সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৫ ১৬:৩১ পিএম
গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পুরোনো। শৃঙ্খলা না ফেরায় সড়ক যেমন ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে উঠছে তেমনি গণপরিবহনগুলো নিয়ম না মেনে ইচ্ছামতো চলাচল করায় সরকারের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার অভিযোগও পানসে হতে বসেছে। কিন্তু গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরেনি, সড়ক সুশৃঙ্খল হয়নি, নিরাপদও হয়নি- এটিই বাস্তবতা। অথচ বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধলেই সমস্যার সমাধান মেলে। কিন্তু সেই ঘণ্টা বাঁধবে কে? এ নিয়েই যত বিপত্তি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নানাদিকে যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে আশা করা গিয়েছিল সংস্কারের ঢেউ সড়ক ও গণপরিবহনেও লাগবে; যাতে করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, গণপরিবহনগুলো নির্ধারিত নিয়মকানুনের মধ্যে আসবে। মানুষের ভোগান্তি কমবে, কমে আসবে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। কিন্তু তেমনটি হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে নেওয়া উদ্যোগে নগর পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে এবং গণপরিবহনকে জনবান্ধব করতে মালিকপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এবং মালিকপক্ষের যৌথ সিদ্ধান্তে ই-টিকেটিং পদ্ধতি এবং কাউন্টার ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু হয়। গণপরিবহনকে একটি নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে আনতে গাড়িগুলোর রুটম্যাপ অনুযায়ী আলাদা আলাদা রঙও করানো হয়। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই যে শেষাবধি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি ৪ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘এত উদ্যোগ, তবু শৃঙ্খলা ফিরছে না গণপরিবহনে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি তারই উদাহরণ।
যাত্রী-মালিকসহ সব পক্ষের সুবিধার কথা বিবেচনায় এনে ই-টিকেটিং পদ্ধতি চালু হয়। অথচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদ্ধতিটি বন্ধ হয়ে গেছে শুধুমাত্র মালিকদের স্বার্থে। একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কাউন্টার ভিত্তিক বাস সার্ভিসও। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এ ধরনের গাড়ির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। চলতি বছরের শুরুতেও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে ফিটনেস না থাকায় ৫৫৪টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করে। এসব গাড়ি থেকে জরিমানা আদায় করা হয় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকা। ডাম্পিংও করা হয় ৯৬টি গাড়ি। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারের অভিযোগ থেকে বাঁচতে এ সময়ে তড়িঘড়ি করে পরিবহন মালিকরা ই-টিকেটিং পদ্ধতি ও কাউন্টার ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়। ঘোষণা দেওয়া হয় বিভিন্ন রুটে ২১টি কোম্পানির ২ হাজার ৬১০টি বাস চলাচলের। প্রথম দফায় গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০০ গোলাপি রঙের বাস চলতেও শুরু করে। তখন বলা হয়েছিল, এসব বাসে টিকিট ছাড়া যাত্রী বহন করা হবে না এবং নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া কোনো যাত্রী ওঠা-নামাও করতে পারবে না। অথচ সপ্তাহ পেরোনোর আগেই কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বাসগুলো আগের নিয়মে ফিরে যায়।
রাজধানীর পরিবহন সেক্টরকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা দীর্ঘদিনের। গণপরিবহনকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য কম পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি, সভা-সমাবেশে কথাবার্তাও কম হয়নি। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। এই পরিবর্তন না হওয়ার পেছনের কারণগুলো এখন অনুসন্ধান জরুরি। ই-টিকেটিং ও কাউন্টার সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পেছনে পরিবহন চালক ও মালিক উভয়ে উভয়কে দায়ী করেছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর কাছে অভিযোগ করে ভিক্টর পরিবহনের মালিক গোলাম ফারুক মানিক বলেছেন, ‘আমরা কাউন্টার ভিত্তিক যে সার্ভিসটি চালু করেছিলাম, সেটি আপামর জনসাধারণের কথা চিন্তা করেই। কিন্তু দুই দিন কাউন্টার সার্ভিস গাড়ি চালিয়ে আমার ১৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। কাউন্টার সার্ভিস বন্ধ করার পেছনে মূল কারণ ছিল পরিবহন শ্রমিকরা। এলাকার কিছু মানুষ এবং প্রশাসনের কিছু লোকও এর জন্য দায়ী। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন আমাদের কোনো ধরনের সহায়তা করেনি।’ অন্যদিকে রাইদা পরিবহনের গাড়িচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম বলেছেন, ‘কাউন্টার ভিত্তিক গাড়ি চলার সময়কার পাওনা টাকা মালিক আমাদের এখনও পরিশোধ করেনি।’ তিনি কাউন্টার সার্ভিস বন্ধের পেছনে শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন।
আমরা মনে করি, এই যে উভয়পক্ষের অসন্তোষ যার বলি সাধারণ মানুষ। এই অসন্তোষ দূর করতে হবে। সেটি দূর করার দায়িত্ব মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সরকারকে নিতে হবে। মাত্র দুদিনে একটি পরিবহনের ১৭ লাখ টাকার ক্ষতির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে, সেসব বিষয়েও নিষ্পত্তি জরুরি। অন্যথায় আগামীতেও এমন উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে।
আমরা নাগরিক জীবনে স্বস্তি ও নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ নিশ্চিতের জন্য বলি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে যেভাবে মানুষের কর্মঘণ্টা অপচয় হয়, তার পেছনে রয়েছে পরিবহনের শৃঙ্খলাহীনতা। পরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরলে মানুষের দুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি সড়কও নিরাপদ হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা। একইভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব যাদের, তাদের তো বটেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।