সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৫ ১৫:৫২ পিএম
দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে রংপুরে ১ হাজার শয্যার একটি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করবে চীন। চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে এ হাসপাতালটি উপহার হিসেবে দিচ্ছে দেশটি। পরিকল্পনা অনুয়ায়ী, হাসপাতালকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গে একটি চিকিৎসা ‘হাব’ গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। এই উপহারকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছে উত্তরবঙ্গ তথা রংপুর বিভাগের সর্বস্তরের মানুষ। প্রাথমিকভাবে হাসপাতালের নাম ‘চায়না-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ জেনারেল হাসপাতাল’ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কথা সত্য, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে চীনের সরব উপস্থিতি দীর্ঘকাল ধরে। দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য মেডিকেল সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি, ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিয়মিত ওষুধের কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী দেশটিতে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে যান।
জানা গেছে, এবার স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে চীন। এর অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গ ছাড়াও চট্টগ্রামে একটি জেনারেল হাসপাতাল ও ঢাকায় একটি পুনর্বাসন হাসপাতাল নির্মাণে বিনিয়োগ করবে তারা। এ ছাড়া ঢাকার পাশে সাভার কিংবা ধামরাইয়ে দুর্ঘটনায় আহত-প্রতিবন্ধী রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য ১০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি রিহ্যাবিলেটেশন হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। প্রতিশ্রুতিমতো, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আহতদের পুনর্বাসনের জন্য একটি রোবোটিক ফিজিওথেরাপি সেন্টার স্থাপনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। চীনের এসব সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। হাসপাতালটি নির্মাণ হলে উত্তরের শুধু নয়, সারা দেশেরই স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি ভারতনির্ভরতা কমবে বলে মনে করছেন সচেতনরা।
১৯ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘চীনের উপহারের হাসপাতাল ঘিরে উত্তরবঙ্গবাসীর স্বপ্ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। ঘোষণার পর ১৫ এপ্রিল গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর মৌজার চরকলাগাছি এলাকা পরিদর্শন করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক রবিউল ফয়সাল। সেখানকার ১০০ একর খাসজমির মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ২০ একর জায়গা পরিদর্শন করেন তিনি। চীনের কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শন করে হাসপাতালটি নির্মাণের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা নির্ধারণ করবেন। আসলে ভৌগোলিক অবস্থান ও বিভাগীয় সদর দপ্তর হিসেবে রংপুর জেলায় এ হাসপাতাল স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে গ্রোয়েন নির্মাণ ও তীররক্ষার কারণে নদীভাঙন রোধ হবে, বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের মাধ্যমে বন্যাঝুঁকি হ্রাস পাবে, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। এমনকি খননকৃত মাটি ভরাট করে নদীতীরবর্তী ভূমি পুনরুদ্ধার করে ওই জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল, পাওয়ার প্লান্ট, স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ, সেচ ও কৃষিব্যবস্থা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি, শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহারের জন্য বর্ষাকালে শাখা নদীসহ ব্যারেজের উজানে তিস্তা নদীতে প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এখানে উল্লেখ্য, উত্তরাঞ্চলের স্বনামধন্য চিকিৎসক থাকলেও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসহ রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতি পরিচালনার অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান নেই। ফলে চিকিৎসার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে রোগী ও স্বজনদের মনে। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষকে অন্যত্র চিকিৎসার জন্য যেতে হয়।
প্রসঙ্গত, ভারত-বাংলাদেশের চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে বাংলাদেশি রোগীরা। একেবারে গুরুতর রোগী ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশিকে মেডিকেল ভিসা দিচ্ছে না ভারত। তাই বাধ্য হয়েই বেশি খরচে বিকল্প গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাদের। ফলে চিকিৎসার জন্য ভারতের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। কিন্তু অনেকেরই এ দেশগুলোয় চিকিৎসার খরচ ও ভ্রমণ ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই। এমন বাস্তবতায় চীন সরকারের উপহার বাংলাদেশের জন্য সত্যিই আশীর্বাদ।
মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি হলো চিকিৎসাসেবা, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশের উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, চিকিৎসাব্যবস্থার মান আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় এখনও পিছিয়ে। আশার কথা, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চীন আমাদের বড় অর্থনৈতিক সহযোগী দেশ। চীনের সহায়তায় সংস্কার ও আধুনিকায়ন হলে অনেক সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে। সেবার মান হবে আরও উন্নত। নিঃসন্দেহে এ মেগা বিনিয়োগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। এতে রোগীদের অর্থ ও সময় নষ্ট করে আর বিদেশে ছুটতে হবে না। দেশেই নিশ্চিত হবে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা। এই মুহূর্তে প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের আন্তরিকতা জরুরি। প্রকল্পটির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে মানুষের চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে।