির ক্ষতি হয়েছে এবং সবকিছু মিলিয়ে প্রতিবছর ১,৫০,০০০ হেক্টর বনভূমি উজাড় হচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে ৬ লাখ টন রঙ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য পানিতে মিশছে। শুধু ভারতে এককভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে ২.৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হচ্ছে। টেক্সটাইল এবং পোশাক শিল্প থেকে নির্গত বর্জ্যের কারণে ভারতের ৩০% নদীর পানি ব্যাবহারের অনুপযোগী। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে প্রতিবছর জমিতে ১৩ মিলিয়ন টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা জমির উর্বরতা নষ্ট করার পাশাপাশি মাটি এবং পানি দূষণ ঘটায়।
পরিচিত একটি উন্নয়নশীল দেশ পাকিস্তান। এদেশেও শিল্পায়ন বা উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশ সংরক্ষণকে বলি দেওয়া হচ্ছে। ইটভাটা এবং সিমেন্ট শিল্প থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং সালফার ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, যা মোট বায়ুদূষণের ৩৮%-এর জন্য দায়ী। মোট পানিদূষণের ৬০% টেক্সটাইল শিল্প এবং চামড়া শিল্প থেকে ঘটে থাকে। করাচিতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার ঘনমিটার রাসায়নিক বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে পানিদূষণ ঘটায়। মোট মাটিদূষণের ৪০%-৫০% ঘটে থাকে প্লাস্টিক শিল্প থেকে।
পৃথিবীর মানচিত্রে বর্তমান সময়ে পরিচিত একটি দেশ বাংলাদেশ। খুব সম্প্রতি অনুন্নত দেশের তকমা ফেলে উন্নীত হয়েছে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়। এই অর্জনের পেছনের অন্যতম কারিগর দ্রুত শিল্পায়ন। তবে শিল্পনির্ভর অর্থনীতির দেশ তথা উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যেতে পরিবেশের ক্ষতি উপেক্ষা করেছে মারাত্মকভাবে। বিগত কয়েক বছরের গবেষণা, পত্রিকা ঘাটলে নথি পাওয়া যাবে হাজার হাজার। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে তবুও থেমে থাকেনি উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুটি খাত টেক্সটাইল এবং পোশাক শিল্প। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিগত বছরগুলোতে পোশাক শিল্পের নজরকাড়া অবদান রয়েছে। প্রতিবছরই তা পূর্ববর্তী বছরের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আলোর তলায় পরিবেশের অন্ধকার নিমজ্জিত। শুধুমাত্র এই দুই শিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পানিতে মিশে দেশের ৮০% নদীর পানি দূষণ ঘটিয়েছে। এককভাবে শুধুমাত্র সাভার থেকে ট্যানারি শিল্পের ৩০ হাজার টন রাসায়নিক পদার্থ নদীর পানিতে মিশে পানি দূষণ ঘটায়। প্রতিবছর দেশের প্রায় ১০ হাজার ইটভাটা থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। ঢাকা শহরের মোট বায়ুদূষণের ৩৫% ই আসে ইটভাটার নির্গত ধোঁয়া থেকে।
প্রতিবছর খাদ্যের জোগান দিতে অধিক উৎপাদনের আশায় ৪০ লাখ টন কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার কৃষিজমিতে ব্যবহৃত হয়, যা মাটিদূষণ ঘটায়। ফাও-এর তথ্য মতে, ২০১০ সালে বাংলাদেশে মোট ভূমির পরিমাণ ছিল ১৩.৪০% এবং ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বনভূমি ধ্বংসের পরিমাণ ছিল ২.৬%, যা সেই সময়ে বিশ্বব্যাপী বনভূমি ধ্বংসের গড় পরিমাণেরও বেশি।
উন্নয়নশীল দেশে শিল্পায়নের স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন না করলেও, পরিবেশ সংরক্ষণকে উপেক্ষা করছে!
২০২৪-এর নভেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের ২৯তম আসর হয়েছে। যেখানে ধনী বা উন্নত দেশগুলো দরিদ্র বা অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতিবছর ৩০ হাজার কোটি ডলার অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ সংরক্ষণে বাধ্য করতে এমন অর্থ চুক্তি ফলপ্রসূ নয়। সার্বিক পরিবেশগত হুমকি এবং জলবায়ুর বৈরিতাকে মোকাবিলা করতে অর্থ নয় বরং টেকসই পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার। নতুবা পুরো বিশ্ব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।