পর্যবেক্ষণ
ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১৫:৫৮ পিএম
ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের এই খাতটি এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। স্বাধীনতার পর মানুষের এ বিষয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা দেখা গেছে। বিগত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। তবে এসব হাসপাতালের খরচ আকাশচুম্বী। ফলে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর মানুষের স্বপ্ন পুনর্জাগ্রত হয়েছে। ‘দেশের মানুষ দেশেই চিকিৎসা নেবে’ এমন ধ্বনি প্রতিধ্বনি হচ্ছে মুখে মুখে।
প্রতি বছর দেশের ৩০ লক্ষাধিক মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমন করে। এ বিশালসংখ্যক মানুষের সিংহভাগেরই গন্তব্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভৌগোলিক নিকটতা, ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্য এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচের কারণে ভারতই এতদিন ছিল চিকিৎসাপ্রার্থীদের প্রথম পছন্দ। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশি রোগীদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারত কড়াকড়ি আরোপ করে। অতীতে যেখানে প্রতিদিন বহু রোগিকে মেডিকেল ভিসা দেওয়া হতো, সেখানে বর্তমানে ইস্যুকৃত ভিসার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে হাতেগোনা কয়েকজন।
এ ধরনের পরিস্থিতি রোগীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং চিকিৎসার বিকল্প গন্তব্য অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চিকিৎসার গন্তব্য বহুমুখীকরণ যেমন জরুরি, তেমন নিজ দেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর এবং থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
চীন ও বাংলাদেশের জনগণ প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে চীনের অবদান আজ স্বীকৃত। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সর্বাধুনিক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তারা। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শাহজালাল সার কারখানা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র। দক্ষিণবঙ্গের প্রাণ পদ্মা সেতু। পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। আগামী দিনগুলোয় চীন ও বাংলাদেশের জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় দুই দেশের সহযোগিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং এ সহযোগিতার সোনালি ফসল ঘরে তুলতে আমরা সক্ষম হব।
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী দেশ হিসেবে চীন এখন বাংলাদেশের রোগীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনগামী বিমানের উচ্চ ভাড়া এবং দীর্ঘ ফ্লাইট সময় রোগীদের জন্য ভ্রমণ ব্যয়বহুল করে তোলে। তদুপরি, চীনে বিদেশি রোগীদের স্থানীয়দের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি ফি প্রদান করতে হয়। সর্বোপরি ভাষাগত পার্থক্য চিকিৎসা গ্রহণে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। তবে আশার কথা, বাংলাদেশে হাসপাতাল নির্মাণসহ স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে চীন। হাসপাতালের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গে জমি দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আরও জানা গেছে, হাসপাতাল নির্মাণ ছাড়াও স্বাস্থ্যের অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ সহায়তা দেবে চীন। এর মধ্যে রোবোটিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে দেশে এসেছে। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে চীনের বড় ধরনের সংশ্লিষ্টতা বরাবরই ছিল। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো নিয়মিতভাবে ওষুধের কাঁচামাল (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট-এপিআই) চীন থেকে আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা মেডিকেল সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ আমদানি করেন সেখান থেকে। প্রতিবছর অনেক ছাত্র-ছাত্রী মেডিকেল শিক্ষার জন্য চীনে যান। বাংলাদেশ বেশি করোনার টিকা কেনে চীন থেকে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই দেশের সরকার এ দেশের মানুষকে এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল উপহার হিসেবে দিচ্ছে। এই হাসপাতাল উত্তরবঙ্গে, রংপুরেই করার কথা ভাবা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, প্রধান উপদেষ্টার সাম্প্রতিক চীন সফরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ কুনমিং প্রদেশের চারটি আধুনিক হাসপাতালকে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ করেছে। এসব হাসপাতালের নির্দিষ্ট কিছু তলা শুধু বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীরা স্থানীয়দের সমমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাবেন। ফলে স্বল্প খরচে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য এক যুগান্তকারী সুযোগ সৃষ্টি হবে। জানা গেছে, ভাষাগত সমস্যা সমাধানে প্রতিটি ফ্লোরে বাংলাভাষী দোভাষী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে রোগীরা ডাক্তার ও নার্সদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন। এতে রোগ নির্ণয়ে ভুলের আশঙ্কা যেমন কমবে, তেমন রোগীর মানসিক স্বস্তিও বাড়বে।
বাংলাদেশ থেকে কুনমিংয়ের যাতায়াত সহজতর করতে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস চট্টগ্রাম-কুনমিং সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি চালু হলে পূর্বাঞ্চলের মানুষ সহজেই এবং স্বল্প সময়ে চিকিৎসা নিতে পারবে। একই সঙ্গে ঢাকা-কুনমিং রুটের বিমান ভাড়া কমাতে বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষও কাজ শুরু করেছে। আশা করা যায় অচিরেই বিমান ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে।
চলতি মাসেই বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদল কুনমিং সফরে যাবে। তারা হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে রোগীদের জন্য বিদ্যমান সুবিধাসমূহ প্রত্যক্ষ এবং চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করবেন। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি রোগী কুনমিংয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তারা সেবার মানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে রোগীদের মধ্যে কয়েকজন বিমান ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ডও বাংলাদেশি চিকিৎসা পর্যটকদের জন্য আরেকটি বিকল্প গন্তব্য হয়ে উঠছে। থাই রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত এবারের বিমসটেক সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস থাই প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশিদের জন্য থাই ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানান। বর্তমানে ঢাকাস্থ থাই দূতাবাসে ভিসা আবেদনকারীর তুলনায় ভিসা প্রসেসিং ক্ষমতা অনেক কম হওয়ায় দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও দুর্ভোগের শিকার হতে হয় রোগীদের।
প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে সাড়া দিয়ে থাই প্রধানমন্ত্রী ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-চিয়াং মাই সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি চালু হলে মাত্র এক ঘণ্টায় থাইল্যান্ড পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা রোগীদের জন্য বিরাট স্বস্তি বয়ে আনবে।
তবে বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীরা সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন তথ্যের অভাবে। কোন দেশের কোন হাসপাতাল, কোন চিকিৎসক তাদের রোগের জন্য উপযুক্ত এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেকেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়েন এবং ভোগান্তির শিকার হন। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত একটি কেন্দ্রীয় ‘চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্র’ স্থাপন করা, যেখানে ভিসা সহায়তা, বিমান টিকিট, আবাসন, খাবার, চিকিৎসা পরামর্শসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ সেবা দেওয়া হবে। নির্ভরযোগ্য ট্রাভেল এজেন্সিকে এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করে রোগীদের অভিজ্ঞতাকে ভোগান্তিমুক্ত করা যেতে পারে।
এ ছাড়া এ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে বিদেশগামী চিকিৎসাপ্রার্থীদের ডকুমেন্টেশন, মেডিকেল রিপোর্ট অনুবাদ, ভার্চুয়াল কনসালটেশন ও রেফারেল সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এমনকি ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে প্রাথমিক পরামর্শ কিংবা হসপিটাল বুকিংয়ের সুবিধাও যুক্ত করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিদেশমুখিতা কমাতে দেশের ভেতরেই উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। উন্নত দেশগুলো যদি বাংলাদেশে হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহী হয়, তবে সেসব হাসপাতালে কর্মরত বাংলাদেশের চিকিৎসক-নার্সদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দেশি হাসপাতালগুলোও নিজেদের মানোন্নয়নে প্রতিযোগিতায় নামবে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ঘটাবে।
চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে ঢাকায় কিছু হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। শিগগিরই চীনা বিনিয়োগে এসব হাসপাতাল চালু হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি চীন বাংলাদেশে একটি রোবোটিক ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং একটি কার্ডিয়াক সার্জারি গাড়ি অনুদান দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাত আরও আধুনিক করে তুলবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাত উন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশি বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে বিশ্বমানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল, নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত। এতে দীর্ঘমেয়াদে শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, স্বাস্থ্যসেবায় কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ গঠনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
সবশেষে বলা যায়, বিদেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য চীন ও থাইল্যান্ডের মতো নতুন গন্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে আশার আলো। তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতা। একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য খাত আধুনিক, সাশ্রয়ী ও বিশ্বমানের করতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও স্বাস্থ্যবান, সমৃদ্ধ এবং মানবিক করে তুলবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা।