প্রজন্মের ভাবনা
জোহরা রোজি
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১৮:১৯ পিএম
নার্সিং এমন এক পেশা, যেখানে মানবিকতা ও সেবাবোধ মিলেমিশে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। চিকিৎসা পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নার্সরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ব্যথা লাঘব, সুস্থতায় ফেরা এবং মানসিক সাহস জোগাতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। হাসপাতালের বিছানায় রোগীর পাশে যখন প্রিয়জনের কেউ থাকেন না, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করেন একজন নার্স। তিনি হয়ে ওঠেন রোগীর নীরব, অথচ সচেতন সঙ্গী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনও নার্সিং পেশাটি তার প্রাপ্য মর্যাদা পায় না। অনেক সময় নার্সদের ডাকা হয় ‘সিস্টার’ বা ‘ব্রাদার’ নামেÑ যা শুনতে নিরীহ মনে হলেও, একটি পেশাদার পরিচয়কে লিঙ্গ ও ধর্মীয় ইঙ্গিতের মাধ্যমে সীমিত করে ফেলে। অথচ নার্সিং এখন আর কোনো ধর্মভিত্তিক সেবাব্রত নয়; এটি একটি আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রশিক্ষণনির্ভর পেশা, যেখানে মুখ্য বিষয় হলো যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধ।
‘সিস্টার’ শব্দটির উৎপত্তি মধ্যযুগীয় ইউরোপের ক্যাথলিক ধর্মপ্রথা থেকে, যেখানে সন্ন্যাসিনীরা রোগীদের সেবা করতেন। সেখান থেকেই নার্সদের ‘সিস্টার’ বলা শুরু হয়। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আর প্রাসঙ্গিক নয়। একইভাবে, ‘ব্রাদার’ শব্দটি পুরুষ নার্সদের বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, তা লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন তৈরি করে এবং পেশার সর্বজনীনতা ক্ষুণ্ন করে। আজ একজন নার্স হতে হলে কঠিন একাডেমিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ডিপ্লোমা, বিএসসি কিংবা এমএসসি নার্সিংয়ের মাধ্যমে তারা চিকিৎসাবিজ্ঞান, সেবাবিদ্যা ও নৈতিকতা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। ইনজেকশন দেওয়া তাদের দায়িত্বের ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। তারা রোগ নির্ণয়, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ, এমনকি সংকটের মুহূর্তে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবুও আমাদের সমাজে নার্সরা সেই পেশাদার সম্মান পান না, যা তাদের প্রাপ্য। নার্সদের পরিচয় তার লিঙ্গ নয়, তার দক্ষতা। যেমন আমরা বলি না ‘মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার’ বা ‘ছেলে সাংবাদিক’, তেমনি বলাও অনুচিত ‘সিস্টার ’ বা ‘ব্রাদার’। এই পেশার মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তাদের পেশাগত পরিচয়কে মর্যাদা দেওয়া।
একবিংশ শতাব্দীর নার্সরা কেবল শারীরিক যত্নেই সীমাবদ্ধ নন। তারা এখন ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ব্যবস্থাপনা, টেলিমেডিসিন, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণেও দক্ষ। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, নার্সরা কী অসাধারণ সাহস, আত্মত্যাগ ও পেশাদারত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মাসের পর মাস বাড়ি না ফিরে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা থেকেছেন রোগীদের পাশে। করোনা রোগীর সেবা দিতে গিয়ে অনেক নার্স মৃত্যুবরণও করেছেন।
দুঃখজনক হলো, এই পেশার প্রতি রাষ্ট্রীয় ও নীতিগত মনোযোগ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে নার্সের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনে অন্তত ২৩ জন নার্স থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ২ জন। জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে এখন প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স, অথচ বাস্তবে রয়েছেন মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ কম। চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩, অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। যেখানে একজন নার্সের দায়িত্বে থাকা উচিত ৬ জন রোগী, সেখানে বাস্তবে তাকে ৫০ জনের সেবা দিতে হয়। ফলে সেবার মান ব্যাহত হয়, নার্সদের ওপর বাড়ে শারীরিক ও মানসিক চাপ।
এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নার্স নিয়োগ বাড়ানো, প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ, উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরি এবং পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। নার্সদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সহায়ক নয়, সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবেÑ নীতিতে, ব্যবস্থাপনায় এবং সামাজিক আচরণে। মনে রাখতে হবে, নার্সিং শুধু একটি পেশা নয় এটি একটি সেবা, একটি পরিচয়, একটি সম্মানের নাম।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ, চট্টগ্রাম