× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বপ্নপূরণের পথে প্রয়োজন উৎসাহ

নাছিমা বেগম

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৭:৪০ পিএম

স্বপ্নপূরণের পথে প্রয়োজন উৎসাহ

বিশেষভাবে সক্ষম প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্ট্রো আন সুলেভান ডেল পেরু (সিএএসপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক ড. লিলিয়ানা মায়োর নেতৃত্বে পেরু থেকে আগত একটি পেশাজীবী দল ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াস’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রশিক্ষণে এক হাজারের অধিক বিশেষ শিক্ষার্থীর মা-বাবা এবং অভিভাবক অংশ নেন। অত্যন্ত সময়োপযোগী সফল এ আয়োজনে আমারও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়।

আমার দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়েছি। শিক্ষাসফরে প্রতিবন্ধীবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছি। বিশেষ করে জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। শিক্ষণীয় অনেক কিছুই নিজ দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এতটা ইন্টার‌্যাকটিভ প্রশিক্ষণ আমি খুব কম দেখেছি। পেরুর ড. লিলিয়ানা মায়ো ওর্তিগার কথায় যেন জাদু আছে। এত বড় অডিয়েন্সের প্রত্যেকেই নিঃশব্দে তার কথা শুনছিলেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বারবার তিনি ‘স্বনির্ভর’, ‘কর্মক্ষম’ এবং ‘সুখী’ এ তিনটি শব্দ বলার চেষ্টা করেছেন এবং এর প্রায়োগিক দিক ব্যাখ্যা করেছেন। প্রশিক্ষণ শেষে অভিভাবকদের অনেকের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে। প্রত্যেকেই বলেছেন এ প্রশিক্ষণটি যদি আরও আগে পেতাম তাহলে আমাদের সন্তানরা স্বনির্ভর, কর্মক্ষম এবং সুখী জীবনযাপনে অনেক এগিয়ে থাকত।

ভিন্ন সক্ষমতার মানুষ : আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের এ বিশেষ সন্তানেরা এক একজন ভিন্ন সক্ষমতার মানুষ হলেও তাদের চাহিদাগুলো কিন্তু ঠিক আমাদের মতোই। তারা অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না। তাদের সিদ্ধান্তগুলো অন্য কেউ নিয়ে দিক এও তারা চায় না। তারা চায় না কেউ তাদের করুণা করুক, ভিন্নভাবে দেখুক। তারা শেখার সুযোগ চায় এবং তারা যা পারে তা করে দেখাতে চায়।

প্রশিক্ষণের মূল সুর : বাবা-মা এবং অভিভাবকের জন্য এ প্রশিক্ষণের মূল সুর হলো তাদের এ বিশেষ সন্তানদের স্বনির্ভর, কর্মক্ষম এবং সুখীজীবন গড়ার প্রচেষ্টা জীবনব্যাপী চালিয়ে যেতে হবে। তাদের এ বিশেষ সন্তানদের না বলা কথাগুলো অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে এবং এ না বলা কথাগুলো বুঝে বুঝে তাদের জন্য কী করণীয়; বাবা-মা হিসেবে সে উপায় নির্ধারণের জন্য নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো লক্ষ রেখে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। বাবা-মাকে মনে রাখতে হবে যে তার এ বিশেষ সন্তানটি আর দশটা মানুষের মতোই একজন মানুষ। তাকে সমাজে চলার উপযোগী করে তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির একটি তাগিদ তাদের মধ্যে জাগ্রত রাখতে হবে।

তাদের কিছু শেখাতে গেলে একটু লেগে থাকতে হবে। এটা যদিও খুব সহজসাধ্য নয়, কিন্তু তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে তারা অন্যদের মতোই এ কাজটা করতে পারবে। এ বিশেষ সন্তানদের সামর্থ্যের ওপর মা-বাবা হিসেবে নিজেদের মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে, তেমনই তাদের ভেতর আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের এ বিশেষ সন্তানদের বোঝাতে হবে যে, তারা যা করে তাতে মা-বাবা হিসেবে আমাদের গর্ব হয়। সে অল্পই হোক, তাদের তা শিখতে দিতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে যেন বারবার আমরা তাদের সামনেই অন্যদের সঙ্গে কথা না বলি। তাদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে হবে।

আমরা অনেক সময় ভাবি ওকে দিয়ে ভালো কিছু হবে না। কিন্তু এটা না ভেবে, তাকে ভালো কিছু করার পথ দেখিয়ে দিতে হবে। তার যে কাজগুলো আমাদের ভালো লাগে, সে কাজগুলো যেন একটু মনোযোগ দিয়ে তাকে শিখিয়ে দিই। তাহলে সে কাজগুলো সে আরও বেশি বেশি করে করতে পারবে। তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে দিতে হবে। তাদের সব কাজ যেন আমরা না করে দিই। তারা হয়তো অন্য মানুষের তুলনায় ধীরে কাজ করবে। কিন্তু তারাও পারবে, যদি তাদের করতে দেওয়া হয়, এ বিশ্বাসটা তাদের ওপর রাখতে হবে।

অনেক সময় আমরা মনে করি সে কথা বলতে পারে না, তার সঙ্গে কথা বলার দরকারটা কী? কিন্তু সে কথা বলতে না পারলেও তার সঙ্গে কথা বললে সেটি তার অনেক ভালো লাগে। এ কথাটি আমাদের বুঝতে হবে। তা না হলে সে একা হয়ে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে সেও সবার মতো করেই বড় হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু আমাদের সাহায্য ছাড়া তার সামর্থ্যের সবটুকু অর্জন করা যে তার পক্ষে সম্ভব নয়, তা আমাদের বুঝতে হবে। তার সামর্থ্য অর্জনের জন্য আমাদের সহায়ক ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ সে আমাদের ভালোবাসে আর ভালোবাসা পেতে চায়। তার স্বপ্নপূরণের পথে চলতে আমাদের উৎসাহ পেলে সে অনেক কিছুই করতে পারবে।

অনেক সময় আমরা এ বিশেষ সন্তানদের কী করতে হবে, কেবল সেই নির্দেশনা দিই। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলি না। তাদের আচরণ পরিবর্তন করাতে গেলে বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণেরও পরিবর্তন করতে হবে। অনেক সময় আমরা তাদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাই, কিন্তু তাদের আমরা বলি না যে তারা কোথায় যাচ্ছে। তাদের একা একা কোথাও যেতে দিই না। আমরা অনেক সময় তাদের কোনো কাজ করার সুযোগ না দিয়েই তাদের সব কাজ আমরা করে দিই। এতে তারা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আবার অনেক সময় তাদের অসুস্থতার বিষয়টি আমরা কেউ বুঝতেই পারি না। তারা কী করতে চায়, কী সিদ্ধান্ত নিতে চায়? সে সুযোগ আমরা কখনোই তাদের দিই না। ড. লিলিয়ানা মায়োর ওপরের এ পর্যবেক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটাই মারাত্মক প্রতিবন্ধিতা। 

আমরা অনেক সময় লক্ষ করি, আমাদের এ সন্তানরা যখন রাস্তায় হাঁটে আশপাশের মানুষ তার দিকে কেমন বাঁকা চোখে তাকায়। ভাবুন তো একবার যদি আপনাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয় তখন আপনারা কী করবেন? আমরা এ বিশেষ সন্তানদের প্রতি কতটা অবিচার করছি।

ড. জুডিথ লেব্ল্যাঙ্ক এবং ড. লিলিয়ানা মায়োর মতে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন মানুষ যা কিছু করতে পারবে বলে আমরা সাধারণভাবে ভাবি, তারা আসলে এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্য রাখে। যদি কেউ কথা বলতে না পারে তাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকেই কথা বলতে পারি। যখন সমাজে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্য সবার সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয়, তখন তাদের নাম বলে অন্য সবার মতো করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত। যেভাবে অন্য সাধারণের পরিচয় আমরা করে দিই। তারাও সবার সঙ্গে মিশতে চায়। সবার মাঝে নিজেদের স্থান করে নিতে চায়।

অন্য দশজন মানুষ ভালো কিছু করলে যেভাবে প্রশংসা পায় বা না করলে তাদের যেভাবে দেখা হয়, তারা চায় তাদের সেভাবে দেখা হোক। পরিবারের সবাই শুধু তাদের দিকেই মনোযোগী হবে এমনটি নয় বরং তারা পরিবারের একজন সত্যিকারের সদস্য হয়ে উঠতে চায়। অন্যদের সঙ্গে কথা বলা, চলাফেরা করা, সবার সঙ্গে মেশার সামাজিকতাগুলো তারা শিখতে চায়।

কোনো কাজে তারা সফল হলে, তাদের মা-বাবা এবং শিক্ষকদের প্রশংসা পেলে তারা খুশি হয়। তাদের উৎসাহ দিলে তাদের কাজটি তারা আরও এগিয়ে নিতে পারবে। আমাদের যেকোনো ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কথা তাদের কাজ করার মানসিকতার ওপর প্রভাব রাখে। তারা কি পারে বা কোথায় ভুল করে, এ বিষয়গুলো তাদের সামনে আলোচনা করা উচিত নয়। এগুলো তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং আত্মনির্ভরশীল হতে বাধাগ্রস্ত করে।

তাদের শিখন এবং জীবনের সফলতা অর্জনে মা-বাবা, অভিভাবক এবং পেশাজীবীরা একটি টিম হিসেবে কাজ করলে অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। তাদের সঙ্গে কাজ করার সময় বা কোনো কিছু শেখানোর সময় তারা যা পারে না বা ভুল করে সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা যেসব কাজ পারে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের শেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং তাদের শেখানোর পর তারা কতটুকু শিখল তা দেখার সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে তারা করতে পারে।

পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীরা যদি তাদের ওপর বিশ্বাস রাখে তাহলে তাদেরও নিজেদের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তাদের কাজে যদি আমাদের প্রত্যাশা অনেক কম থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় না। তারা একেবারে ছোটবেলা থেকেই শিখতে চায়। তাদের হয়তো একটু বেশি সময় লাগে, কিন্তু একটু সময় দিলে তারা শিখতে পারে। দুই বছর বয়সের আগেই তাদের শেখানো শুরু করা প্রয়োজন।

অন্য সবাই স্কুল এবং কর্মক্ষেত্রে যেসব কাজ করে, তাদেরও সেসব কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। অন্য শিশুদের যেভাবে সবাই ভালোবাসে এবং আগলে রাখে, তাদেরও সেভাবে ভালোবাসার মধ্যে নিরাপদে রাখতে হবে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সব সময় চোখে চোখে রাখলে বা বেশি বেশি করে আগলে রাখতে চাইলে অন্যদের মতো আত্মনির্ভরশীল হয়ে জীবনে সফল হওয়ার পর থেমে যেতে পারে।

অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং সেরিব্রাল পালসি বিকাশের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা আমাদের এ বিশেষ সন্তানরা ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্যের মানুষ। তাদের স্বনির্ভর, কর্মক্ষম এবং সুখী মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে তাদের আচরণ পরিবর্তনের জন্য বাবা-মা হিসেবে আমাদের আচরণ কীভাবে পরিবর্তন করব তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কোন বিষয়ে তার আগ্রহ আছে, কোন কাজটি করতে সে পছন্দ করে তা খুঁজে বের করে তাকে সে কাজটি সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কার উচ্চারণে দিতে হবেÑ যাতে সে সহজেই বুঝতে পারে তাকে কী করতে বলা হচ্ছে।

কাজটি যাতে কোয়ালিটিসম্পন্ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটি কোনো চ্যারিটি নয়, ধৈর্য ধরে তার কাজের গুণগতমান অর্জনে তাকে সহায়তা করতে হবে। নির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো করা যাবে না, অপেক্ষা করতে হবে। তাকে কাজটি করার জন্য একটু সময় দিতে হবে। নিজের মনে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সে পারবে।

আমরা যা বলি, আর যা ভাবি তার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। তাকে কোনো কাজ দিয়ে যদি মনে করি সে কাজটি করতে পারবে কি না, আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিধা থাকলে সেটি সে বুঝতে পারবে এবং সেও দ্বিধায় পড়ে যাবে। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে অনেক সময় তার আচরণগত সমস্যা এড়িয়ে গিয়ে তাকে বিশ্বাস দিতে হবে যে- সে কাজটি করতে পারবে। তার মধ্যে আস্থা জাগাতে পারলে সে কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে। আমাদের আচরণের দ্বারা প্রতিবন্ধীদের মধ্যে কোনো কনফিউশন তৈরি করা যাবে না। তাদের মধ্যে কোনো কনফিউশন তৈরি হলে তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাদের লক্ষ্য অর্জনের প্রতিটি ধাপে উৎসাহ দিতে হবে।

  • সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সিনিয়র সচিব
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা