প্রজন্মের ভাবনা
প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১৮:২৯ পিএম
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একদিন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর পবিত্র আঙিনা ছিল। এখানে তরুণরা তাদের স্বপ্নের ভিত গড়ত, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেতৃত্ব তৈরির প্রস্তুতি নিত। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসগুলো নিরাপত্তাহীনতার ছায়ায় ঢেকে গেছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন শিক্ষার্থী ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। এর কিছুদিন আগে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার নিজ ক্যাম্পাসে একইভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো কেবল দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েট এমনকি ছোট ছোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছিনতাই, হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সভ্যতা গঠনের কারখানা। এখানে যারা আসে, তারা কেবল ছাত্র বা ছাত্রী নয়, তারা ভবিষ্যতের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ , রাজনীতিবিদ, বিচারক, সাংবাদিক, শিল্পী ও কবি। তারা কেবল ডিগ্রি অর্জন করতে আসে না, তারা আসে বিকশিত হতে, মানবিক হতে, সমাজকে দেখার চোখ তৈরি করতে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ৩০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার সিংহভাগের পেছনে রয়েছে বহিরাগত কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবিত গোষ্ঠী। এসব ঘটনার বেশিরভাগেই কোনো দৃশ্যমান বিচার হয়নি। মামলা হয়েছে, চার্জশিট জমা পড়েছে, মিডিয়ায় কিছুদিন সরব থেকেছে; তারপর হারিয়ে গেছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কেবল অপরাধীদের নয়, পুরো সমাজকে শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায় করতে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু এবং একটি সমাজের ব্যর্থতার চিত্র।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-রাজনীতি প্রায়ই সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, হল দখল এবং ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে তুলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-রাজনীতি কম হলেও, প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি আরও রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা।
আমরা মনে করি, ক্যাম্পাসে অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। নিরাপদ ক্যাম্পাস আমাদের শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার এবং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের পূর্বশর্ত। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি তরুণদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াবে। শিক্ষার এই নিরাপদ পরিবেশ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করবে, যারা জাতিকে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যাবে। নিরাপত্তা ও শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি উজ্জ্বল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা