মাদকাসক্তি
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৫ ২০:৪০ পিএম
সিরাজুল ইসলাম
মাদকাসক্তি বিকাশের অন্যতম কারণগুলো হলো পরিবেশ; আপনার আমার পরিবারের বিশ্বাস এবং দৃষ্টিভঙ্গি যা মাদক ব্যবহারের প্রতি এগিয়ে নিতে বাধ্য করে বা এমন একটি সমকক্ষ গোষ্ঠীর সংস্পর্শ যা মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করে। তবে পরিবেশগত কারণগুলো প্রাথমিকভাবে মানুষকে ড্রাগ ব্যবহারে আকৃষ্ট করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ মাদক প্রতিরোধে কাজ করা সব সংস্থার অভিমত।
প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা বরাবরই দেশ ও দেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে বেশ কিছু সামাজিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থে পরিচালিত করে আসছে। ২০১৮ সালে প্রশিকায় মাদক প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সংস্থায় অর্থসংকটের কারণে কর্মসূচিটি এর আগে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালের আগে প্রশিকা চরম অর্থসংকটে ছিল। তবে ২০১৭-১৮ সালের দিকে মাদক বিষয়টি বাংলাদেশে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। সময়োপযোগী সে আলোড়নে সাড়া দিয়ে প্রশিকা ‘মাদক প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি’বিষয়ক এ কর্মসূচিটি হাতে নিয়েছিল এবং এ কর্মসূচিটি যাতে আইনি বৈধতা নিয়ে দেশের সর্বত্র কাজ করতে পারে সেজন্য মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রশিকাকে একটি সনদ প্রদান করেছে; যা প্রতি বছরই নবায়ন করা হয়।
আমরা জানি, নেশার জগৎ মানে একটা অন্ধকার জগৎ। এ অন্ধকার জগৎ থেকে মাদকাসক্তদের মুক্ত করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের পরিবার, সমাজ তথা দেশ প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রশিকা প্রথমেই উপলব্ধি করে একমাত্র যুবসমাজই পারবে মাদ্রকাসক্তি থেকে সমাজ ও দেশকে পরিত্রাণ দিতে। এ উপলব্ধি থেকে মাদক প্রতিরোধে প্রশিকা পরিকল্পনা করে কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করে দেশের যুবসমাজ ঘিরে। কারণ আজ যারা ছাত্রছাত্রী তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই তাদেরই প্রাথমিক অবস্থায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, সর্বোপরি দেশের জন্য।
২০১৮ সাল থেকে প্রশিকা প্রাণান্তকর চেষ্টায় ৪৩ জেলায় এ কার্যক্রম চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এ জেলাগুলোয় প্রশিকা অন্যান্য কর্মসূচি পরিচালনা ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি ‘মাদক প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি’ বিষয়ক কর্মসূচিটি পরিচালিত ও বাস্তবায়িত করে আসছে। এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেশের মাদকের চাহিদা হ্রাসের লক্ষ্যে যেভাবে বা যে কৌশলে কাজ করে আসছে এবং অন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোও সে কৌশলগুলো অনুসরণ করে কাজ করছে। প্রশিকাও এর ব্যতিক্রম নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রও নিয়মিতভাবে সারা দেশে মাদকদ্রব্য গ্রহণ প্রতিরোধে বিভিন্ন গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করছে। ৪৩ জেলার প্রায় ৮ হাজার গ্রামে প্রশিকা মাঠ পর্যায়ের ব্রাঞ্চ অফিসের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় অফিসের পরিচালনায় বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং আমাদের অর্থবছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করছে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে মাদকমুক্ত রাখার জন্য প্রশিকার প্রয়োগকৃত প্রধান কৌশলগুলো হলো প্রশিকার বাছাইকৃত ও পরিকল্পিত এলাকাগুলোয় প্রশিকারই একটি পর্যবেক্ষকদল প্রথমে পরিদর্শন করে নির্ধারণ করে কোন প্রক্রিয়ায় ওই এলাকায় কাজ করতে হবে। সে অনুযায়ী সেসব এলাকায় স্কুল-কলেজগুলোর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মাদকের কুফলগুলো নিয়ে জনসচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করে এবং সে আলোচনায় সমাজের ও সরকারি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকেন। তারা তাদের ব্যক্তিজীবনের কাহিনী পর্যালোচনার মাধ্যমে মাদক সম্পর্কিত নানা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, যা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া প্রশিকা এর বিভিন্ন কর্মএলাকায় মাদকবিরোধী পোস্টার, স্টিকার, লিফলেট বিতরণ, শর্টফিল্ম প্রদর্শন, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফেস্টুন/পোস্টার প্রদর্শন এবং এসব কাজ করার সময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে মাদক ব্যবহারের কুফল নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক বক্তব্য প্রদান করে। এভাবেই প্রশিকা তার ‘মাদক প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি’ কর্মসূচিটি সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাস্তবায়ন করে আসছে। কাজ করতে গিয়ে আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের গবেষণায় একটি খুব সাধরণ ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে। তা হলো, মাদকাসক্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের মাদকাসক্ত সদস্যদের ব্যাপারে কোনো তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকছে। কারণ পারিবারিক ঐতিহ্য ও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়। ফলে মাদকাসক্তদের বড় একটা অংশ তাদের আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে কোনো না কোনোভাবে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে।
আমরা জানি মাদক একটি জীবনবিধ্বংসী দ্রব্য। তার পরেও আমরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট নির্বিকার ও অসচেতন। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ বিশেষ করে পরিবার ও রাষ্ট্র যদি আর একটু সচেতন হই তাহলে মাদকের এ ভয়বহতা থেকে আমরা আমাদের সন্তানদের হয়তো রক্ষা করতে পারব। আমাদের টিমের পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করা লোকেরা সাধারণত মাদক গ্রহণে তাদের যে সমস্যাগুলো হয় তা অস্বীকার করে এবং বেশিরভাগই চিকিৎসা নিতে দ্বিধাবোধ করে। পরিবার বা কোনো সংস্থা যদি এ ব্যাপারে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের চিকিৎসার জন্য তাহলে হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই একটি জীবন বাঁচানো সম্ভব এবং এ রকম ইতিবাচক উদ্যোগ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।
যেহেতু এ ব্যাপারগুলো স্পর্শকাতর তাই আমাদের তাদের চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। এ উদ্যোগ পরিবার বা বন্ধুদের দ্বারা বা পেশাদারদের মাধ্যমে নিতে হবে এবং আসক্তির সঙ্গে লড়াই করা ব্যক্তির বিষয়ে চিকিৎসা প্রদানকারীদেরও যথেষ্ট যত্নশীল হতে হবে এবং অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সরাসরি তার সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ভূমিকা রাখতে হবে মাদকাসক্তদের আসক্তি দূরীকরণে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে হবে। আরও সচেষ্ট ও আন্তরিক হতে হবে সমাজ তথা রাষ্ট্রকে মাদকদ্রব্যের অবাধ ব্যবহার রোধে। একজন ব্যক্তি বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হয় এবং এটা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বের করা খুব কঠিন। তবে সুলভে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি একটা বড় কারণ, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কাজেই রাষ্ট্রকে অবশ্যই সাধারণদের মাঝে মাদকের এ সুলভে প্রাপ্তি ঠেকাতে আরও বেশি কঠিন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।