× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ব প্রাণবৈচিত্র্য দিবস

প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে চাই টেকসই উন্নয়ন

মো. অহিদুর রহমান

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৫ ১৬:১৬ পিএম

মো. অহিদুর রহমান

মো. অহিদুর রহমান

অপরিকল্পিত ও পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়নের ফলে দিনের পর দিন প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। প্রাণ সুরক্ষার উৎসবগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বন হারিয়ে যায় মানে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। নদী হারিয়ে যায় মানে অনেক জলজ প্রাণের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। হাওর হারিয়ে যায় মানে অনেক মাছের বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। মাছ, গাছ, লতাপাতা, পাখি, বন্যপ্রাণী, বনজ, স্থলজ খাবার, ধানজাত, ঔষধি গাছ, অনুজীব, ব্যাঙ, কেঁচো, মৌমাছি, প্রজাপতিসহ সব উদ্ভিদ বা প্রাণের খাদ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস, সাতছড়ি বন, সুন্দরবন, কালেঙ্গাবিল, বড়বিলা, টাঙ্গুয়ার হাওর, পাহাড়, হালদা নদী, মধুপুর বন, জলাভূমি, নদী, পুকুরসহ প্রাণের বসবাসের সব স্থান হুমকির মুখে।

২২ মে বিশ্ব প্রাণবৈচিত্র্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রাণ প্রকৃতি ও টেকসই উন্নয়নের সাথে সংহতি’। ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে দিবসটি পালনের জন্য ২৯ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশে এই দিবস পালন বন্ধ করে দিলে ২০০২ সালের ২২ মে পালনের জন্য দিবসটি পুনর্নির্ধারণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। মূলত ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশনে দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আধুনিক পৃথিবীর মানুষের নানামুখী প্রয়োজন মেটানোর জন্য অসংখ্য প্রাণের বিলুপ্তি ঘটছে। শুধু কয়েকটি আলোচিত প্রজাতি বাঘ, হাতি, রক্ষা করলেই প্রাণের বৈচিত্র্য রক্ষা হয় না। প্রাণের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার বিষয়টি পৃথিবীজুড়ে এখন আলোচনার বিষয়। প্রাকৃতিক নিয়মে পৃথিবীর পরিবর্তন ঘটছে যেমন তেমনি মানুষ তার কর্মকাণ্ডের ফলে আরও পরিবর্তন করছে প্রকৃতিকে। 

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দাবানল, খরা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট, প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, প্রাণীর খাদ্য সংকট, দুর্বল আইন, চোরা শিকারি, হাওর, জলাভূমি ও নদীর নাব্যতা হ্রাস, ভূমিতে অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ, বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্য, বিদেশি আগ্রাসী প্রাণীর আমদানি, মানুষের নির্দয় ব্যবহারের কারণে প্রকৃতি ও মানবজাতির জন্য জরুরি এই প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমরা বাঘ, হাতি, হরিণ, কুমির এসব প্রাণীর কথা যত ভাবি অন্যসব প্রাণীর কথা তত চিন্তা করি না। কিন্তু সব প্রাণের অস্তিত্ব যে আমার প্রকৃতি, পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, মানবজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে পৃথিবীতে বিলুপ্তি শুরু হয়েছে ৭০০ বছর আগে থেকেই। প্রাণের বৈচিত্র্যই আমাদের জীবন, উন্নয়ন, শান্তি, সমৃদ্ধি। বৈচিত্র্য আছে বলেই আমাদের জীবন এত সুন্দর। আইইউসিএনের এক সমীক্ষা মতে বাংলাদেশে ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬৩০ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচর, ২৬১ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণ, ৩২৭ প্রজাতির শামুক ঝিনুক, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, অসংখ্য পোকামাকড়, ৫০০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ যার ভেতর ১৬০ প্রজাতির শস্য রয়েছে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশি ধানের জাত নামে একটা বইয়ে ১২৪৮৭টি স্থানীয় জাতের ধানের নাম উল্লেখ রয়েছে। প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে হাজার বৈচিত্র্যের ধানজাত, রিবই, পঙ্খিরাজ, আইজং, চাপালি, কলমিলতা, নাতিশাইল, বাইগুনবিচি, কালিজিরা, পিপড়ার চোখ, চিনিশাইল, তুলসীমালা, নুইন্যা, বাদশাভোগ, পুইট্টা আইজং, জলকুমড়ি, তিলবাজাইল, শাইল আমন, খামা, কার্তিক শাইল, বাঁশফুল বালাম, অগ্নিশাইল, লালকুমড়ি, কার্তিক বিন্নি, দুধবিন্নি এখন আর দেখা যায় না। 

প্রাকৃতিক বন হচ্ছে প্রাণীর জন্ম, বিচরণ, খাদ্য, প্রজনন ও বসবাসের উপযুক্ত জায়গা। দেশের জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত ভান্ডার হচ্ছে বন। যে জীবন প্রাণীর অবাধ মিউজিয়াম। বনই হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণের ধারক ও বাহক। বন আছে বলেই উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে আছে। বন ধ্বংসের প্রধান কারণ হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছে বনের কাঠ দিয়ে, বসতবাড়ি নির্মাণ, ফসল চাষাবাদ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, নগরায়ণ, জুমচাষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃক্ষের পরিচর্যার অভাব, পরিবেশদূষণ, পাহাড় কাটা, পাহাড় ধ্বংস, বৃক্ষের রোগ, বনবিধি অমান্য করাসহ বিভিন্ন কারণে বন ধ্বংস হচ্ছে।

বনে পাহাড়ে সচরাচর বিচরণ করতো বনহাঁস, সারস, পেঁচা, ময়না, ঘুঘু, চড়ুই, টুনটুনি, কোকিল, বেনেবউ, বউ কথা কও, টিয়া, বনমোরগ, মাছরাঙা, বক, কোয়েল, পাতিকাক, দাঁড়কাক, কাঠময়ূর, বালিহাঁস, চন্দনা, হরিয়াল, কাঠঠোকরা, ফেসকুল, বুলবুলি, ঈগল, বাজপাখি, শকুন, হারগিলা, কাইম, ডাহুক। এসবের মধ্যে অনেক পাখিই আজ বিলুপ্তির পথে। গভীর রাতে ডাহুকের মিষ্টি ডাক শোনা যায় না।

সকাল বেলা ঘুঘুর মিষ্টি ডাক শুনে ঘুম ভাঙত। ব্যাপক নিধনের ফলে এখন আর ঘুঘুর খুব একটা ডাক শোনা যায় না। গারো পাহাড়ে বাঘ, চিত্রা ও মায়া হরিণ, রামকুত্তা, ভোঁদড়, বন্যশূকর, খেঁকশিয়াল, মেঘলা চিতা, বাঘডাস, গন্ধগোকুল, বড় টিকটিকি, বাদুড়, পেঁচা, চিল, কৌড়াপাখি, ভল্লুক, হরিণ, বানর, চিতাবাঘ, বনবিড়াল, সজারো, বনরুই, শূকর, বনগরু, গুঁইশাপ, উদবিড়াল, কালিম পাখি ,সোনালি বিড়াল, রামকুকুর, কচ্ছপ, কাউট্টা ,কাচিম, গেছোবাঘ, উল্লুক, সোনাগুইল, হনুমান, খরগোস, গোয়াল , লজ্জাবতী বানর, চশমাপড়া বানর, বন ছাগল, অজগর সাপ, বাঘ নীলগাই ও বন্য হাতি ইত্যাদির দেখা পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব প্রাণীর সচরাচর বিচরণ লক্ষ করা যায় না।

১৯৯২ সালে ২১ মে সুন্দরবনকে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া পর ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বনের অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেস্কো। এই এলাকাটির মোট আয়তন এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর। বাংলাদেশ সরকার দেশে ২৪টি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, ১৯টি জাতীয় উদ্যান, দুটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, ৩টি মেরিন প্রক্টেটেড এলাকা, একটি উদ্ভিদ উদ্যান, তিনটি ইকোপার্ক, দুটি শকুন নিরাপদ নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করেছে। ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘মাদার অব ফিশারিজ’ বা ‘মা হাওর’ নামে পরিচিত। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ১৮টি মৌজাজুড়ে এই হাওরের অবস্থান। হাওরে আছে ১০৯টি বিল। হাওর পাড়ের ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা এই হাওরের ওপর নির্ভরশীল। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি এই হাওর দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে ঘোষিত হয়। ডোরাকাঁটা হায়েনা রাজশাহী অঞ্চলে, ধূসর নেকড়ে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে, নীলগাই দিনাজপুর-পঞ্চগড় এলাকায়, বান্টিং বা বনগরু চট্টগ্রাম ও সিলেটে এবং বনমহিষ দেশের সব বনাঞ্চলেই দেখা যেত। 

প্রাণ-প্রজাতি সুরক্ষায় বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকার করেছে। সংবিধানের ১৮ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও বিধান করিবেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ (প্রিজারভেশন) অর্ডার ১০৭৩ জারি করে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭৪ সালে ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ (সংশোধিত) আইন ১৯৭৪ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশসহ ২১টি দেশের স্বাক্ষরদানের মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত সনদ। ১৯৯২ সালের ৫ জুন ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হলে বাংলাদেশ অনুসমর্থন দেয় ১৯৯৪ সালের ৩ মে। আমাদের দেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ এবং বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়।

বিশেষ জাতের পাহাড়ি বাঁশঝাড় প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় পাখিরাও এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার একেকটি সারস বাংলার নদীর ধারে ঘুরে বেড়াত। জলাভূমির শামুক ও ঝিনুক ছিল এদের খাবার। মূলত শিকারিদের কবলে পড়ে এই বিশাল পাখিটি হারিয়ে গেছে। বাংলার বিখ্যাত বালিহাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোটা গগন রেড, রাজশকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছআঁচড়া, সবুজ ময়ূর চিরতরে এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন নয়। চাই টেকসই উন্নয়ন। তবেই প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচবে।

  • পরিবেশ বিষয়ক লেখক 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা