সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৫ ১৫:৩৭ পিএম
দেশে একের পর এক বিনিয়োগ সংক্রান্ত সুখবর পাওয়া যাচ্ছে। খবরে প্রকাশ, দেশে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব আসছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান পোশাক শিল্পসহ নানা খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান, আমদানি-রপ্তানি হ্রাস, কর্মসংস্থানে অচলাবস্থা, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ-শিল্পায়নে স্থবিরতাসহ দেশ এক অর্থনৈতিক সংকটময় অবস্থায় ছিল। ফলে দেশের দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিতে বাধ্য হয় সরকার। গত নয় মাসে সেই অর্থনীতি দাঁড় করানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। সেই লক্ষ্যে অর্থনীতিকে সচল রাখতে নানা উদ্যোগের পাশাপাশি গত ৭ এপ্রিল আয়োজন করেন ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২৫’। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪০ দেশের ৬ শতাধিক বিনিয়োগকারী ও প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। শুধু তাই নয়, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকারপ্রধানসহ সেসব দেশের শিল্পপতিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন। উন্নয়নশীল বিশ্বের সব দেশেরই বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকে। আমাদের সরকারেরও লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে সুফল পেয়ে আসছে।
১৭ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘বিনিয়োগের হাওয়ায় আসছে বড় বড় প্রস্তাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সেই চেষ্টারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অত্যাধুনিক গার্মেন্টস কারখানা নির্মাণ করতে চায় চীনের হানডা ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ২২টি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু হান্ডা লিমিটেডই নয়, এই প্রতিষ্ঠানের মতো ৩০টি প্রতিষ্ঠান মিরসরাইয়ে অর্থনৈতিক জোনে বিনিয়োগ করতে চায়। প্রস্তাবগুলো সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে চলতি বছরেই এক হাজার মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে। এ সম্পর্কে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক এনামুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘কারখানা নির্মাণের জন্য আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে। তিনি জানান, হানডা ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ, শিগগির প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে। জানা গেছে, বিনিয়োগ প্রসারের লক্ষ্যে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকা সন্দ্বীপ চ্যানেলের পাশে প্রায় ১৩৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল। বেজার মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা ঘিরে এই শিল্পনগরের আয়তন ৩৩ হাজার ৮০৫ একর। এর ৪১ শতাংশ বা ১৪ হাজার একরে শুধু শিল্প কারখানা হবে। বাকি ৫৯ শতাংশ এলাকার মধ্যে আছে খোলা জায়গা, বনায়ন, বন্দর সুবিধা, আবাসন, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ ও বিনোদন কেন্দ্র। পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে সেখানে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।
বাস্তবতার নিরিখে বলতে হয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথম খোঁজেন বিনিয়োগের স্থায়ী উপযুক্ত পরিবেশ। এর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অন্যতম বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ এখন অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা পরিচালিত। এ ধরনের সরকারের অভিজ্ঞতা বিদেশিদের জন্যও অনেকটা নতুন। এর আগে এক-এগারোয় আরেকটি অন্তর্বর্তী সরকার ছিল। তবে তার চেয়েও বর্তমান সরকার ভিন্ন প্রকৃতির। প্রেক্ষাপটও ভিন্ন রকমের। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বিশ্বাসী। এটা অভ্যুত্থানোত্তর সরকার। দেশে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। দীর্ঘদিন দেশ চালানো রাজনৈতিক দলটি কার্যত মাঠে অনুপস্থিত। সম্প্রতি তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনও মেলেনি। তার মানে, রাজনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। আর বিনিয়োগের জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। সে কারণে প্রথম বিবেচ্য বিষয় বিনিয়োগের নিরাপত্তা। তারপর মুনাফা। মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে কি না সেটাও বিনিয়োগকারীরা বিবেচনায় রাখেন। তারা চান নীতি ও বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা। সেই বিচেনায় সরকার আপাতত এগিয়ে রয়েছে। আমরা মনে করি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারকে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বিনিয়োগ ছাড়া দেশের উন্নয়ন শতভাগ সম্ভব নয়। কারণ আমাদের অর্থনীতিতে নানা সংকট বিরাজমান, রয়েছে বাধা, আছে চ্যালেঞ্জও। আবার এসব মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আমাদের ১৮ কোটি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। বিশ্বের দুটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের প্রতিবেশি। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-র্পূব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র রয়েছে আমাদের। এখানে রয়েছে তুলনামূলক সস্তা শ্রম, যা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের জন্য আশাব্যঞ্জক। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ আগের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এখন দরকার উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা। অন্তর্বর্তী সরকারকে এদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বাধাগুলোও চিহ্নিত করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। আমরা চাই বিনিয়োগের এই ধারা অব্যাহত থাক।