× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিবেশী কূটনীতি

ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারের পাশে বাংলাদেশ

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম

ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারের পাশে বাংলাদেশ

মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ভৌগোলিক দিক দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন রয়েছে। দুটি আঞ্চলিক ফোরাম বিমসটেক এবং  বেকিম-এর সদস্য হওয়ায় বাণিজ্য, সড়ক ও জাহাজ চলাচল, জ্বালানি, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্য অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার অনেক সুযোগ রয়েছে। 

এমনিতেই গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমার, এরই মধ্যে সম্প্রতি (২৮ মার্চ) মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয় দেশটি। প্রথম ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন হয়। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়, সাগাইং, রাজধানী নেপিডোসহ কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ জানায়। 

প্রতিবেশী দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশও দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়ায়। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত মানবিক সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিন ধাপে ২৮৮ টন সাহায্যসামগ্রী পাঠানো হয়। সেসব সহায়তার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, ওষুধ, তাঁবু, পানীয়, কম্বল, পোশাক, স্বাস্থ্যবিধি পণ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

প্রথম ধাপে ৩০ মার্চ দুটি বাংলাদেশি বিমানে ইয়াঙ্গুনে ১৬.৫ মেট্রিক টন সহায়তা পাঠানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে, ১ এপ্রিলে আরও তিনটি বাংলাদেশি বিমানে ১৫ মেট্রিক টন ত্রাণ এবং ৫৫ সদস্যের একটি উদ্ধার ও চিকিৎসাক দল নেপিদোতে নিয়ে যায় এবং সবশেষে তৃতীয় ধাপটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ (বানৌজা) সমুদ্র অভিজান, যা ৮ এপ্রিল ১২০ মেট্রিক টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী বহন করে চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা করে এবং ১১ এপ্রিল ইয়াঙ্গুনে অবতরণ করে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের এই চরম সংকটময় সময়ে দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আবারও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত করল।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চলমান সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গৃহযুদ্ধে ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। 

প্রতিবেশী দেশের এই চরম সংকটে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে দুই দেশ আরও কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান প্রক্রিয়ায় গতি পেয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সময় এক বৈঠকে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শোয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ছয় ধাপে মিয়ানমারকে এই তালিকা দিয়েছিল। এদের মধ্যে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই এখনও চলমান রয়েছে। এটিই রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে প্রথম বড় একটি পদক্ষেপ। শুধু এই আড়াই লাখ নয়, বাকি সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গার তালিকাও দ্রুততার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানা গেছে। বেশ দেরিতে হলেও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, যা আশাব্যঞ্জক।

ভারত ছাড়া মিয়ানমার আমাদের একমাত্র অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো সরকারের আমলেই আমরা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি। সে ধরনের উদ্যোগ বা প্রচেষ্টাও  নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে মিয়ানমার স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু পরে মিয়ানমারের সঙ্গে বোঝাপড়া স্থাপনের জন্য কোনো ক্ষেত্র স্থাপন করা হয়নি। কূটনৈতিক, নিরাপত্তা পর্যায়ে এবং দুই দেশের মানুষের ভেতরে যোগাযোগের জন্য যে ধরনের সক্ষমতা দরকার, তা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়নি। যে কারণে মিয়ানমার আমাদের সুপ্রতিবেশী হয়ে উঠতে পারেনি। এমনকি কূটনৈতিক পর্যায়েও শুধু রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পরে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের জন্য আলাদা একটি ডেস্ক স্থাপন করা হয়। এর আগে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর জন্য এককভাবে কোনো বন্দোবস্তও ছিল না। যার কারণে যে ধরনের দক্ষ কূটনীতি গড়ে তোলা ও সক্ষমতা সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল, তা কোনো সময় করা হয়নি। ফলে মিয়ানমারের ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আমাদের যে নীতিনির্ধারণ হয়েছিল, সেটি খুবই অস্থায়ী বা অপর্যাপ্তভাবে করা হয়েছে। যার প্রতিফলন আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে দেখতে পেয়েছি।

তবে বর্তমান অবস্থানগত প্রেক্ষিতে বলা যায়, স্থিতিশীল মিয়ানমার এবং আরাকানই বাংলাদেশকে উল্লিখিত সব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ এনে দিতে পারে। শুধু আরাকানে নয়, পুরো মিয়ানমারেই স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কেননা জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থাকলে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্য দেশে এবং এর একটা প্রদেশে বাংলাদেশ কীভাবে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে? আর শুধু স্থিতিশীল হলেই হবে না, স্থিতিশীল হওয়ার পর যারা নিয়ন্ত্রণ নেবে, তাদের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগে থেকে ভালো থাকা জরুরি। এ কথা সত্য যে, প্রতিবেশী দেশের সংঘাতের প্রতিঘাত নিজেদের ওপরে এসে লাগছে। তাই প্রতিবেশী দেশের বেসামরিক লোকজন ও নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। মিয়ানমার আমাদের অজানা প্রতিবেশী। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে কখনোই তাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়নি। এমনকি সম্পর্ক গড়ে তোলারও চেষ্টা করা হয়নি। কিন্তু এখন নিজ প্রয়োজনেই তাদের জানা ও তাদের নিয়ে কাজ করা জরুরি।

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের পক্ষে একা মিয়ানমার এবং আরাকানে স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব নয়। সেখানে সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের বাইরেও কিছু পক্ষের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে এসব পক্ষ সংঘাতের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র আপাতত তিন বড় খেলোয়াড়। মিয়ানমার ও আরাকানে এই পরাশক্তিদের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশ এই পরাশক্তিদের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই সবসময় তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বা তাদের অধীনে থেকে কাজ করতে হয় এবং নিজের স্বার্থের জায়গা খুঁজে নিতে হয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে কার সঙ্গে কীভাবে কাজ করে নিজের স্বার্থ হাসিল করা যায়, এটাই এখন খুঁজে দেখতে হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং জনগণের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। মিয়ানমারের প্রতি বাংলাদেশের এই কৌশলগত সহায়তা নিঃসন্দেহে সম্পর্ককে আরও ভালো অবস্থায় নিয়ে আসবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে। 

মিয়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের মাধ্যমে ভারতনির্ভরতা কিছুটা হ্রাস করা যেতে পারে। মিয়ানমারের ভূ-কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশকে পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দেবে। 

মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে পারে। মিয়ানমারে তেল ও গ্যাসের মতো প্রচুর সম্পদ এবং বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল রয়েছে; যা নিয়মিত বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ একটি বিকল্প তেল ও গ্যাসের বাজার পেতে পারে, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে পারবে। 

অপরদিকে, মিয়ানমারে বাংলাদেশি সারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই সুযোগও নিতে পারেন আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা। এমনকি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিমেন্ট ও কাগজ শিল্পগুলোও মিয়ানমারের মংডু অঞ্চল থেকে সহজেই বাঁশ, কাঠ ও চুনাপাথর আমদানি করতে পারে। বাংলাদেশও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করতে চায়, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে আরও উদ্দীপিত করতে পারে।

প্রতিবেশী কূটনীতির মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন জানালা খুলে দেবে; যা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালো করবে। প্রতিবেশী কূটনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ অর্জনের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।

  • সাইফুল ইসলাম শান্ত, কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা