সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৫ ১৬:০৮ পিএম
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়ে ভোর ৫টা পর্যন্ত চলা এই ডাকাতির ঘটনায় যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিস লুট করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। লুটপাট চলাকালে বাসের নারী যাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় আবারও দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ঘাটতির চিত্রটি ওঠে এলো। এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। শুধু তাই নয়, সড়কের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে নাÑ জনমনে এমন প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে।
অতি সম্প্রতি টাঙ্গাইলের সড়কে শিক্ষা সফরগামী চার স্কুল বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় ডাকাতরা যাত্রীদের মালামাল লুট করার পাশাপাশি তিন ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করে বলেও অভিযোগ উঠে। প্রসঙ্গত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই মহাসড়কে ইউনিক রয়েলসের একটি বাসে ডাকাতি ও নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালের ২ আগস্টেও একই কায়দায় কুষ্টিয়াগামী একটি বাসে ডাকাতি ও নারী যাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। শুধু এই মহাসড়কটিই নয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে এই ধরনের ডাকাতি ও নারী শ্লীলতাহানির ঘটনা প্রায়শই পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। আর কদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। এ ঘটনায় ঈদযাত্রায় শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিল।
২২ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ফের বাস ডাকাতি, নারী যাত্রীর শ্লীলতাহানি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, রাত ৮টার দিকে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে যাত্রীবাহী বাসটি রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। পথে সাভারের নরসিংহপুর, বাইপাইল, আশুলিয়া থেকে কিছু যাত্রী ওঠেন। ১০ নারীসহ ৪৫ যাত্রী নিয়ে বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা অতিক্রম করে যমুনা সেতুর দিকে যায়। সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর যাত্রীবেশী ৮-১০ জন ডাকাত ছুরি, চাপাতিসহ দেশীয় অস্ত্রের মুখে চালকের কাছ থেকে বাসটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরে তারা বাসের চালকসহ সবার চোখ-মুখ বেঁধে ফেলে। যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের গোলচত্বর এলাকায় গিয়ে বাসটি ঘুরিয়ে আবার ঢাকার দিকে রওনা দেয়। এ সময় যাত্রীদের তল্লাশি করে সর্বস্ব লুটে নেয়। ডাকাত দল নারী যাত্রীদের ওপর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটায়। ডাকাত দল বাসটি নিয়ে সাভারের চন্দ্রা-আশুলিয়া হয়ে পরে টাঙ্গাইল পর্যন্ত কয়েকবার চক্কর দেয়। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে টাঙ্গাইল শহরের বাইপাস সড়কের শিবপুর এলাকায় বাসটি রেখে ডাকাত দল পালিয়ে যায়।
ধারাবাহিক এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে, মহাসড়কের আশপাশের এলাকায় চলন্ত বাসে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীবেশে বাসে উঠে অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে মূল্যবান সামগ্রী লুট করছে। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং গণপরিবহনে যাতায়াতে মানুষের আতঙ্ক বাড়ছে। সংঘটিত ঘটনাগুলোয় দেখা যাচ্ছে, ডাকাত দল বিশেষভাবে নারী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়েছে, যা নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যাটি যাত্রীদের কাছে বিশেষ আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, মহাসড়কের নিরাপত্তায় সমগ্র দেশে হাইওয়ে পুলিশ নিয়োজিত আছে তিন হাজারের কাছাকাছি। দেশের আয়তন ও সড়ক ব্যবস্থাপনার বিচারে এই জনবল প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট বলা যাবে না। উপরন্তু, গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী পুলিশের ওপর বিবিধ হামলার ঘটনায় তাদের দায়িত্বে স্বাভাবিকতা এখনও ফিরে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের নয় মাস অতিক্রান্তের পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রধান এ বাহিনীটির দায়িত্ব পালনে স্বাভাবিকতা ফিরে না আসার ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। বেশিরভাগ ঘটনার পর পুলিশ তদন্তের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব একটা নেই। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা। আলোচনায় আসছে বাসচালক ও সহকারীদের ভূমিকা নিয়েও। বিভিন্ন সময় ডাকাতদের সঙ্গে তাদের যোগসূত্রের অভিযোগও পাওয়া যায়। অনেক সময় দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ডাকাত গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন পেয়ে আবারও অপরাধে যুক্ত হয়। অপরাধীদের সহজে জামিনপ্রাপ্তির বিষয়টিও এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ বলে ধারণা পরিবহন বিশেষজ্ঞদের।
চলন্ত বাসে ডাকাতি রোধে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে। বাসে নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনা এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের তল্লাশি জোরদার করা দরকার। এ ধরনের ডাকাতির ঘটনা রোধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বাস মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা মনে করি, কেবল নিরাপদ সড়কই নয়, সড়কে যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তাও জরুরি।