যোগাযোগ
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ২১:৪২ পিএম
মো. ইলিয়াস হোসেন
লেখার শুরুটা ঈদুল ফিতরের আগের ঢাকার যানজটের একটা প্রেক্ষাপট দিয়ে। ১ মার্চ, ২০২৫-এর ঘটনা। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম মেট্রোতে করে মতিঝিল এবং পরবর্তী সময়ে নতুন ট্রেনে করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত যাব। যেই সিদ্ধান্ত, সেই কাজ। সকাল ৯টায় বাসা থেকে বেরিয়ে পল্লবী স্টেশনে পৌঁছলাম। মেট্রোতে উঠতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট খেলাম। প্রচণ্ড ভিড়ে প্রথমবার ব্যর্থ হলাম। পরে একরকম ধাক্কাধাক্কি করেই কোনোরকমে দাঁড়ানোর জায়গাটুকু করতে পারলাম। ট্রেন চলল, প্রতিটি স্টেশনে যাত্রী আরও বাড়তে থাকল। ফলে যাত্রীর চাপাচাপিতে কোনোরকম সাপোর্ট ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকলাম, একসময় মতিঝিল এসে পৌঁছলাম। লাগল মাত্র ৪০ মিনিট। প্রিয় পাঠক, বাংলাদেশের একমাত্র মেট্রোরেল (লাইন-৬) যা ২৮ ডিসেম্বর, ২০২২-এ প্রাথমিকভাবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু হয়েছে; যা পরে মতিঝিল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। চলতি বছরের শেষনাগাদ হয়তো তা কমলাপুরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এ লাইন উদ্বোধনের ফলে বাংলাদেশের গণপরিবহন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এটি দেশের প্রথম মেট্রোরেল, যা দ্রুতগতির এবং বিরতিহীন পরিবহনব্যবস্থা, যা ইতোমধ্যে শহরের অতিরিক্ত যানজট থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ তথা কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য অন্যতম কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে। অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় মেট্রোরেলে নিরাপত্তা ও আরাম এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর ফলে এ পরিবহনে যাতায়াত ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল টিকেটিং ও কার্ডের মাধ্যমে সহজে যাতায়াত করার সুবিধা থাকায় জনসাধারণ এতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল, যেমন টিকিট সংগ্রহের দীর্ঘ সারি, কার্ড ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা ও সাধারণ মানুষের অসচেতনতা যা ধীরে ধীরে সমাধান হচ্ছে এবং যাত্রীর সংখ্যাও ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা মেট্রোরেল ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও সম্পৃক্ততা ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে এ পরিবহন উত্তরা থেকে সকাল ৭টায় ছেড়ে আসে এবং রাত সাড়ে ৯টায় মতিঝিল থেকে ছেড়ে উত্তরায় পৌঁছায়। বর্তমানে প্রতিদিন এ লাইনে গড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী চলাচল করছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বাধিক ৪ লাখ ৩ হাজার ১৬৪ জন যাত্রী চড়েছে। এজন্য কর্তৃপক্ষ যাত্রীচাপ মোকাবিলায় এ বহরে আরও কোচ সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে ২ কোটি ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর এ তিলোত্তমা রাজধানী ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম মোকাবিলায় কেবল একটি মেট্রোলাইন যথেষ্ট নয়। যদিও আরও দুটি লাইনের (লাইন-১ ও লাইন-৫) কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, বিগত সরকারের আমলে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছে, যার ব্যবস্থাপনায় মোট ছয়টি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল লাইন-৬-এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে তা চলমান রয়েছে। এ মেট্রোলাইনটি এলিভেটেড হওয়ায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলে যে পরিমাণ ট্রাফিক জ্যাম কমার কথা ছিল তা হয়নি। তবে এটা মাটির নিচ দিয়ে অর্থাৎ পাতালরেল হলে হয়তো ট্রাফিক জ্যাম আরও কমতে পারত। তারপরও ওই এলাকার যাত্রীদের কাছে এটা একটা বিশাল প্রাপ্তি ও স্বস্তিদায়ক ব্যবস্থা।
ঈদুল ফিতরের টানা নয় দিনের ছুটি স্বস্তির ঢাকা পেলেও আবারও রাজধানী তার চিরচেনা রূপে। স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং রাজধানীর সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন বেড়ে যাওয়ায় এ যানজট। প্রায় সব সড়কে থেমে থেমে দিনভর তীব্র যানজট। যানজটের কবলে কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ ও সাধারণ যাত্রী। ভোগান্তি যেন নাগরিকের নিয়তি। এ কথা সত্য, সড়কপথে যখন সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহনের সংখ্যা সড়কের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, তখন যানবাহনগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। তাই যানজটের এ দুর্ভোগ স্থায়ীভাবে নিরসনে দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বিগত সময়ে নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজন নতুন কিছু পরিকল্পনাও।
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম নগরী, যার আয়তন ১৮০০ থেকে ২০০০ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে এ মেগা শহরে ২২ থেকে ২৪ মিলিয়ন লোকের বসবাস, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১২% থেকে ১৩%। জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম শহর। প্রতিনিয়তই এ শহরে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবিকার তাড়নায় রাজধানীতে যে হারে নতুন মানুষের আগমন ঘটছে তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে এর জনসংখ্যা ২৮ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর মধ্যে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা হাজারো বহুতল ভবন, কলকারখানা, আবাসন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং মাশরুমের মতো গজিয়ে ওঠা বস্তির কারণে ঢাকা শহর আজ পরিণত হয়েছে ইটপাথরের এক জঙ্গলে। ফলে নাগরিকসুবিধা প্রদানকারী সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। জনগণের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে। একাধারে নতুন নতুন গাড়ির প্রতিনিয়ত অভিষেক, আর জাতীয়ভাবে ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতায় জীবিকার তাগিদে নিঃস্বদের রাজধানীতে আগমন মেগা শহর ঢাকাকে করে তুলেছে বসবাস-অযোগ্য। আর রাজধানীতে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ও অপর্যাপ্ত রাস্তার ওপর পড়ছে অপরিসীম চাপ। যার ফলে মেট্রোপলিটন ঢাকা আজ ট্রাফিক জ্যামের কারণে হয়ে পড়েছে স্থবির। দিনের বেশিরভাগ সময় মধ্য ঢাকার অধিকাংশ এলাকা ট্রাফিক জ্যামের কারণে ফ্রিজ হয়ে থাকছে। সাধারণ মানুষ সময়মতো কোনো কাজ করতে পারছে না। ফলে অপচয় হচ্ছে ব্যস্ত লোকের কর্মঘণ্টা (দৈনিক প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা) আর বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তরল সোনা জ্বালানি তেলের। আর্থিক মূল্যমানে যার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা এবং বছরে ৫০ হাজার কোটির অধিক। যেকোনো মেগা শহরের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এলাকাজুড়ে সড়ক থাকার কথা থাকলেও ঢাকা শহরে আছে মাত্র ৫-৬ শতাংশ, যা নিতান্তই কম। তা ছাড়া ২২-২৩ মিলিয়ন লোকের চাপ শুধু একমুখী যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। বিজ্ঞজনেরা এ সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে অনেক মূল্যবান মত দিয়েছেন।
ঢাকা শহরের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৫৪ শতাংশ বহন করে রিকশা, ২৮ শতাংশ বহন করে বাস, ৭ শতাংশ টেম্পো/অটোরিকশা, প্রাইভেট কার বহন করে মাত্র ৯ শতাংশ। অন্য দিকে রিকশা রাস্তার ৪১, প্রাইভেট কার ৩৯, টেম্পো/অটোরিকশা ১১ এবং বাস ৭ শতাংশ জায়গা দখল করে চলাচল করে। উল্লেখ্য, রিকশা ৪১ শতাংশ জায়গা দখল করলেও ৫৪ শতাংশ ট্রাফিক একাই বহন করে। এতে এটা স্পষ্ট যে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মুখ্য কারণ রিকশা নয়, বরং প্রাইভেট কার (Cars), যা রাস্তার ৩৯ শতাংশ এলাকাজুড়ে চলাচল করলেও মাত্র ৯ শতাংশ ট্রাফিক বহন করে। এ অবস্থায় শুধু উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হলে কারসহ অন্যান্য মোটরযানের সুবিধা হবে, এতে কোনোভাবেই রিকশার ওপর নির্ভরশীল ট্রাফিকের কোনো উপকার হবে না। বরং উড়ালসড়ক নির্মাণের ফলে প্রাইভেট কার এবং ছোট গাড়ি আমদানিতে জনগণ আরও উৎসাহী হবে এবং সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থা ট্রাফিক জ্যাম কমাতে সহায়তা করলেও কয়েক বছরের মধ্যে আবার আগের মতো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। অন্যদিকে পাতালরেল নির্মাণ করা হলে সব ধরনের যাত্রী বিশেষ করে রিকশা/টেম্পোর যাত্রীই তা বেশি ব্যবহার করবে। ফলে চাপ কমবে রিকশা এবং টেম্পোর ওপর এবং পর্যায়ক্রমে ঢাকা শহর থেকে রিকশাও কমে যাবে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণা তথ্যেও এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, উড়ালসড়কের চেয়ে পাতালরেলই ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে বেশি ভূমিকা রাখবে। সেই প্রেরণা এবং গবেষণা থেকেই সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ এবং ট্রাফিক জ্যামমুক্ত করার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে বা পাতালরেল তৈরির নিমিত্ত ২০০২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার পর পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ ফরম্যাটে জাপানের একটি কোম্পানি স্থানীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে ওই টেন্ডারে যৌথভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। উল্লেখ্য, ওই কাজে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ৬০ শতাংশ লোনসহায়তা প্রদানে সম্মত হয়। কিন্তু বিভিন্ন সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তা আগে বাড়েনি।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা এবং আর্থিক সংশ্লেষসহ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৎকালীন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। বোধকরি তারই আলোকে বিগত সরকার বিভাগীয় শহরের সঙ্গে রাজধানীকে সংযোগ করতে আন্তঃবিভাগীয় সব সড়ককে চার লেনে উন্নীত করাসহ ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে উড়ালসড়ক এবং পাতালরেল দুই-ই নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ৩ জুন, ২০১৩ সালে শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) গঠন করা হয়। ডিএমটিসিএল ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে আগের পরিকল্পিত ছয়টি লাইন নতুনভাবে রিঅ্যালাইন্ড করে অনুমোদন করে। একই সঙ্গে এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রাবাড়ী এবং উত্তরা থেকে আশুলিয়া হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত উড়ালসড়ক ( এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে এয়ারপোর্ট থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত উড়ালসড়ক এবং উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের লাইন-৬-এর নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে; যা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। লাইন ১ এবং লাইন-৫-এর কাজও শুরু হয়েছে।
বর্ণিত ছয়টি রুটের উপরোক্ত লেআউট দ্বারা ক্রমবর্ধমান ঢাকার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ডিএমটিসিএল কর্তৃক পরিকল্পিত সব কটি মেট্রোলাইন জরুরি ভিত্তিতে শুরু এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সব উড়ন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরে নতুন নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সীমিত করতে হবে। এতে বর্তমান ট্রাফিক জ্যামের কারণে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা এবং জ্বালানি তেলের অপচয় হচ্ছে তা থেকে জনগণ ও দেশ দ্রুত মুক্তি পাবে এবং একই সঙ্গে উন্নত বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক শহরের মতো আমাদের ঢাকাও আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।