কীটনাশক
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ২১:৪৬ পিএম
মো. অহিদুর রহমান
দেশের কৃষক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, হাওরের বাঁধ ভাঙা, বীজ সংকট, কৃষিপণ্যের উচ্চমূল্য, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ বহুমাত্রিক সমস্যা সামাল দিয়ে দেশের মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন। অথচ সেই কৃষক খাদ্যযোদ্ধাদের অনেকেই শারীরিক ঝুঁকি নিয়ে এসব কাজ করতে গিয়ে ক্যানসারসহ নানান মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হন। এর দায়ভার কার?
কৃষকের লোকজ্ঞানে মাটি-পানি-বায়ুর ক্ষতি না করে, নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে, নিজের পছন্দের খাদ্য উৎপাদন, নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য খেতে পারা, বীজ সংরক্ষণ করা ও ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং খাদ্যের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়েই কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা চর্চা করে আসছেন।
যে কৃষক একসময় জমিতে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতেন না। তারা এই ব্যবহারকে হারাম মনে করতেন। তখন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন হতো। মানুষের মাঝে রোগবালাই কম ছিল। সবুজ সতেজ নিরাপদ খাদ্য মানুষকে সুস্থ রেখেছে যুগের পর যুগ। পুঁজিবাদী বিশ্বের ব্যবসায়ী হামলে পড়ল কৃষির ওপর, তাদের ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করতে শুরু করলেন। দেশ থেকে ব্যাঙ উধাও হয়ে গেল। পোকা বেড়ে গেল। কীটনাশক ব্যবহার শুরু হলো। কীটনাশক, রিপিট ব্যবহারের ফলে প্রকৃতির লাঙল কেঁচো মরে গেল, ব্যাঙ, সাপ, অণুজীব, নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। মাটি অনুর্বর ও অসুস্থ হয়ে গেল। অধিক ফসল ও অধিক লাভের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, কৃষি, বীজ, সার নিজেদের জিম্মায় নিয়ে গেল। কৃষক সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন কোম্পানির বীজ, সার, বিষ, কীটনাশক ও পরামর্শের ওপর। নিষিদ্ধ ও মারাত্মক কীটনাশক ব্যবহারে কৃষির সঙ্গে যুক্ত নারী-পুরুষ আক্রান্ত হচ্ছেন ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে। এখন বিষছাড়া আর কৃষি চলে না। জৈববালাইনাশক কৃষক আর ব্যবহার করেন না।
প্রতিদিন পোকার আক্রমণ থেকে কৃষক সরাসরি বা বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে কৃষি উন্নয়নকর্মীদের কাছে ও কীটনাশকের দোকানের কাছে জানতে চান ফসলের রোগবালাই থেকে রক্ষা পেতে কোন ‘বিষ’ ব্যবহার করা উচিত? তারা পোকা দমন না হওয়া পর্যন্ত বিষ ব্যবহার করতেই থাকেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু অনেক সময় বালাই আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও যা সামান্য পরিচর্যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কৃষকরা তাতে দুশ্চিন্তায় পড়েন এবং বালাই বিক্রেতার পরামর্শে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করেন। এমন প্রবণতা বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় চার-পাঁচ দশক ধরে ক্রমবর্ধমান হারে দেখা যাচ্ছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের নিরাপদ খাদ্য দিবসের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার ফল উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। দেখা গেছে, দেশের মোট ক্যানসার রোগীর এক-তৃতীয়াংশই কৃষক বা কৃষির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, হাসপাতালে যত ক্যানসার রোগী আসেন তার ৬৪ শতাংশ হলো কৃষক। দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২০ সালে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ছিল দেড় লাখেরও বেশি এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যু হয়েছিল এক লাখের অধিক। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫ লাখ ক্যানসার রোগী রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু নিবন্ধিত রোগীদের ভিত্তিতে নেওয়া। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কৃষকদের ক্যানসারের মধ্যে বেশিরভাগেরই ফুসফুস, পাকস্থলী, স্বরযন্ত্র, ঠোঁট ও মুখগহ্বর এবং খাদ্যনালির ক্যানসার হচ্ছে। যদিও ক্যানসারের নানাবিধ কারণ রয়েছে, তথাপি লক্ষণ ও প্রবণতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সবুজ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে কৃষিতে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার, সেগুলোর ভুল হ্যান্ডলিং অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে বালাইনাশক ব্যবহারের পদ্ধতি, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কৃত্রিম বালাইনাশক মূলত একটি বিষ, যা প্রধানত ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড়, রোগজীবাণু ও আগাছা দমনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মূল ব্যবহারকারী হলেন কৃষক ও কৃষিকর্মীরা।
বালাইনাশক পাউডার বা তরল আকারে বাজারে পাওয়া যায়। কৃষক বাজার থেকে এটি ক্রয় করে নিয়ে যান এবং সাধারণত অনিরাপদভাবে ঘরে সংরক্ষণ করেন। প্রয়োগের দিন বোতল বা প্যাকেট খোলার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। হাতমোজা, মাস্ক কিংবা চশমা পরার অভ্যাস নেই। পাউডারজাত বালাইনাশক কাটার সময় সরাসরি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা নাকে প্রবেশ করতে পারে বা ত্বকের সংস্পর্শে এসে শরীরের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। ফলে নাক, কান, চোখ, মুখের মাধ্যমে বিষ শরীরে প্রবেশ করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে পৌঁছে যায়। বিষপ্রয়োগের পর অবশিষ্ট বালাইনাশক বোতল বা প্যাকেট অনেক সময় বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় বোতলের গায়ে লেগে থাকা বিষ শুকিয়ে বাতাসে মিশে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও আক্রান্ত করতে পারে। আবার বিষ শেষ হয়ে গেলে খালি বোতল বা প্যাকেট যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। ক্ষেত্রবিশেষে বিষপ্রয়োগের পর কৃষকরা কাপড় না ধুয়ে সেটিই পরে থাকেন বা হাত-মুখ ধোয়ার পরও যথাযথ পরিষ্কার না করেই খাবার গ্রহণ করেন। এসব অভ্যাসের ফলে বিষ পাকস্থলীতেও প্রবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবে চলতে থাকার কারণেই কৃষক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সবার চাহিদা। যদি তার উৎপাদন প্রক্রিয়াটি অনিরাপদ হয়, তবে ফসল কখনও নিরাপদ হবে না। এক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভালকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকদের বালাইনাশক সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে বালাইনাশকের সঠিক ব্যবহারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা দরকার। তাতে ফসল ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত হয়। বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর সংস্পর্শ পারকিনসন রোগ, হাঁপানি, বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা ব্যাধি এবং লিউকেমিয়া ও নন-হজকিন লিম্ফোমার মতো মারাত্মক ক্যানসারের কারণ হতে পারে।
অথচ সামান্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বালাইনাশক ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ পরার অভ্যাস গড়ে তুললে কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এখন সময় এসেছে কৃষিব্যবস্থায় কৃত্রিম বালাইনাশকের বিকল্প খুঁজে বের করা এবং নিরাপদ ও টেকসই কৃষি পদ্ধতি গড়ে তোলার। বালাইনাশকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। যদি কৃষকরা এতে আক্রান্ত হন, তবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও সংকটে পড়বে, যা সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে পারে। এ বিপর্যয় রোধ করতে হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ড, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ দেশটির প্রথম সারির প্রায় সব গণমাধ্যমে একটি তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫২৭টি পণ্যে ইথিলিন অক্সাইড খুঁজে পেয়েছে। এসবের বেশিরভাগই বাদাম এবং তিলবীজ (৩১৩), ভেষজ ও মসলা (৬০), ডায়েট জাতীয় খাদ্য (৪৮) এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য (৩৪)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক ধরনের রঙহীন গ্যাস ইথিলিন অক্সাইড; যা ভারতীয় পণ্যগুলোতে কীটনাশক ও জীবাণুমুক্ত করার রাসায়নিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সাধারণত এই রাসায়নিক চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করা এই রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে তা অন্যান্য ক্যানসারের পাশাপাশি লিম্ফোমা এবং লিউকেমিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। কীটনাশকমুক্ত জীবন গড়ি। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করি। আসুন কীটনাশকের ব্যবহার কমাই।