বিমান
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ১৬:১৯ পিএম
মীর আব্দুল আলীম
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিমান খাত দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ বিনিয়োগ-ঝুঁকির মুখোমুখি। অতিরিক্ত সারচার্জ, উচ্চ জ্বালানি খরচ, ব্যবসাবান্ধব নীতির অভাব এবং বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতা এ খাতের আজকের এই অবস্থা। বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনস খাত একসময় অনেক উদ্যোক্তার জন্য ছিল সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। স্বাধীনতার পর জাতি যখন মাথা তুলে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে ছিল, তখন আকাশপথে চলার সাহস দেখিয়েছিল কিছু সাহসী উদ্যোক্তা। আজ সে সাহস কোথায়? বেসরকারি বিমান পরিবহন খাত, যে খাতটি স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বপ্নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, আজ তা পরিণত হয়েছে হতাশার প্রতিচ্ছবিতে। একের পর এক বন্ধ হওয়াটা এ খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বিদেশি এয়ারলাইনস যেখানে বাজারের ৮০% দখল করে নিচ্ছে, সেখানে দেশের অ্যাভিয়েশন শিল্পে একটি অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যহীনতা দিনদিন প্রকট হচ্ছে। বলা চলে বাংলাদেশের আকাশে আজ শুধুই উড়োজাহাজের গর্জনই স্তব্ধ নয়, স্তব্ধ হয়ে আছে স্বপ্নের স্রোতও।
গত ২৮ বছরে ১৩টি এয়ারলাইনস অর্থসংকট দেখিয়ে বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে অ্যারো বেঙ্গল, এয়ার বাংলাদেশ, জিএমজি, এয়ার পারাবত, রয়েল বেঙ্গল এয়ার, বিসমিল্লাহ এয়ার, মিড এশিয়া এয়ারলাইনস, টিএইচটি এয়ার সার্ভিসেস, ভয়েজার এয়ারলাইনস বাংলাদেশ, জুম এয়ারলাইনস, বেস্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার, রিজেন্ট এয়ার। ইউএস-বাংলা আর নভোএয়ার এ দুটি টিকে থাকলেও চরম বন্ধের ঝুঁকিতে নভোএয়ার। যতদূর জানা যায়, বিদেশিদের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে এ প্রতিষ্ঠানটি। আকাশের বিস্তার যেমন চোখে দেখা যায় না, তেমন আজ এ খাতের সংকটও ধরা যায় না শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইনসের তালিকা দেখে। বরং এ সংকট অনেক গভীরে, নীতিনির্ধারণের ভুল, আমলাতন্ত্রের কুফল, বৈষম্যমূলক বাজারনীতি, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিই মূল হোতা। নানান কারণেই বেসরকারি বিমান সংস্থায় সামনে এখন বাধার পাহাড়। এ দেশের এয়ারলাইনস টিকবে কী করে? বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সারচার্জ। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী যা কি না ৭২% পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। যেখানে সিঙ্গাপুরে ৮%, পাকিস্তানে ৬%, মালয়েশিয়ায় ১২%, ওমানে ১০%, ভারতে ১২% সর্বোচ্চ। দেশি এয়ারলাইনস বন্ধে এটি ষড়যন্ত্র বলেই মনে হয়। এ সুযোগে বিদেশি এয়ারলাইনস বাজার দখল করে আছে। তাতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রুটেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে তারা সুনামের সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সহসাই তাদের ফ্লাইট যাবে লন্ডনে। এই তো সেদিন জিএমজি এয়ারলাইনস লন্ডন পাড়ি দিচ্ছিল। ইউনাইটেড, রিজেন্ট, নভোএয়ার সবাই মিলে এক নতুন ভোরের খোঁজে ছুটছিল। কিন্তু আজ এসব কেবল স্মৃতি। এয়ারলাইনসগুলোর মৃত্যুর হুমকি শুধু ব্যবসা নয়, জাতীয় গর্বে বড় ধাক্কাও বটে! আজ তারা নেই। আকাশে তাদের নাম নেই, কেবল ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো আছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস আর এয়ার অ্যাস্ট্রা বাংলাদেশের আকাশে লড়াই করে টিকে থাকা দেশি পতাকাবাহী বেসরকারি সংস্থা। এ প্রতিষ্ঠান দুটি আজ যেন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে একক সংগ্রামের, সংকল্পের আর নির্বিচারে এগিয়ে চলার। অথচ রাষ্ট্রের দৃষ্টি এখনও তাদের দিকে যথাযথ নয়। যেখানে অন্য সব বেসরকারি সংস্থা পথ হারিয়েছে, সেখানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজেদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সেবার মান এবং ভিশন দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে ইচ্ছা ও প্রতিশ্রুতি থাকলে দেশি সংস্থাও আকাশ ছুঁতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতি ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন, এমনকি ইউএস-বাংলার পক্ষেও না। আজ যদি এ প্রতিষ্ঠানটির পাশে রাষ্ট্র না দাঁড়ায়, তাহলে একসময় তারাও অতীতের গল্প হয়ে যাবে। তখন বাংলাদেশের আকাশে দেশি পতাকা বয়ে নিয়ে উড়বে না কোনো বেসরকারি পাখি।
বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইনসের জন্য জেট ফুয়েল সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমে যায়, বাংলাদেশ তখনও উচ্চ দামে তেল বিক্রি করে যায়। অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য জেট ফুয়েল কিনতে গিয়ে একটি এয়ারলাইনসকে আন্তর্জাতিক রুটের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হয়।
বেবিচকের ৬% সারচার্জ ইস্যু : এখন বেবিচকের ৬% সারচার্জ ইস্যুতে। এটি এক অদ্ভুত নিয়ম, যেটি মূল অর্থের ওপরে সুদের মতো চেপে বসে। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের দেনা ছিল ৫৫ কোটি টাকা, কিন্তু ৬% মাসিক সারচার্জে সেটি কয়েক বছরের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৫ কোটিতে! একটি বিমান সংস্থার পক্ষে এত অর্থ শোধ করা অসম্ভব। রাষ্ট্র তখনও নির্বিকার। এ যেন মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার সমতুল্য। এক প্রকার শাস্তিমূলক কর! ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৫৫ কোটি টাকা কাগজে-কলমে হয়ে গেল ৩৫৫ কোটি! হায় নীতি! হায় হিসাব!
উদ্যোক্তা ও ব্যাংকিংব্যবস্থার অসহযোগিতা : বাংলাদেশের ব্যাংকিংব্যবস্থায় বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি থাকে এক ধরনের অনাস্থা। উচ্চ সুদের হার, কঠিন শর্ত এবং নিরাপত্তা জামানতের অযৌক্তিক চাহিদা অ্যাভিয়েশন উদ্যোক্তাদের দিশাহারা করে তোলে। ফলে ব্যবসা শুরু করতেই উদ্যোক্তারা পড়ে যান অর্থনৈতিক সংকটে। ব্যাংকগুলো মানে না যে একটি এয়ারলাইনসের রিটার্ন দীর্ঘমেয়াদি এবং তার কার্যক্রম স্বাভাবিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন। ফলে এ খাত একঘরে থেকে যায়।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ বিমানের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা লাভজনক নয় জেনেও সে পাচ্ছে সরকারি ভর্তুকি, কর রেয়াত, অবকাঠামোগত সুবিধা। অথচ বেসরকারি সংস্থাগুলো পাচ্ছে না তেমন কোন সহায়তা। এ বৈষম্য শুধু অপ্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করছে না, বরং বিদেশি এয়ারলাইনসদের একচেটিয়া দখলের সুযোগ করে দিচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ২২%। অর্থাৎ ৭৮% লাভ বিদেশিরা নিয়ে যাচ্ছে। এটা কি একটি স্বাধীন দেশের জন্য কাম্য?
বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে যারা বিনিয়োগ করছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসায়িকভাবে সফল ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নীতিনির্ধারণে নেই কোনো দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্টতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাতে বলা হয় নতুন রুট খোলা হবে, আবার তাদের নির্দেশেই সেটি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনও নতুন এয়ারলাইনসকে লাইসেন্স দেওয়া হয়, আবার একদিকে লোনের অনুমোদন আটকে যায়। এ দ্বিচারিতা শুধু বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করে না, বরং এ খাতে দুর্নীতির পথ খুলে দেয়।
দেশি এয়ারলাইনস টিকিয়ে রাখতে- ১. ব্যবসাবান্ধব অ্যাভিয়েশন নীতিমালা প্রণয়ন : সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নীতি গ্রহণ করা; যেখানে থাকবে জেট ফুয়েল মূল্যের স্বচ্ছতা, সারচার্জের যৌক্তিকীকরণ এবং কর হ্রাস। জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী সমন্বয়। দেনার পরিশোধে সময়োপযোগী পুনঃ তফসিল নীতিমালা। ২. সাবসিডি এবং ইনসেনটিভ : বেসরকারি এয়ারলাইনসকে প্রণোদনা ও করছাড়ের মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া সরকার বিমান খাতকে যদি কৌশলগত খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এটি কৃষি বা গার্মেন্টসের মতোই ইনসেনটিভ পেতে পারে। বিদেশি মুদ্রা অর্জনে এ খাতও গুরুত্বপূর্ণ। ৩. প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন : বাংলাদেশে দক্ষ পাইলট, কেবিন ক্রু এবং টেকনিক্যাল স্টাফ তৈরির জন্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। নইলে আমাদের আকাশ আমাদের হাতে থাকবে না। ৪. রাষ্ট্র বনাম বাজার – ভারসাম্য দরকার : বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোকেও সমান সুযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল পরিচালনা নয়, ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাও। ৫. সারচার্জ হার যৌক্তিকীকরণ (৬% থেকে সর্বোচ্চ ১২%-এ আনতে হবে)।
বাংলাদেশের আকাশে যদি আমরা কেবল বিদেশি পতাকা উড়তে দেখি, তাহলে একদিন হয়তো আমাদের সন্তানরাও বলবে আকাশ কি কেবল বিদেশিদের? এখন সময় এসেছে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে দেশি ক্যারিয়ারগুলোর পুনর্জাগরণের জন্য রূপরেখা তৈরি করার। অন্যথায় অ্যাভিয়েশন শিল্পে আমাদের অবস্থান আরও দুর্বল হবে এবং ‘আকাশে দেশের পতাকা’ কেবল স্মৃতিতেই থেকে যাবে। এর প্রতিকার একমাত্র সরকারই করতে পারে, যদি তারা চায়। এখনও সময় আছে। এখনও ডানা আছে কিছু সংস্থার, এখনও কিছু উদ্যোক্তা স্বপ্ন দেখেন। রাষ্ট্র যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আবারও আমাদের আকাশে উড়বে বাংলাদেশ। আমাদের দেশের নাম লেখা উড়োজাহাজ। যে উড়বে কেবল আকাশে নয়- গর্বে, সম্ভাবনায়, স্বপ্নে। আমরা চাই আকাশপথ হোক নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব।