জনদুর্ভোগ
সাইফুল ইসলাম শান্ত
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৫ ১৭:০৬ পিএম
যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক যেটাই হোক, দাবি আদায়ের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে রাজপথ দখল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই দাবির মাত্রা যেন বেড়েই যাচ্ছে। হুটহাট সড়ক-মহাসড়কে নেমে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে যান চলাচল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকার শঙ্কা নিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
দাবি আদায়ের নামে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশ আর সহনশীল পরিবেশে আবদ্ধ থাকছে না। নানামুখী আক্রমণ-সংঘাত-ভাঙচুর ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণত মানুষের জনদুর্ভোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেউ কেউ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন। এমন কৌশল আগেও দেখা গেছে। দাবি আদায়ের নামে কেউ হীনস্বার্থ হাসিল করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কল্যাণেই রাজনীতি করে থাকে। দেশ ও জনগণের কল্যাণেই যখন রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা, তখন দলের নীতিমালায় দেশের সংবিধানপরিপন্থি বা এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই দলের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সেসবের কতটুকু মেনে চলে? দেশ ও জনগণের সুবিধা-অসুবিধার কথা কতটুকু বিবেচনায় রাখে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের যেমন নিজের কিছু অধিকার রয়েছে, তেমনি প্রতিটি দল বা সংগঠনেরও তা রয়েছে। কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যের অধিকার যেন খর্ব না হয়, সেদিকেও আমাদের লক্ষ রাখা উচিত। সর্বোপরি মিছিল, সমাবেশ বা ধর্মঘটের নামে এমন কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করা যাবে না; যাতে দেশ ও জনগণ শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা শহরের মানুষের তুলনায় এমনিতেই চলাচলের রাস্তা অনেক কম; সেখানে মিছিল, সভা-সমাবেশের জন্য যানজট আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে। অন্য সময়ের ১০ মিনিটের পথ এক ঘণ্টায়ও যাওয়া যায় না। অনেক সময় পুরো সড়কই দখলে নিয়ে নেয় মিছিলকারীরা। এমনকি রাস্তাও যানবাহন চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই। এর প্রভাব পড়ে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। অফিস যাতায়াতকারীদের যে অপরিসীম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে।
পরিবহন সংকটের কারণে অনেককে গুনতে হয় বাড়তি ভাড়া, অনেক সময় হেঁটেই গন্তব্যে যেতে হয়। তীব্র যানজটে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়। এভাবে মানুষের দৈনিক কত কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি যে নষ্ট হচ্ছে, এর প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ আর মিছিল বিদ্যমান যানজটকে যেভাবে অসহনীয় করে তোলে তা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে যতই সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হোক না কেন, মানুষের এই দুর্ভোগ কিছুতেই লাঘব হবে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একাধিক সূত্র জানায়, নিয়মিতভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে সমাবেশ, মিছিল কিংবা সড়ক অবরোধ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোই অনুমতি না নিয়েই কর্মসূচি পালন করছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি অনুমতি না নিয়ে কর্মসূচি পালন করে, তাহলে ছোট সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেই আগে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। সঠিক বার্তা, কঠোরতা এবং আইনশৃঙ্খলার সমন্বয়ে আন্দোলন ও জনদুর্ভোগের মধ্যে ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে।
তাই কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলকেই জনগণের কথা বিবেচনায় রেখে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি যেন শান্তিপূর্ণ হয়, সেটা মূলত তাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, তার মধ্যে নাগরিকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে যেকোনো সভা-সমাবেশ বা মিছিল করার জন্য সরকার কিছু স্থান নির্দিষ্ট করে দিতে পারে। তবে শহরের মধ্যে কোনো ব্যস্ততম এলাকায় এসব মিছিল-সমাবেশের অনুমোদন না দেওয়া। সরকার এসব কর্মসূচির কথা জনগণকে আগাম জানিয়ে দিতে পারে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন (শুক্র ও শনিবার) রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মসূচি পালনকে উৎসাহিত করা। যেসব জাতীয় অনুষ্ঠান ঢাকা শহরের মধ্যেই পালন করতে হয়, যেমনÑ ঈদ, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা নববর্ষ, বিজয় দিবস ইত্যাদি। সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকার আগে থেকেই জনগণকে জানিয়ে দেবে, যেন নগরবাসী এসব এলাকা এড়িয়ে চলতে পারে।
বড় রাস্তাগুলোয় রিকশা-ভ্যান-ঠেলাগাড়ি চলাচল অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যাতে দ্রুতগতির গাড়িগুলো ঠিকমতো চলাচল করতে পারে। ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এলাকার বেশিরভাগ ফুটপাতই হকারের দখলে থাকায় বাধ্য হয়ে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নেমে চলাচল করতে হয়। ফলে ওসব রাস্তায় গাড়ি চলাচলের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় যানজটের। ফুটপাত দখলমুক্ত করা গেলে ওই সড়কগুলোতে আর অনাকাঙ্ক্ষিত যানজটের সৃষ্টি হবে না।
ঢাকা শহরের অনেক স্থানেই রাস্তা পারাপারের জন্য ওভারব্রিজ থাকলেও বেশিরভাগ পথচারী নিচ দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। ফলে অনেক সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পথচারীরা যাতে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয়, তা বাস্তবায়নের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। কোনো পথচারী এর ব্যত্যয় ঘটালে অর্থ জরিমানা করা যেতে পারে।
সর্বোপরি দেশের সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনকে এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমরা যেমন গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখব, একইভাবে ওই কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে কেউ যেন কোনো ভোগান্তির শিকার না হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। আমাদের সবার সচেতনতা এবং সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজধানীর যানজট অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব। এর ফলে মানুষের দুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি বাঁচবে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা এবং সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকার গাড়ির জ্বালানি।