× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্মরণ

চেতনার উজ্জ্বল বাতিঘর

কাজী সালাহউদ্দীন

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ২০:৩৪ পিএম

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ

সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। আইনের শাসন, মূল্যবোধ এবং চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যেমন আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মনীষী এডমন্ড বার্ককে তার অকুতোভয় উচ্চকণ্ঠে সত্যের পক্ষে কথা বলার জন্য। উনিশ শতকে এ উপমহাদেশে সৈয়দ আমির আলির মতো মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। সিন্ধুতটের রুস্তম কায়ানির মতো নির্ভীক বিচারপতি ইতিহাসের কিংবদন্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। প্রজ্ঞা, বিবেক এবং মুক্তবুদ্ধি দিয়ে এরা অন্ধকার অবরুদ্ধ যুগে আলো জ্বালিয়েছিলেন। বিচারপতি মোরশেদ তাদেরই একজন উজ্জ্বল উত্তরাধিকারী। জাতিসংঘের প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল কুর্ট ওয়াল্ডহেইম বলেছিলেন, ‘বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা বিচারক।’

মূলত আপাদমস্তক তিনি ছিলেন এক মূল্যবোধের প্রতীক। তৎকালীন পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে বিচারকের ন্যায়দণ্ড একটি মুহূর্তের জন্যও অবনত বা ক্ষীণবল হতে দেননি। ষাটের দশকের সেই চরম অবক্ষয়ের যুগেও তিনি বিচারকের আসন সম্ভ্রম ও মর্যাদার উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্যই আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়। অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং অধিকার রক্ষার জন্যই আইনের সৃষ্টি। ন্যায়বিচারই হচ্ছে আইনের প্রথম এবং শেষ কথা।

বিচারপতি মোরশেদের ব্যক্তিত্বের প্রভা বিচারালয়ের চার দেয়ালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রগাঢ় মানবতাবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি। যুদ্ধোত্তর (১৯৪৩) ব্রিটিশ-ভারতে ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’ সংস্থাটির মাধ্যমে তিনি সক্রিয়ভাবে মানবতার সেবায় অংশ নিয়েছিলেন। দেশভাগের আগে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও দাঙ্গা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মা আফজালুননেসা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বোন। বাবা সৈয়দ আবদুস সালিক ছিলেন তৎকালীন বিসিএস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস)। একসময় বগুড়া ও দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৯২৬ সালে রাজশাহী বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সব প্রার্থীর মধ্যে তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতি শাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ অনার্স পাস করেন। পর্যায়ক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, এলএলবি উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৫ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডন যান। এ সময় তিনিই একমাত্র ভারতীয় ছাত্র ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালে কলেজ সংকলনের প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন তিনি। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। ১৯৩৮ সালে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কলকাতা হাই কোর্টে যোগ দেন। কয়েক বছর সেখানে অবস্থানের ফলে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্যে আসার। তার মধ্যে যাদের নাম উল্লেখ না করলে নয় যেমন অর্থনীতির খ্যাতিমান অধ্যাপক হ্যারল্ড। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেতা লাকি, রজনীকান্ত দত্ত (আর পিডি নামে খ্যাত) এবং যুক্তরাজ্যের ইন্ডিয়া লিগের প্রধান কৃষ্ণ মেননসহ অসংখ্য ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।

কলকাতা হাইকোর্টে যোগদানের পর যেসব মামলায় তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তার মধ্যে হলো বাগানের অগ্নিকাণ্ড মামলা, দমদম বিমানবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র মামলা, ভবানীপুর ব্যাংক ডাকাতি মামলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন দক্ষ আইনজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শুধু অর্থ উপার্জন নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল তার অন্যতম লক্ষ্য। কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন আইনবিষয়ক পরামর্শদাতা।

১৯৩৯ সালের ১১ অক্টোবর সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ কলকাতার মেয়র একেএম জাকারিয়ার মেয়ে লায়লা আরজুমান্দ বানুকে বিয়ে করেন। আইন পেশার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। চল্লিশের দশকে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ফিলিস্তিন নীতির তীব্র সমালোচনা করে ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় একটি লেখা প্রকাশিত হলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ‘কায়েদে আজম’ শীর্ষক লেখা ছাপা হলে সুধীমহলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্টে যোগ দেন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। রাজনীতির ক্ষেত্রে এ সময়টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং সধারণ নির্বাচন। বিচারকের আসনে বসেও জনগণের আশা পূরণের লক্ষ্যে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন সকল প্রকার বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে। অথচ তিনি সক্রিয় ছিলেন না রাজনীতির ক্ষেত্রে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে তার ভূমিকা চিরস্মরণীয় । ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক কমিটির বিচারপতি। ১৯৬৪ সালের ১৫ মে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন সৈয়দ মোরশেদ। তার বিচারিক জীবনে বাদী-বিবাদী, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান যেমন ছিল অসংখ্য মামলা তেমন ছিল সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে। যেমন মাহমুদ মামলা, সমাবর্তন মামলা, পান মামলা, মৌলিক গণতন্ত্র মামলা, মন্ত্রী সংঘটিত মামলা উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি মামলার কৌঁসুলিদের বক্তব্য তিনি ধৈর্যসহকারে শুনতেন। উপস্থিত যুক্তিতর্ক, পর্যালোচনা করে বিচারের রায় দিতেন। যে রায়ে ফুটে উঠত গভীর পর্যবেক্ষণ, নিজস্ব বিশ্লেষণ, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনসহ বিখ্যাত মনীষীদের উদ্ধৃতি। প্রতিটি রায়ই ছিল বৈদগ্ধ্যে সমৃদ্ধ, স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। বিচারক হিসেবে তিনি ছিলেন নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ। একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্তব্য করেছিলেন, ‘তিনিই একমাত্র বলিষ্ঠ ন্যায়বিচারক এবং নির্ভরশীল উদার ও উচ্চমানের বিচারক।’

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী কমিটি গঠনে বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ তৎকালীন সরকারের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি সে অনুষ্ঠানে সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন। ১৯৬৭ সালের ১১ নভেম্বর আইয়ুব সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন; যা ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব সরকার কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করলে মামলার অভিযুক্তদের পক্ষে বিচারপতি মোরশেদ সমর্থন জানান এবং তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক কৌঁসুলি হিসেবে যুক্ত হন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ স্যার টম উইলিয়ামসও তাদের পক্ষে ছিলেন। প্রথম সাক্ষাতে বিচারপতি মোরশেদ বলেছিনেন, ‘আমি আপনার সহকারী হিসেবে কাজ করে যাব।’ জবাবে টম উইলিয়ামস বলেছিলেন, ‘একজন প্রধান বিচারপতি সব সময়ের জন্যই প্রধান বিচারপতি।’

১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ১২ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে তার ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। এ সময় আইয়ুব খানের গোলটেবিল কনফারেন্সে তার বক্তৃতা সারা পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলীর তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। ব্রাজিল, জেনেভা, নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করে মানবাধিকার ও মূল্যবোধবিষয়ক অসামান্য বক্তব্য রেখে অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করেছিলেন তিনি। তার বিভিন্ন লেখায় কবি হাফিজ, সাদি, রুমি, ওমর খৈয়াম, জামি, ইকবালের বহু উদ্ধৃতির উল্লেখ আছে। ঢাকা হাইকোর্টে একটি রায়ে একবার তিনি শেকসপিয়রের সেই বিখ্যাত উক্তির উদ্ধৃতি ‘সিংহের মতো শক্তি থাকা আনন্দের কথা, কিন্তু সেই শক্তি দুর্বলের ওপর প্রয়োগ হলে তা হয় অত্যাচার’ পত্রপত্রিকায় ছাপা হলে বেশ সাড়া জাগিয়ে ছিল।

ধর্মে অনুরক্ত হয়েও তিনি ছিলেন সকল প্রকার গোঁড়ামির উর্ধ্বে। প্রখ্যাত আইনবিদ মি. বীরেন সরকার একবার বলেছিলেন, তিনিই একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি আদায়ের ব্যাপারে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ ছিল অভ্যন্ত দুর্গম এবং কণ্টকাকীর্ণ। এ দুর্গম পথের অন্যতম একজন কান্ডারি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। পরিতাপের বিষয়, আমরা তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা এবং মূল্যায়ন এখনও করতে পরিনি। অথচ তিনি ছিলেন কুৎসিতের বিরুদ্ধে সুন্দরের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে ঔদার্যের প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল এ সুন্দর পৃথিবী থেকে তিনি বিদায় নেন। আমাদের মধ্যে রেখে গেছেন অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি আমাদের চেতনার উজ্জ্বল বাতিঘর। আজ মৃত্যুদিবসে তার স্মৃতি ও আত্মার প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

  • কবি, মহাসচিব সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ স্মৃতি সংসদ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা