রেমিট্যান্স
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৫ ১৬:৪৫ পিএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৫ ০৮:৩৪ এএম
ড. আলা উদ্দিন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অপরিহার্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা জিডিপির ৫-৬ শতাংশ। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে, মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক। প্রতিবছর ৪-৫ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করতে যান, যাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত।
বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছেÑ বাংলাদেশ কি অদক্ষ জনশক্তি রপ্তানির প্রথাগত মডেলেই আটকে থাকবে, নাকি উচ্চদক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির দিকে এগোবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রথাগত জনশক্তি রপ্তানির ইতিহাস মূলত ১৯৭০-এর দশকে শুরু হলেও, তা বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃতি লাভ করে ১৯৮০-এর দশকে। এই সময় থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারা গড়ে ওঠে, যেখানে অদক্ষ ও স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে চাপ হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে জনশক্তি রপ্তানিকে দেখা হয়। বর্তমানে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নির্মাণ, গৃহকর্ম, কৃষি ও কারখানা খাতে নিয়োজিত, যারা তুলনামূলকভাবে অল্প প্রশিক্ষণেই বিদেশে কাজ করার সুযোগ পান। এ ধরনের কর্মসংস্থান কিছু ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে, যেমন- দ্রুত কর্মসংস্থান সম্ভব হওয়া, স্বল্প ব্যয়ে জনশক্তি প্রেরণ এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান। একই সঙ্গে, স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হয়, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব কমাতে সহায়তা করে।
তবে এই প্রথাগত মডেলের কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কম মজুরি- গড় আয় মাসে মাত্র ২০০ থেকে ৬০০ ডলার, যা দক্ষ কর্মীদের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কাফালা সিস্টেমের মতো দমনমূলক ব্যবস্থার ফলে অনেক শ্রমিক শোষণ, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে। তাদেরকে অনেক সময় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অটোমেশনের ফলে অদক্ষ শ্রমের চাহিদা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই মডেলের টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। উপরন্তু, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে কর্মস্থলে নানা সমস্যা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ফলে, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের জন্য একটি দক্ষ ও সম্মানজনক শ্রমবাজার গড়ার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের মানবসম্পদ রপ্তানিতে একটি ইতিবাচক রূপান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষ পেশাজীবীদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। যেখানে আগে অদক্ষ ও স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকদেরই প্রধানত বিদেশে পাঠানো হতো, সেখানে এখন তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও নার্সিং খাতে প্রশিক্ষিত জনবল পাঠানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও কানাডার মতো উন্নত দেশগুলো দক্ষ কর্মী গ্রহণে আগ্রহী হওয়ায় এই রূপান্তরের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
দক্ষ পেশাজীবী রপ্তানির অন্যতম সুবিধা হলো উচ্চ আয়Ñ যেখানে একজন পেশাজীবী গড়ে মাসে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার উপার্জন করতে পারেনÑ যা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি আনতে সক্ষম। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, ডেটা সায়েন্স এবং ম্যানেজমেন্ট খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সফলতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতির পথও তৈরি করে। বিদেশে কাজ করা পেশাজীবীরা দেশে ফিরে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে আসার মাধ্যমে দেশীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। তাছাড়া, তাদের মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হচ্ছে ডিজিটাল নোমাড ও রিমোট ওয়ার্কের প্রসার। এর ফলে, বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীরা দেশে থেকেই বৈশ্বিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন, যা ভবিষ্যতে মানবসম্পদ রপ্তানির নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সুতরাং, এই রূপান্তরমূলক ধারা একটি টেকসই, সম্মানজনক এবং উচ্চ মুনাফাসম্পন্ন মানবসম্পদ রপ্তানির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু গুরুতর কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা অন্যতম প্রধান সমস্যা। বর্তমান কারিকুলাম যুগোপযোগী নয় এবং বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। গবেষণার সুযোগও অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, যা সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, বিশেষত ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতার ঘাটতি, আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি পেশাজীবীদের পিছিয়ে রাখে। তৃতীয়ত, দেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাগত ডিগ্রি অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়, ফলে দক্ষ কর্মীদেরও বিদেশে কাজ পাওয়ায় সমস্যা দেখা যায়। চতুর্থত, বর্তমান শিক্ষাক্রম এবং প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল নেই, যা স্কিল মিসম্যাচ তৈরি করে। এই অসামঞ্জস্যতা দেশের কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় ধাক্কা দেয়। পঞ্চমত, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও বিনিয়োগ এখনও সীমিত, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ষষ্ঠত, আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ল্যাব, ই-লার্নিং প্লাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার অভাব দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। শেষত, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দালালচক্র ও দুর্নীতি এখনও একটি বড় সমস্যা। প্রতারণা ও অনিয়মের কারণে প্রবাসী কর্মীরা হয়রানির শিকার হন এবং দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ যদি মানবসম্পদ রপ্তানিকে একটি টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তর করতে চায়, তাহলে তাকে কিছু কৌশলগত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বপ্রথমে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল রূপান্তর জরুরি, যা প্রযুক্তিনির্ভর, স্কিল-ভিত্তিক এবং গবেষণামুখী হবে। শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যম না হয়ে হতে হবে বাস্তব দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার উৎস। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি জাপানি, জার্মান, কোরিয়ান প্রভৃতি ভাষায় লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম নিয়মিত হালনাগাদ করে নতুন কোর্স চালু করা জরুরি, যেন স্কিল মিসম্যাচ কমে আসে। এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শ্রমিক ও পেশাজীবীরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। তৃতীয়ত, বিদেশে কর্মরত দক্ষ পেশাজীবীদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশি পেশাগত নেটওয়ার্ক বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের দেশমুখী বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান স্থানান্তরে উৎসাহিত করতে পারে। চতুর্থত, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারকে প্রণোদনামূলক নীতিমালা গ্রহণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। অবশেষে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে প্রতারণা ও শোষণ কমে এবং দেশের সুনাম বজায় থাকে। এই করণীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানবসম্পদের ওপর। প্রথাগত অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানির মডেল একসময় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, অটোমেশন ও জ্ঞানভিত্তিক খাতের দ্রুত অগ্রগতির প্রেক্ষিতে সেই মডেল আর যথেষ্ট নয়Ñ অদূর ভবিষ্যতে তা অনিশ্চিত রূপ ধারণ করবে। পরিবর্তিত বাস্তবতায়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি রূপান্তরিত মানবসম্পদ গঠন, যারা কেবল বিদেশে কাজ করতে সক্ষম নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষার আধুনিকায়ন, ভাষা দক্ষতার উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, নীতিগত সহায়তা এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ যদি এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে, তবে দেশের প্রবাসী আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, জাতীয় ভাবমূর্তি উন্নত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন সম্ভব হবে। তদুপরি, বিদেশনির্ভর না হয়ে দেশের মধ্যেই এই দক্ষ জনগোষ্ঠী দেশের উন্নয়নে সমূহ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।