স্বাধীনতার ৫৫ বছর
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১৩:১৫ পিএম
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
দেশের জনগণ সম্যক অবগত আছে, ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪০ সালের ‘লাহোর প্রস্তাব’ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বাঙালি নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকই পাকিস্তান আন্দোলন নামে খ্যাত লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। এ প্রস্তাবটির প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ এ প্রস্তাবেই সর্বপ্রথম উত্থাপিত হয়েছিল তিনটি দেশের উদ্ভাবন। অর্থাৎ মুসলিম অধ্যুষিত দুটি অঞ্চল ঘিরে দুটি এবং বাকি অঞ্চল ঘিরে আরেকটি পৃথক দেশ প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকে উল্লেখ্য প্রস্তাব। কিন্তু বাস্তবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মুসলিম অধ্যুষিত সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা ও আঙ্গিকের দুটি অঞ্চল ঘিরে পাকিস্তান নামে একটি দেশের উত্থান ঘটে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অধ্যুষিত বাকি অঞ্চল ঘিরে ঠিক পরদিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট ভারত নামে আরেকটি দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান নামক উল্লিখিত দেশটির পশ্চিম অংশের বর্তমান নাম পাকিস্তান এবং পূর্বে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের অংশের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পটভূমি ছিল বড় করুণ, যন্ত্রাদায়ক এবং রক্তক্রন্দনের হাহাকারে ভরা।
প্রকৃতপক্ষে সাবেক পাকিস্তান গণসমর্থিত কোনো রাষ্ট্র ছিল না। এ রাষ্ট্রে ২৩ বছরে কোনো সাধারণ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রের একটি শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচিত হয়নি। নয় বছরের চেষ্টায় যে একটি শাসনতন্ত্র রচিত হয়েছিল, একদিনের সামরিক আঘাতে তা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়। পুরো ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত ও নৈরাজ্য। নিখিল ভারত (বঙ্গ) মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রদের মধ্যে দুটি গ্রুপ বিদ্যমান ছিল। একটি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং সমর্থক ছিলেন খাজা নাজিম উদ্দিন। অন্যটি ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জ্বল, যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তার সমর্থক শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৩ সালে বঙ্গদেশে মুসলিম লীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ক্রিপস্ কমিশন মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট খাজা নাজিম উদ্দিন, চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং ইসমাইল খানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ কর্মসূচির ফলস্বরূপ কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার যে সূত্রপাত হয়, সোহরাওয়ার্দী এ উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
-67e3a98770d53.jpg)
কংগ্রেস প্রস্তাবিত বঙ্গদেশ পূর্ব-পশ্চিম হিসেবে ভাগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল, তার বিপক্ষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু এ তিন নেতা অখণ্ড বাংলাদেশ দাবি করেন। অখণ্ড বাংলাদেশের সমর্থনে নেতৃত্বদানকারী সোহরাওয়ার্দী এবং তার বিপরীতে বঙ্গদেশ বিভক্তির সমর্থক খাজা নাজিম উদ্দিনের মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে কতিপয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা ছাড়া সে সময় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বের প্রতি আর কারও সমর্থন তেমন স্পষ্ট ছিল না। পরে ঢাকা রাজধানী করে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ সৃষ্টির পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বেগবান হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার সময় তিনি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। আরও পরে নিজস্ব আদর্শ ও ভূমিকার ভিত্তিতে ১৯৬৩ সালে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্যতা পায়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কেন্দ্র করে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে শেখ মুজিবসহ অন্যদের চরমভাবে দণ্ডিত করার যে নীলনকশা প্রণীত হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী আন্দোলন শুরু করেন। তার পরবর্তী ইতিহাস ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর যথাক্রমে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পাঁচ প্রাদেশিক পরিষদের উভয় নির্বাচনে বাঙালি একক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক এবং ভুট্টোর দলের কূট-অপকৌশলের নগ্ন অবিচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসকের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা এবং গভীর রাতে সামরিক আইন পরিচালক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের সংহতি বা সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি খবর-মতামত-চিত্র প্রকাশের ব্যাপারে সংবাদপত্রসমূহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১১০ নম্বর সামরিক আইন জারি বাংলায় অবিস্মরণীয় এক দ্রোহী রূপ পরিগ্রহ করে। অধিবেশন বন্ধের আকস্মিক ঘোষণায় বাংলার জনতা প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
বিক্ষুব্ধ বাঙালি এর প্রতিবাদে ১ মার্চ থেকে সারা দেশে চলমান ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উত্তাল মিছিল-স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ২ মার্চ হরতাল, মিছিল ও কারফিউর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। হরতাল চলাকালে সামরিক জান্তার হিংস্র বাহিনীর গুলিতে তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র আজিজ মোর্শেদ, মামুনসহ ৫০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সামরিক আইন প্রশাসক ওই দিন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেন। কারফিউ ভেঙে বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৩ মার্চ মিছিলে গুলিবর্ষণে ঢাকায় ২৩ এবং চট্টগ্রামে ৭৫ জন নিহত হয়। এ দিন পাঠ করা হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ইশতেহার। যেখানে বলা হয়, ৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল ভৌগোলিক এলাকার ৭ কোটি মানুষের জন্য আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’।
সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া বিভিন্ন আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে ভুট্টোর সঙ্গে ষড়যন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে ২৫ মার্চ কালরাতে ইপিআর, পুলিশসহ সর্বস্তরের নিরস্ত্র জনগণের ওপর ইতিহাসের নির্মম গণহত্যা পরিচালনা করে। মধ্যরাতে তারা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করার আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওয়্যারলেসযোগে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী প্রেরণ করেন। ২৬ মার্চ দিবসপ্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী স্ফুলিঙ্গে রূপান্তর ঘটে। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের এবং পরে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে পরবর্তী নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বাঙালির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বাঙালি জাতিকে ভয়ংকর এক পরিস্থিতির মোকাবিলা করে প্রচণ্ড তীব্রতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়তে হয়েছে। ৮০ হাজার সেনাসদস্য, ২৫ হাজার মিলিশিয়া, ২৫ হাজার বেসামরিক বাহিনী এবং প্রায় ৫০ হাজার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনী হিসেবে ২ লাখ ৫০ হাজার ভারতীয় সেনাসদস্যকে। বিনিময়ে ত্যাগের প্রকৃতি, মাত্রা ও ত্যাগীর সংখ্যা ছিল অসংখ্য। যদিও ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড আলমানাকের মতে ১০ লাখ ও নিউইয়র্ক টাইমস (২২ ডিসেম্বর, ১৯৭২) অনুসারে ৫ থেকে ১৫ লাখ, কম্পটনস এনসাইক্লোপিডিয়া ও এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকানা অনুযায়ী এটি ছিল ৩০ লাখ প্রাণ বিসর্জন (যেটি প্রতিষ্ঠিত সত্য) এবং বিপুলসংখ্যক জননী, জায়া ও কন্যার অতি সযত্নে রক্ষিত সম্ভ্রম। ১৯৭১ সালের ২০ জুলাই সানডে টাইমস পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার ‘পাকিস্তানে সংঘবদ্ধ নির্যাতন’ শীর্ষক কলামে কীভাবে হত্যা ও নির্যাতনের বাইরে বাঙালি মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করে তাদের নিকৃষ্ট বিকৃত মনমানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তার করুণ বর্ণনা রয়েছে। আজকের এ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বীর শহীদানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। একই সঙ্গে ২ লাখ জননী-জায়া-কন্যা যাদের সর্বোচ্চ সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ স্বাধীন মাতৃভূমি এবং নানামুখী অত্যাচার-অবিচার নীরবে সহ্য করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যারা সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন সবার অবদান পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
উল্লেখ্য, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবিচল ব্রতে প্রতিষ্ঠা পায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। যার নেতৃত্বে রয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী বিশ্বনন্দিত অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মূলত ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতাকে মুক্তিকামী মানুষের কল্যাণে সামগ্রিক রূপান্তরে নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান। গণতন্ত্রের প্রকৃষ্ট পরিচর্যায় স্বাধীনতা অর্থবহ করার উদ্দেশ্যে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অপরিহার্য। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিতকল্পে বর্তমান সরকারের গৃহীত সব কর্মকৌশল প্রশংসনীয়। প্রাসঙ্গিকতায় জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা ও আহতদের আশু আরোগ্য কামনা করছি।