× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রেমিট্যান্স

উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রবেশে নীতিমালা গ্রহণের এখনই সময়

ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৫ ১৮:২৯ পিএম

উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রবেশে নীতিমালা গ্রহণের এখনই সময়

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে এ সূচকটি দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতিও অর্জন করেছে। বাস্তবে প্রবাসী আয় এতটাই গুরুত্ব বহন করছে, যা অন্য অর্থনৈতিক খাতগুলোর চেয়েও সবার নজর কেড়েছে। কেবল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই বাংলাদেশে ২৫২ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে- যা দেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাসী আয়। এর আগে ২০২৪ সালে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের নতুন রেকর্ড হয়। পুরো বছরে দেশে আসে প্রায় ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসেছে ২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার, যা এক মাসের রেমিট্যান্সের রেকর্ড এবং আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ২০২১ সালে ২২ বিলিয়ন ডলার।

চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি স্থির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা গেছে, যা বৈদেশিক রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। 

একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসীদের আয় ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে এবং সরকার অনাবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে স্বদেশে অর্থ প্রেরণ সহজ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারের নীতি, লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরকারি চ্যানেল ব্যবহারের জন্য অব্যাহত প্রণোদনা প্রবাসীদের মধ্যে বৈধ অর্থ প্রেরণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। রমজান এবং ঈদে প্রবাসীরা তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য আরও বেশি অর্থ প্রেরণ করার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। তবে রেমিট্যান্সের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেশের স্থিতিশীলতার প্রতি প্রবাসীদের আস্থা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং পুনরুদ্ধার অব্যাহত সমর্থন এটা নিশ্চিত বলা যায়। বিদেশি বিনিয়োগের খরা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক রিজার্ভের ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমের ক্রমাগত সম্প্রসারণের মুখে দেশের জাতীয় আয়-ব্যয় ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহ অপরিহার্য। প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সবশেষ খবর অনুযায়ী মার্চের প্রথম ২৬ দিনে দেশে রেকর্ড দুই দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৮২ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। ঈদুল ফিতরের কারণে রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ বাড়ে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পুনরুজ্জীবন, গ্রামীণ অর্থনীতি স্থিতিশীল করার পাশাপাশি রেমিট্যান্স আমদানি পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশে রেমিট্যান্সকে অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। চলমান ডলার সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য রেমিট্যান্স বৃদ্ধি অপরিহার্য। তাই সরকারের উচিত আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ও পরিমাণের ওপর বিশেষ মনোনিবেশ করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্স পারিবারিক আয়, স্থানীয় অর্থনীতি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক উন্নয়ন বাড়িয়ে তুলতে পারে। রেমিট্যান্স কেবল গ্রামের জনসংখ্যার জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করে না বরং পারিবারিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক বিনিয়োগও উৎসাহিত করে।

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ খাত তাই প্রত্যাশা থাকবে অন্তর্বর্তী সরকার রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কৌশলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেবে, বিশেষ করে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন, বর্তমান এবং সম্ভাব্য বিদেশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চ মজুরির ক্ষেত্রগুলোয় কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া ও অন্যান্য বিষয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এ ধারণা দূর করার চেষ্টা করে আসছে যে এটি কেবল স্বল্প-দক্ষ শ্রমের জায়গা। বাস্তবে এ বিষয়ে নীতিগত উন্নতি প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্রে বিড়ম্বনার অভিযোগ, আইনি জটিলতা, ভিসাসংক্রান্ত সমস্যা নিরসন এবং সময়োপযোগী সহায়তা প্রদান প্রবাসী কর্মীদের স্থিতিশীলতা এবং সুস্থতা বৃদ্ধি করে। এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধানে বাংলাদেশি দূতাবাস এবং কনস্যুলেটগুলোর জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দূতাবাসগুলোর উচিত বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেল এবং ডিজিটাল রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রদান করা, তাদের ব্যাখ্যা করা যে কীভাবে এ ব্যবস্থাগুলো প্রবাসী এবং তাদের পরিবারকে সাহায্য করতে এবং তাদের দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধির সহজ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও প্রবাসীদের সহায়তা করা। 

বহু বছর ধরে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে অভিবাসন হচ্ছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছিলেন, যদি সব প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়, তবে তার প্রশাসন প্রথম পর্যায়ে মালয়েশিয়ায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর নতুন আগমনের বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশকে এখন ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করতে হবে। দক্ষ শ্রমশক্তি রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি করতে পারে। তাছাড়া প্রবাসী আয়ের সমস্যা সমাধানের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার চিহ্নিত করা এবং দক্ষ শ্রম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি প্রশিক্ষণ সুবিধার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মী প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল বৃদ্ধি, অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং একচেটিয়া কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সরকার রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারে। আমরা যদি রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও টেকসই করতে চাই, তাহলে প্রশিক্ষিত অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশি এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে কারিগরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ যাতে তারা প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা অর্জন করতে পারে। বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা, বিদেশি বাজারে কাজ করতে ইচ্ছুকদের লাইসেন্সিং এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সহজ করা, বিদেশি সরকার, পেশাদার সমিতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা, যাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের স্বীকৃতি বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশে চাকরির সুযোগ উন্মুক্ত হয়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়সসীমা ১৫ থেকে ২৯ বছর। বর্তমানে ৪ কোটি ৫৯ লাখ তরুণ-তরুণী রয়েছে। জনসংখ্যার সুফল পেতে হলে বাংলাদেশকে তাদের উচ্চমানের শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রদান করতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের আলোকে বাংলাদেশকে নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উচ্চ দক্ষতার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করতে হবে। দেশের শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

তাই বলা যায়, অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে প্রচারমূলক কার্যক্রমের ওপর মনোযোগ দিতে হবে, বিভিন্ন প্রণোদনা ব্যবস্থার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের উৎসাহিত করতে হবে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে হবে, সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন তুলে ধরতে হবে, নতুন সম্ভাব্য শ্রমবাজার চিহ্নিত করতে হবে এবং সম্ভাব্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা উন্নত করতে হবে। তবু এ প্রজন্মের (জেন-জেড) পরিবর্তনের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্যও তো নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার আরও বৈচিত্র্যময় করা সম্ভব। বর্তমান বাজারের কলেবর বৃদ্ধি করা, বয়স্ক ও কম জনসংখ্যার দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর জন্য সাহসী কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া, পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রবেশের নীতিমালা গ্রহণ করার এখনই সময়। ইউরোপীয় এবং আফ্রিকান দেশ, সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং জাপান প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারের সামগ্রিক কৌশল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বোঝা এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতায় রেমিট্যান্সের অবদান আরও সমৃদ্ধ করা যেতে পারে।

  • অধ্যাপক, লিঙ্গুইস্টিক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা