ইস্টার সানডে
রেভারেন্ড জেমস রানা বিশ্বাস
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১৫:৫৫ পিএম
প্রভু যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থানই হচ্ছে খ্রিস্টীয় ধর্মের সারবস্তু এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা। আর এ অলৌকিক ঘটনাটির ওপরই খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের ভিত্তি রচিত। প্রায় ২ হাজার বছর আগে প্যালেস্টাইনে যেসব ঘটনা ঘটেছিল যেমন যিশুখ্রিস্টের জন্ম, কাজ, ক্রুশীয় মৃত্যু ও সমাধি, পুনরুত্থান এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে পুনরুত্থানই হচ্ছে সর্বপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ খ্রিস্ট যদি পুনরুত্থিত না হতেন, তাহলে তিনি যা কিছু দাবি করেছিলেন তা সবই মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হতো। কিন্তু আমরা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই যে, ‘বাস্তবিক খ্রিস্ট মৃতদের মধ্য থেকে উত্থাপিত হয়েছেন, তিনি নিদ্রাগতদের অগ্রিমাংশ।’ আর এ পুনরুত্থানই আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রয়োজন মেটায়।
আমাদের পুরোনো পাপময় জীবন যিশুর সঙ্গে ক্রুশে মেরে ফেলা হয়েছে ও তাঁর সঙ্গে কবরস্থ করা হয়েছে। তারপর যিশু যখন মৃতদের মধ্য থেকে জীবিত হয়ে উঠলেন আমরাও তখন পুরোনো জীবন পেছনে যিশুর কবরে ফেলে রেখে তাঁর সঙ্গে নতুন সৃষ্টিরূপে জীবিত হয়েছি। অতএব আমরা তাঁর মৃত্যুর উদ্দেশ্যে বাপ্তিস্ম দ্বারা তাঁর সঙ্গে সমাধিস্থ হয়েছি, তিনি মৃতদের মধ্য থেকে জীবিত হলেন, তেমন আমরাও জীবনের নতুনতায় চলি। তার যে মৃত্যু হয়েছে তদ্বারা তিনি পাপের সম্পর্কে একবারই মরলেন এবং তাঁর যে জীবন আছে তা দ্বারা তিনি ঈশ্বরের কাছে জীবিত আছেন। তদ্রূপ তোমরা নিজেরা পাপের কাছে মৃত, কিন্তু খ্রিস্ট যিশুতে ঈশ্বরের কাছে জীবিত রেখে গণনা করো। (তুলনা রোমীয় ৬:৪-১১)।
প্রভু যিশুখ্রিস্ট আজ আমাদের নতুন জীবনের সূচনা হয়েছে। আমরা এখন নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছি। বাক্যে আছে, ‘যদি কেউ খ্রিস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হলো। তার পুরোনো সবকিছু মুছে গিয়ে সব নতুন হয়ে উঠেছে।’ (২ করিন্থীয় ৫:১৭)। অতীতে আমরা অন্ধকার জগতের প্রজা ছিলাম কিন্তু তিনি আমাদের অনুগ্রহ করেছেন, যেন আমরা দীপ্তির সন্ধান পেতে পারি। খ্রিস্টের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা এক নতুন আলোর সন্ধান পেয়েছি এবং আমাদের তিনি নতুন এক জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। ‘ঈশ্বর আমাদের পরিত্রাণ করেছেন এবং পবিত্রভাবে জীবন কাটাবার জন্য ডেকেছেন। আমাদের কোনো কাজের জন্য তিনি তা করেননি, বরং তাঁর উদ্দেশ্য এবং অনুগ্রহের জন্যই করেছেন। জগৎ সৃষ্ট হওয়ার আগে খ্রিস্ট যিশুর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রহমত আমাদের দান করেছিলেন, কিন্তু এখন আমাদের ত্রাণকর্তা প্রভু যিশুর এ দুনিয়াতে আসবার মধ্য দিয়ে তিনি সে অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন। খ্রিস্টের মৃত্যুকে ধ্বংস করেছেন এবং সুসংবাদের মধ্য দিয়ে ধ্বংসহীন জীবনের কথা প্রকাশ করেছেন।’ (২ তীমথিয় ১:৯-১০)।
প্রভু যিশুখ্রিস্ট আজ পুনরুত্থিত এবং জীবিত অর্থাৎ শয়তানের সমস্ত কর্তৃত্ব ধ্বংস করে খ্রিস্ট আমাদের মুক্ত করেছেন। এক অভূতপূর্ব বিজয় আমাদের জন্য এনে দিয়েছেন। আজকের দিনে তিনি তাঁর শিষ্যদের নিজেদের জীবনের খারাপি, প্রলোভনের ওপর জয়লাভ করতে এবং জগতের খারাপ থেকে জয়ী হতে সাহায্য করেন।
যেহেতু তিনি জীবিত আছেন, সেহেতু আমরা এখন তাঁর আত্মিক শক্তি লাভ করেছি, যেন পাপের ওপর এবং আমাদের বিপক্ষ শয়তানের সকল প্রকার চালাকির ওপর বিজয়ী জীবন যাপন করি। আর বিপক্ষ আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
‘তাহলে এসব ব্যাপারে আমরা কী বলব? ঈশ্বর যখন আমাদের পক্ষে আছেন তখন আমাদের ক্ষতি করবার কে আছে? ঈশ্বর যাদের বেছে নিয়েছেন কে তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে? ঈশ্বর নিজেই তো তাদের নির্দোষ বলে গ্রহণ করেছেন। কে তাদের দোষী বলে স্থির করবে? যিনি মরেছিলেন এবং যাঁকে মৃত্যু থেকে জীবিত করা হয়েছে সেই খ্রিস্ট যিশু এখন ঈশ্বরের ডান পাশে আছেন এবং আমাদের জন্য অনুরোধ করছেন। কাজেই এমন কী আছে যা খ্রিস্টের ভালোবাসা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেবে? যন্ত্রণা? মনের কষ্ট? জুলুম? ক্ষুধা? কাপড়চোপড়ের অভাব? বিপদ? মৃত্যু? পবিত্র বাক্যে লেখা আছে, ‘উৎসর্গ করার ভেড়ার মতোই লোকে আমাদের মনে করে। কিন্তু যিনি তোমাদের মহব্বত করেন তাঁর মধ্য দিয়ে এসবের মধ্যেও আমরা সম্পূর্ণভাবে জয়লাভ করছি। আমি এ কথা ভালো করেই জানি, মৃত্যু বা জীবন, দূতগণ বা আধিপত্য সব, বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনো কিছু কিংবা অন্য কোনোরকম শক্তি, অথবা আকাশের ওপরের বা পৃথিবীর নিচের কোনো কিছু, এমনকি, সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে কোনো ব্যাপারই ঈশ্বরের প্রেম থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না। ঈশ্বরের এ প্রেম আমাদের প্রভু যিশুখ্রিস্টের মধ্যে রয়েছে।’ (রোমীয় ৮:৩১-৩৯)।
যিশুখ্রিস্ট নিজেই জীবন এবং তিনি অন্ধকার অপেক্ষা শক্তিমান, এজন্যই কবর থেকে তিনি বিজয়ী হয়ে উঠেছেন। যিশুখ্রিস্ট বিজয়ী হয়েছেন যেন আমরাও বিজয়ী হতে পারি। তিনি যেমন বিজয়ী তেমন আমাদেরও আত্মিক মৃত্যু থেকে ধার্মিকতার বিজয়ী জীবনে উত্থিত করতে সক্ষম। যিশুখ্রিস্ট আমাদের সামনে কেবল আদর্শ ও দৃষ্টান্তই রাখেননি বরং বাস্তবে তিনি আমাদের ধার্মিকতার জীবনে পৌঁছাতে সাহায্য করেন, পরিচালনা দেন ও শক্তি জোগান।
যিশুখ্রিস্টের পুনরুত্থান ভবিষ্যতের জন্য আমাদের মহৎ প্রত্যাশা দান করে। তাঁকে মৃতদের মধ্য থেকে প্রথমজাত বলা হয়। যারা তাঁকে অনুসরণ করে, তাঁর পুনরুত্থান দ্বারা তিনি তাদের সবার জন্য মৃতদের মধ্য থেকে উত্থিত হওয়ার পথ খুলে দিলেন। যিশু বলেছেন, ‘আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমার ওপর বিশ্বাস করে সে মরলেও জীবিত থাকবে।’ (যোহন ১১:২৫)।
ভবিষ্যতে একদিন প্রভু যিশু এ পৃথিবীতে আবার ফিরে আসবেন, তখন তিনি সেই ছোট্ট শিশুটির মতো আসবেন না বরং তিনি সমগ্র সৃষ্টির শাসনকর্তা ও গৌরবান্বিত প্রভু হয়ে প্রকাশিত হবেন। যারা তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করবে তারা আবার জীবিত হয়ে উঠবে। শাস্ত্রে লেখা আছে, ‘যদি খ্রিস্টকেই জীবিত করা না হয়ে থাকে তবে তোমাদের বিশ্বাস নিষ্ফল, আর এখনও তোমরা পাপের মধ্যেই পড়ে রয়েছ। তাহলে খ্রিস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যারা মারা গেছে তারা তো বিনষ্ট হয়েছে। খ্রিস্টের ওপর আমাদের যে আশা তা যদি কেবল এই জীবনের জন্যই হয় তবে সমস্ত মানুষের মধ্যে আমাদেরই বেশি দুর্ভাগ্য।
খ্রিস্টকে কিন্তু সত্যি সত্যিই মৃত্যু থেকে জীবিত করে তোলা হয়েছে। তিনি প্রথম ফল, অর্থাৎ মৃত্যু থেকে যাদের জীবিত করা হবে তাদের মধ্যে তিনিই প্রথমে জীবিত হয়েছেন। একজন মানুষের মধ্য দিয়ে মৃত্যু এসেছে বলে মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে ওঠাও একজন মানুষেরই মধ্য দিয়ে এসেছে। আদমের সঙ্গে যুক্ত আছে বলে যেমন সমস্ত মানুষই মারা যায়, তেমন খ্রিস্টের সঙ্গে যারা যুক্ত আছে তাদের সবাইকে জীবিত করা হবে; তবে তার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রথম ফলের মতো প্রথমে খ্রিস্ট, তারপর যারা খ্রিস্টের নিজের তাদের জীবিত করা হবে।’ (১ করিন্থীয় ১৫:১৭-২৩)।
আমাদের জীবনের প্রত্যাশা হচ্ছে, আমরাও মসিহের সঙ্গে জীবন পাব। আমাদের ওপর মৃত্যুর কোনো কর্তৃত্ব নেই। আমরাও মসিহের সঙ্গে মরেছি এবং এটা বিশ্বাস করি যে তাঁর সঙ্গে জীবন পাব। কারণ তিনি মৃতদের মধ্য থেকে উঠেছেন এবং তিনি আর কখনও মরবেন না এবং তাঁর ওপরে মৃত্যুর কোনো কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু আমাদের জন্য শর্ত হচ্ছে, পাপ যেন আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে।