প্রজন্মের ভাবনা
সেলিম রানা
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১৮:২৪ পিএম
বেওয়ারিশ প্রাণী আমাদের পরিবেশের অদৃশ্য সৈনিক। প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অঙ্গ হিসেবে প্রাণীরা আমাদের পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের মধ্যে কিছু প্রাণী রয়েছে, যারা মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে জীবনযাপন করে, আবার কিছু প্রাণী রয়েছে, যারা আমাদের অবহেলার কারণে ‘বেওয়ারিশ’ হয়ে গেছে। এসব প্রাণী সমাজে, বিশেষত শহরাঞ্চলে, রাস্তার ধারে, পার্কে, কিংবা বাসাবাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের জীবনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি এখনও অনেকের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এরা কখনই নিজেদের জীবনধারণের জন্য অপরাধী নয়, বরং মানবসভ্যতার অবহেলার শিকার। এসব প্রাণীর অবস্থা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। ‘বেওয়ারি’ শব্দটি শুনলে আমরা অনেকেই ধারণা করি, এই প্রাণীরা কোনো অপরাধ করেছে অথবা তাদের কোনো অধিকার নেই। কিন্তু আমরা কি জানি, এই বেওয়ারিশ প্রাণীগুলোও একইভাবে জীবনধারণের অধিকারী, ঠিক যেমন আমরা মানুষ হিসেবে অধিকারী? তাদের প্রতি আমাদের অবহেলা নয়, ভালোবাসা ও সহানুভূতির দাবি রয়েছে।
বেওয়ারিশ কুকুর এবং বিড়াল সাধারণত এমন স্থানগুলোতে বাস করে যেখানে মানুষের উপস্থিতি প্রায়শই কম থাকে, অথবা যেখানে সঠিক যত্ন ও নজরদারি নেই। তারা খাবারের জন্য, আশ্রয়ের জন্য কিংবা চিকিৎসার জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল না হলেও, তাদের জীবন অনেকাংশে মানব সমাজের দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। তারা রাস্তার ধারে, আবর্জনার স্তূপে, কিংবা খোলা মাঠে বাস করে, যেখানে সঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যসেবা নেই। খাদ্য ও পানির জন্য তারা কখনও কখনও সড়ক পার হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তাদেরকে কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার ফলে, তারা অনেক সময় বিভিন্ন রোগ ও সংক্রমণের শিকার হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এর ফলে রাস্তার পাশে তাদের মৃত্যু ঘটতে পারে।
রাস্তার কুকুরেরা সমাজে নীরব প্রহরী হিসেবে কাজ করে। রাতের আঁধারে তারা অচেনা কাউকে এলাকায় প্রবেশ করতে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক সংকেত দেয়। ফলে চুরি বা অনধিকার প্রবেশ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এ ছাড়া, তারা রাস্তায় পড়ে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা খেয়ে পরিবেশকে পরিষ্কার রাখতে ভূমিকা রাখে, যা দূষণ কমাতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উপস্থিতি অপরাধপ্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে।
বিড়াল প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে পরিচিত। ইঁদুর, পোকামাকড়, এমনকি ক্ষতিকর ছোট জীবাণু নিয়ন্ত্রণে তারা অনন্য ভূমিকা রাখে। ফলে ঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকে, খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। এভাবেই তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নীরবে কাজ করে। অন্যান্য বেওয়ারিশ প্রাণীÑ শিয়াল, বাঁদর, কাক, শালিক, চড়ুই পাখি প্রভৃতিও পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তারা প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছোট প্রাণী বা পোকামাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য অটুট থাকে। সংক্ষেপে বলা যায়, বেওয়ারিশ প্রাণীগুলো প্রকৃতির নিঃশব্দ রক্ষাকর্তা। তাদের অবদান কখনও দৃশ্যমান, কখনও অদৃশ্য হলেও, মানবসমাজ ও প্রকৃতির স্বাস্থ্যের জন্য তা অপরিহার্য।
সরকার, এনজিও, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই কেবল বেওয়ারিশ প্রাণীদের সুরক্ষা ও সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। প্রতিটি প্রাণীকেই ভালোবাসা ও মর্যাদা দিয়ে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা কথা বলতে পারে না, তাদের দুর্ভোগের কথা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। যদি আমরা এখনই উদ্যোগী না হই, তবে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে, যা জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হরিণহাটি, চন্দ্রা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।