পর্যবেক্ষণ
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৫ ১৫:২৯ পিএম
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না’। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বহুভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ বা ‘পাপ বাপকে ছাড়ে না’ ইত্যাদি প্রবাদ বাক্য প্রকৃত অর্থে ধারণ করা হলে প্রত্যেক ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে। মানবতা ও মনুষ্যত্বের প্রায়োগিক গুণে গুণান্বিত হয়ে সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দের পৃথিবীর বিরাজিত পরিবেশকে কল্যাণময় করার উদ্দেশ্য সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। হিংসা-বিদ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি পরিহার করে সাম্য-মৈত্রী-ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করাই মুখ্য। সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাবলীল ধারায় সব অশুভ ও অন্ধকারের অপশক্তিকে পরাভূত করেই মানবসভ্যতার আজকের অবস্থান। তথাপি প্রতিনিয়ত লক্ষণীয় যে, কতিপয় দানবতুল্য মানুষ পুরোবিশ্বে হত্যা-গণহত্যা ও বিভিন্ন অপকৌশলে নানামুখী সভ্যতা বিধ্বংসী অপকর্মে জড়িত। যুদ্ধবিগ্রহ, কর্তৃত্ববাদী লড়াই সমগ্র পৃথিবীকে লন্ডভন্ড করে ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকা-এশিয়াসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশই এসব অপশক্তির নানামুখী আগ্রাসনে প্রায় পর্যুদস্ত।
সময়ের পালাক্রমে পরাক্রমশীল রাষ্ট্রের অপরাজনীতির কদর্য প্রভাবে অনুন্নত-স্বল্পোন্নত জাতি-রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনসহ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অরাজক করার ব্যাপক দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিরোধ-বিচ্ছেদ এবং পেশি ও অস্ত্রশক্তির ঘৃণ্য প্রয়োগে অঞ্চল-দেশ-ক্ষমতা-অর্থ-আধিপত্য-প্রভাব প্রতিপত্তি দখলে নেওয়ার অসম প্রতিযোগিতা এখনও পরিলক্ষিত। সামাজিক-রাজনৈতিক-নানামুখী দুর্বৃত্তায়নের অসৎ পরিক্রমায় প্ররোচিত-পরিচালিত এসব সংঘাত নৃশংসতা-সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বারবার মানবসমাজকে করছে কলুষিত। বিভাজিত চিন্তা-চেতনায় সৃষ্ট মতপার্থক্য নিরসনে আলাপ-আলোচনা প্রচলিত আইনের যথার্থ অনুশীলনে সমঝোতা-আপসরফার বিপরীতে এসব ভয়ংকর উদ্যোগ বাংলাদেশেও দেশবাসীর অন্তরে যারপরনাই আতঙ্ক-আশঙ্কার প্রাচীর নির্মাণ করে চলছে। ভীতসন্ত্রস্ত জনগণ প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে ক্রমান্বয়ে দেশ ও জাতির স্বাভাবিক গতিশীলতার বিপর্যস্ত পরিস্থিতি চরম আক্রান্ত।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধতায় জুলাই ২৪ বিপ্লব সর্বত্রই সমাদৃত। এর উদ্দেশ্য ছিল সব বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করা। জুলুম-অত্যাচার-দমন-নিপীড়নকে সংহার করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সংঘটিত বিপ্লব সর্বাত্মক জনসমর্থিত ছিল। এই যুগান্তকারী সার্থক ও সফল বিপ্লবকে সম্ভবত প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অপশক্তির পদচারণার গুঞ্জন রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মানহানি বা নানাভাবে হয়রানির মানসে ভিত্তিহীন বানোয়াট-উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিপুল অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। আমাদের সবার মনে রাখা উচিত যেকোনো ধরনের প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ পরায়ণতায় অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে বহুলাংশে নিজেরাই ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা হয় না বলেই মানবরূপী কিছু অমানুষ অহেতুক অজুহাতে ধান্দা করার কদর্য কর্মে লিপ্ত হয়। সমাজে এসব কর্মকাণ্ড ব্যাপকতা পেলে স্বাভাবিক চলমানতায় অবশ্যই ছেদ পড়বে। এর প্রভাবে দেশব্যাপী চরম অশান্তি ও অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অনস্বীকার্য।
অতীতে কাঠামোগত ব্যবস্থায় কর প্রদান, সম্পদ প্রদর্শন প্রায় অপরিচিত ছিল। কালক্রমে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে করদাতার সংখ্যা ও নিয়মমাফিক সম্পদ প্রদর্শনও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ভিত্তিহীন অভিযোগ গ্রহণ করে সংস্থাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়রানির পণ্য হিসেবে পরিগণিত। এহেন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রাসঙ্গিক সংস্কার খুবই প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিষয়গুলো কার্যকর করার সময় দিয়ে জনগণকে আতঙ্কমুক্ত করা জরুরি। কথিত বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক প্রতারণামূলক অভিযোগের ধুয়া তুলে সম্মানিত ব্যক্তিদের সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করার বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন লোকের অভাব নেহাত কম নয়। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে ব্যর্থ কদর্য চরিত্রের মানুষগুলো নানা উপায়ে অর্থের বিনিময়ে অপ্রত্যাশিত অভিযোগ দাখিল এবং ঘটনা তদন্তের অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব সংকট উত্তরণে ন্যূনতম মনোযোগ আছে বলে মনে হয় না।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, কারও বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ যেকোনো সংস্থার কাছে প্রদত্ত হলে সংস্থার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগকারীর পরিচয় এবং অভিযোগের উদ্দেশ্য কোনো হীনস্বার্থে করা হচ্ছে কি-না তার যথার্থ নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। অভিযোগকারী সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞাত হয়ে এবং তার পরিচিতি প্রকাশ করে অভিযোগের তদন্ত কাজ শুরু করা আবশ্যক। এখানে অবশ্যই তদন্তের পূর্বেই যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে অভিযোগকারীর নাম-ঠিকানা জানানো এবং এর প্রেক্ষিতে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। ন্যূনতম অভিজ্ঞতা-দক্ষতা-প্রশিক্ষণ-বিভিন্ন সংস্থার আইন সম্পর্কে পরিপূর্ণ অজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা কতটুকু যৌক্তিক; তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে বিপুল ক্ষেত্রে পরাজিত হওয়ার মুখ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ্য অযোগ্যতাকে আমলে নেওয়া আবশ্যক।
অভিযোগকারীর অভিযোগ যদি বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে অভিযোগকারীকেও কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করার ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য। অন্যথায় বিনা কারণে বা প্রভাবিত তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ, নির্লোভ, নির্মোহ ব্যক্তিকে শাস্তি পেতে হয় তা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভয়াবহ নৈরাজ্য তৈরি করবে। হীন প্রভাব বা অনৈতিক পন্থায় প্ররোচিত অনুসন্ধানের নামে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি-মিডিয়া ট্রায়ালসহ নানামুখী উপায়ে ব্যক্তির চরিত্র হরণ-সম্মানহানির দায় কে নেবে? এসব অনর্থক কদাচার-মিথ্যাচার-অসত্য অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকঢোল পিটিয়ে সৎ-সত্যবাদীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান-তদন্ত উঁচুমার্গের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিমানসের মনস্তত্ত্বকে গভীর কুঠারাঘাত করে। দীর্ঘদিনের নীতিনৈতিকতা-সততা-ন্যায়নিষ্ঠতা-ত্যাগ-দেশপ্রেমের অমর সঞ্চয়কে বিতর্কিত করার অপকৌশল বহন করতে না পেরে উল্লেখ্য ব্যক্তিবর্গ ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহননের পথ বেছে নিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। বিষয়টি অবশ্যই সংস্থাগুলোর ধারণায় প্রোথিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি; যেসব মানুষ অভিযোগ জমা দেন তারা সংস্থাটির তফসিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে সচেতন নন। অনেকে অভিযোগ লেখার ক্ষেত্রেও ভুল করেন। অনেক অভিযোগের কোনো ভিত্তি থাকে না। আবার অনেকেই তফসিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে জানলেও শুধু অভিযোগ লেখার ধরন ঠিক না হওয়ার কারণে তা আমলে নেওয়া যায় না। বিভিন্ন কমিশন আইনে তফসিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে রয়েছেÑ সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত যেকোনো ব্যক্তির উৎকোচ (ঘুস), উপঢৌকন নেওয়া, সরকারি কর্মচারীদের নামে-বেনামে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, সরকারি অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধন, সরকারি কর্মচারীর উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা, কোনো অপরাধীকে শাস্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা, কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনকল্পে সরকারি কর্মচারী কর্তৃক আইন অমান্য করা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর অধীন সংঘটিত অপরাধগুলো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক জাল-জালিয়াতি-প্রতারণাও এর অন্তর্ভুক্ত।
বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভুলত্রুটি প্রমাণিত হলে তা শোধরানোর জন্য উপযুক্ত সময় দেওয়া বাঞ্ছনীয়। উল্লেখ্য, সময়ের মধ্যে প্রকৃত যাচাই-বাছাই করে সংশোধনকারীকে প্রয়োজনে জরিমানা বা অন্যান্য উপায়ে ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। অন্যথায় কর প্রদানসহ আয়করের আওতায় আসা গ্রাহকের সংখ্যা কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পক্ষান্তরে এসব ফাঁক-ফোকরে অপরাধীরা অপসুযোগের ব্যবহার করে দেশব্যাপী অরাজকতা-বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারবে। এতে অশান্তি-অস্থিরতা বৃদ্ধির প্রকোপ অধিক মাত্রায় দৃশ্যমান হবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। যেকোনো অপরাধের তাৎপর্য বিশ্লেষণে অপরাধীকে সংশোধনের সময় ও সুযোগ আবশ্যক। এর ব্যত্যয় হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে আইনি কাঠামোয় অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে। অপরাধ সংঘটনের যথার্থ কারণ চিহ্নিত করে তা নির্মূলে কমিশন গঠন ব্যবস্থা জাতি-রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী উদ্যোগই কাম্য।