কৃষি খাত
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:১১ পিএম
আফতাব চৌধুরী
আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিকাজ। রিজার্ভ ব্যাংকসহ দেশের অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থার বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ এখনও গ্রামে বাস করে এবং তাদের অধিকাংশেরই জীবিকা হলো কৃষিকাজ। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের উৎসের দিকেও দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, দেশের জাতীয় আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ এখনও কৃষিক্ষেত্র থেকেই আসছে এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের গঠনে এই কৃষিক্ষেত্রের অবদান হলো প্রায় ১০ শতাংশ। অবশ্য স্বাধীনতা লাভের পর এদেশে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে জাতীয় আয়ের ক্ষেত্র গঠনে কৃষিক্ষেত্রের অবদান দিন দিন কমেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে এটা অবশ্যই ভালো লক্ষণ। দেশের আর্থিক উন্নয়নের কথা ভাবতে গিয়ে পরিকল্পনাবিদদের একথা সব সময় মনে রাখতে হয় যে, এই মুহূর্তে বিশ্বের জনবহুল দেশের জন্যসংখ্যা ১.৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য জোগানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই তারা এই কাজ করে এসেছেন এবং এখনও করছেন। এর ফলে এদেশে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এদেশে কৃষিক্ষেত্রের স্থায়ী উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এখন প্রশ্ন, কেন হয়নি?
স্বাধীনতার পরই দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশের আর্থিক উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। সরকার সব সময়ই কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। তবে দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর আসল কাজটি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ওই বছরের গোড়ার দিকে সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশ অনুসারে ১৯৮৫ সাল থেকে নিবিড় জেলাভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সেই সব জেলাকে চিহ্নিত করা, যেখানে অধিক ফসল ফলানোর উপযোগী পরিকাঠামো ও পরিবেশ রয়েছে এবং সেখানকার কৃষকদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা নতুন কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হয়। সরকার এই কাজে সফলও হয় এবং তার ফলে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যায়; যাকে ‘সবুজ বিপ্লব’আখ্যা দেওয়া হয়।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার যখন এভাবে কাজ শুরু করে, ঠিক সেই সময় কৃষিবিজ্ঞানী নরম্যান বেরোলগের নেতৃত্বে একদল কৃষিবিজ্ঞানী কয়েকটি খাদ্যশস্যের উচ্চফলনশীল বীজ উদ্ভাবনে সক্ষম হয়। এই বীজগুলো থেকে পাওয়া চারা গাছগুলো খর্বাকৃতির হয় এবং তুলনামূলক কম সময়ে মাটি থেকে অধিক খাদ্য ও পানি শোষণ করে অধিক ফলনের উপযোগী হয়। প্রথমে গমের জন্য এ ধরনের বীজের উদ্ভাবন হলেও পরে ধানের জন্যও উচ্চফলনশীল বীজের উদ্ভাবন হয়। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রীর উদ্যোগে ১৫০ টন উচ্চফলনশীল গমের বীজ আমদানি করা হয় এবং তা ব্যবহার করে দেখা যায় যে, সত্যিই এ ধরনের বীজ এদেশেও গমের উৎপাদন অভূতপূর্ব হারে বাড়িয়ে দিতে পেরেছে। এ ঘটনার পর কৃষিবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে কৃষিবিজ্ঞানীরাও দেশের পরিবেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল গম ও ধানের বীজ উদ্ভাবন করে করতে সক্ষম হন। এর পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যশস্যের জন্যও উচ্চফলনশীল বীজের উদ্ভাবন করে তা নিয়ে চাষ শুরু করা হয়। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কৃষি গবেষণাকেন্দ্র ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে নতুন ধরনের বীজ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। এক্ষেত্রে জিন প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে এমন সব বীজ উদ্ভাবন করা হয়, যেগুলো বন্যা, খরা প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে সক্ষম। তা ছাড়া এই বীজগুলোতে কোনো ধরনের রোগ-সংক্রমণ হয় না এবং পোকামাকড়ের আক্রমণেও এগুলোর কোনো ক্ষতি হয় না। এ বীজকে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) বীজ বলা হয়। এভাবে বিভিন্ন কৌশল ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ফলে দেশের কৃষিক্ষেত্রে বিশেষত খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও অভূতপূর্ব সাফল্য আসে। দেশের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ না বাড়লেও খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়ে যায় বহুগুণ। এর ফলে আজ যে কেবল খাদ্যশস্য উৎপাদনে শুধু স্বনির্ভর হয়েছে তা নয়, খাদ্যশস্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে।
বিজ্ঞান ও নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে দেশের কৃষিক্ষেত্রে এই চূড়ান্ত উত্তরণের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে ভয়ংকর সমস্যা। আর সেই সমস্যা শুরু হয়েছে উচ্চফলনশীল বীজগুলো ব্যবহার করে চাষাবাদ করতে গিয়েই। এসব বীজ ব্যবহার করে চাষাবাদের অন্যতম শর্তই হলো কৃষিজমিতে প্রচুর পানির জোগানের প্রয়োজনীয়তা এবং সেই সঙ্গে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। কিন্তু দেশে এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না; তাই বাধ্য হয়েই ভূগর্ভস্থ পানিকেও কাজে লাগাতে হয়েছে। তা ছাড়া পাঁচ দশক ধরে কৃষিক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারের কারণেও শুধু মাটি নয়, দূষিত হয়ে চলেছে বায়ু ও পানি। জমিতে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ সার ব্যবহার করা হচ্ছে, তার যতটুকু চারা গাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অংশ মাটিতে মিশে যাচ্ছে। সেই মাটি আবার ভূপৃষ্ঠের পানিকে দূষিত করছেই, তার সঙ্গে মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও দূষণ ঘটাচ্ছে। শুধু তাই নয়, একই জমিতে বারবার চাষ করার ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, জমির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে, জমির অম্লত্ব বেড়ে যাচ্ছে, এমনকি মাটির জীবাণুঘটিত স্বাভাবিক কাজকর্মও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; যার নিট ফল হচ্ছে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। আর তার ফলে দেশের কৃষি উৎপাদনও যে কমে যাবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞানীরা এসব সমস্যার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সবাই এখন ভাবতে শুরু করেছেন, একসময়ের খাদ্য সংকটের মোকাবিলার জন্য এসব উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করে চাষবাস করাকে আশীর্বাদ বলে মেনে নেওয়া কি সত্যিই যুক্তিসংগত ছিল? এর উত্তরে সরাসরি ‘না’ বলা যাবে না। তবে এসব তথ্য ও সমস্যার কথা জানার পর আমাদের সবাইকে এবার ভাবতেই হবে এ ধরনের চাষকে আর চালিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে কি না।
এ কথা ঠিক যে, স্বাধীনতার অব্যাহিত পরই বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের খাদ্য সংকটের মোকাবিলার জন্য এত সব ভাবার অবকাশ আমাদের ছিল না। তাই সে সময় যেনতেন প্রকারে খাদ্যের উৎপাদান বাড়ানোটাই আমাদের কাছে একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ আমরা সে সময়টা পেরিয়ে এসেছি। আজ আমাদের ভাবতে হবে, দেশের খাদ্য-সুরক্ষা বজায় রেখে কীভাবে দেশের কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যাগুলো দূর করে কৃষির স্থায়ী উন্নয়ন ঘটানো যায়।আসলে একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রের সুস্থায়ী উন্নয়ন তখনি সম্ভব হবে, যখন দেশের খাদ্যের জোগান সুরক্ষিত রেখে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা যাবে। আর তা করতে হলে পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় আছে বলে কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করছেন না। তাদের মতে, আর বিন্দুমাত্র কালবিলস্ব না করে ভূগর্ভস্থ পানির অপব্যবহার ও যথেচ্ছ রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে কেবল ভূপৃষ্ঠের পানি ও জৈব সার ব্যবহার করে এবং জৈব কৃষি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই এবার দেশের কৃষিকাজ সম্পন্ন করতে হবে। তা করা না হলে দেশের মানুষের বিপদ বেড়েই চলবে। এজন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণাকে যাতে আরও উন্নতমানের করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে নজর দিতেই হবে। দেশের উন্নতির জন্য কৃষির সার্বিক ও সুস্থায়ী বিকাশই যে অন্যতম প্রধান শর্ত তা আমাদের মানতেই হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে যেমন অনেক কিছু করতে হবে, ঠিক তেমনি দেশের সব স্তরের নাগরিকদের সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যদি এ ব্যাপারে আমরা উদাসীন থাকি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দোষী বলে চিহ্নিত হব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।