সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১২:০২ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘরে-বাইরে বহু ধরনের শত্রু কর্মরত ছিল। পাকিস্তানিরা ছিল, আলবদর, রাজাকাররা ছিল, ছিল অবাঙালিরাও। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে গেছেন এমন বাঙালিও বাঙালির হাতেই বিপদে পড়েছেন। প্রাণ হারানোর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। বিদ্রোহী বেতার কর্মীরা শঙ্কার ভেতর থাকতেন পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের বিশ্বাসযোগ্য আক্রমণের; তাদের একজনের অবয়বে বাঙালিত্বের ছাপ না থাকায় ভীষণ বিপদ ঘটেছিল। অন্যরা ছুটে এসে রক্ষা করেছেন, নইলে তিনিও শহীদ হতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার একেবারে প্রাথমিক স্তরে অত্যন্ত সাহসী ও সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন মাহমুদ হোসেন। থাকতেন ইউরোপে, গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণায় চট্টগ্রামে চলে এসেছিলেন শিল্পকারখানা গড়বেন বলে। একাত্তরে ব্যবসা ভুলে যুক্ত হয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে তার যাতায়াত ছিল, সেই সূত্রে বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ছাব্বিশে মার্চ রাতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা শুনে স্থির থাকতে পারেননি। রাত ১০টায় চট্টগ্রাম বেতার ভবনে গিয়ে পিস্তলের মুখে প্রকৌশলীদের সহায়তা করতে বাধ্য করে ইংরেজি ভাষায় একটি বক্তব্য প্রচার করেন, তাতে বিশ্ববাসীকে ‘হ্যালো ম্যানকাইন্ড’ বলে সম্বোধন করে বাংলাদেশে কী ঘটছে তা জানিয়ে, বিশ্ববাসীর সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। তার আরও আকাঙ্ক্ষা ছিল ভারতে গিয়ে পূর্বপরিচিতদের কাজে লাগিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসবেন। সীমান্ত পার হতে গিয়ে ধরা পড়েন। না, পাকিস্তানিদের হাতে নয়; বাঙালিদের হাতেই। অবয়বের ত্রুটি এবং পকেটে বিদেশি মুদ্রা থাকায় দুজন সহযোদ্ধাসহ প্রাণ হারান। তিনজনের লাশই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিরোধ ছিল বাঙালিদের নিজেদের মধ্যেও। কলকাতায় থাকা অবস্থায় বেলাল মোহাম্মদ ভারতীয়দের মুখেই শুনেছেন, নেতারা সবাই যে মুজিবভক্ত নন সেটা ভারতীয়রা বিলক্ষণ জানেন। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী এক মুসলমান ভদ্রলোক বেলাল মোহাম্মদকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের বড় এক নেতা নিজের জীবনী লেখানো নিয়ে বিশেষ রকমের তৎপর হয়ে পড়েছিলেন। ছোট ছোট ঘটনা, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। কলকাতার অবাঙালি মুসলমানরা জয় বাংলার লোকদের মোটেই পছন্দ করত না। তাদের কারও কারও আত্মীয়স্বজন ছিল পূর্ববঙ্গে; সুযোগ পেলেই তারা নানা অভিযোগ তুলে কটুকথা বলত। সাতচল্লিশের পরে যারা পূর্ববঙ্গ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে সেই হিন্দু বাঙালিরাও ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতে ছাড়ত না। এসব বিরূপতা উপেক্ষা করে বেতার কর্মীদের কাজ করতে হয়েছে। আগরতলায় থাকতে তাদের চলাফেরা ছিল সীমিত; তারা হিন্দু নাম গ্রহণ করেছিলেন। একসময় তাদের জন্য রান্নাবান্না করতেন যে মাসিমা, তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গ থেকে সাতচল্লিশে বিতাড়িত হিন্দু শরণার্থী। খাবার সময়ে তার কাছে এক গ্লাস পানি চাইতে গিয়ে একজন বেতারকর্মী বিপদে পড়েছিলেন, সহকর্মীর প্রত্যুপন্নমতিত্বের সহায়তায় কোনোমতে মান-ইজ্জত বাঁচিয়েছেন।
ওদিকে যে লড়াইটার ভিত্তি ছিল ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ তার প্রচারে এবং ইশতেহারে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা যে থাকত না এমন নয়। খুবই থাকত। কোনো কোনো ইশতেহার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পড়ে শোনানোও হয়েছে। উল্লেখ আছে বেলাল মোহাম্মদের বইতে। যেমন আগরতলা থেকে এপ্রিল-মে মাসে প্রচারিত একটি ইশতেহার শুরু করা হয়েছিল এভাবে, ‘খোদাতায়ালার ইচ্ছায়, আমরা শেষ পর্যন্ত জয়ী হবই।’ ইশতেহারের ভেতরে বলা হয়েছে, ‘যতই দিন যাবে আমাদের মুক্তিবাহিনী ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং অধিক সংখ্যায় পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা করবে। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে আমরা পাকিস্তানিদের পরাজিত করবই।’ পাকিস্তানি হানাদাররাও কিন্তু নিজেদের আল্লাহওয়ালা বলে বড়াই করত। পরবর্তী একটি ইশতেহারেও একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, বলা হয়েছে যে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায় হচ্ছে ‘পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার সাহায্য, বাংলাদেশের জনসাধারণের মনোবল, মুক্তিলাভের দৃঢ়সংকল্প, শত্রুসংহারে অবিচল প্রতিজ্ঞা।’ শেষ করা হয়েছে এভাবে, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার ওপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন। স্মরণ করুন, আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন : অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই সুখকর। বিশ্বাস রাখুন : আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী।’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানসূচির দিকে তাকালে দেখব সেখানে কুরআন ও তার অনুবাদ পাঠ ছিল প্রাত্যহিক অনুষ্ঠান; শনিবার ছাড়া প্রতিদিন প্রচারিত হতো ‘ইসলামের দৃষ্টিতে’ নামে একটি কথিকা; এবং সপ্তাহে এক দিন করে থাকত গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ।
কলকাতায় গিয়ে বেলাল মোহাম্মদের বিশেষ আগ্রহ ছিল কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে দেখা করার। মুজফ্ফর আহ্মদ তার এলাকারই লোক, সম্পর্কে আত্মীয়ও বটে। তবে তার মনে পড়েছে যে ছেলেবেলায় লোকে বলত যে মুজফ্ফর আহ্মদ একজন নাস্তিক। তিনি এও স্মরণ করেছেন যে, ১৯৬৫-এর যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে পুথিপাঠের ধরনে তিনি নিজের লেখা ভারতবিরোধী ‘খবর’ প্রচার করতেন। শুরুটা করতেন এভাবে, ‘আহা আল্লানবী কর মদদ/এখন খবর বলি, বেলাল মোহাম্মদ।’ তার সেই পুথিপাঠ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
ধর্মের সঙ্গে প্রচারকার্য মিশিয়ে ফেলাটা ১৯৬৫-তে স্বাভাবিক ছিল; ১৯৭১-এ যে সে রীতি পরিত্যক্ত হয়েছিল তা বলা যাবে না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিদিনের অনুষ্ঠান শুরু করা হতো শ্রোতাদের সালাম জানিয়ে, শেষ করা হতো খোদা হাফেজ বলে। এ নিয়ে ভারতীয় পরামর্শক আর এন আচারিয়া মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন। দেশ যখন স্বাধীন হলো তখন প্রথম কয়েক দিন ঢাকা থেকে প্রচারিত বেতারে ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করার রীতি একেবারেই বাদ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু পরে আবার তা ফেরত এসেছে, যথারীতি।
একাত্তরের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কবি আবদুস সালাম ব্যাকুলভাবে ছুটে গিয়েছিলেন বেতারকর্মীদের খোঁজে, উদ্দেশ্য বেতারে ভাষণ পাঠ করা। ভাষণটিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল সোডার বোতল, মরিচের গুঁড়া, বিজলিবাতির বাল্ব, এ ধরনের ঘরোয়া অস্ত্র যার কাছে যা আছে তা নিয়ে শত্রুসেনাকে আক্রমণ করবার। বিশেষ ভরসা হিসেবে তিনি উদ্ধৃত করেছেন কুরআনের বাণী।
দুই.
ইয়াহিয়া খান ওদিকে বিদ্রোহী বাঙালিদের ভয় করতেন, যেজন্য গণহত্যার হুকুম দিয়ে তস্করের মতো পালিয়েছিলেন, এবং বলে রেখেছিলেন যে তিনি নিরাপদে করাচি না পৌঁছার আগে যেন হত্যাকাণ্ড শুরু না করা হয়। তারপর ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি যুদ্ধে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তখন তিনি এমনকি নিজের দপ্তরে আসাও পছন্দ করতেন না। দুঃখকে ডুবিয়ে মারবার জায়গাজমিন খুঁজতেন। একবার তো রটেই গিয়েছিল যে সেনাপ্রধান আব্দুল হামিদ খান ক্ষমতা দখল করে নিয়েছেন। সাবধানতার প্রয়োজনে হামিদ খানকে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাখাটাই পছন্দ করতেন।
শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বলেছিলেন তাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না এবং হুংকার দিয়েছিলেন এক ইঞ্চি ভূমিও ছেড়ে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই করতে পারলেন না; হামুদুর রহমান কমিশন তার ব্যাপারে তদন্ত করল, তাকে কোর্ট মার্শাল করা দরকার বলে জানাল, কিন্তু কোর্ট মার্শাল হলো না, সেনাবাহিনীর চাপেই সম্ভবত। তা ছাড়া ক্ষমতায় এসে ভুট্টো তখন নানা ধান্দায় ব্যস্ত আছেন, ভারতে আটক ৯৪ হাজার সৈনিক ফেরত আনা, বাংলাদেশ যে ১৯৫ জনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে বিচারের জন্য ফিরিয়ে না দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে তাদের রক্ষা করা, এসবের মোকাবিলা করা সহজ ছিল না। ইয়াহিয়া ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বিচার করতে গেলে ভুট্টোর নিজের সংশ্লিষ্টতাও বেরিয়ে পড়বে, এমন ভয়ও যে ছিল না তাতো নয়। খুবই ছিল। ইয়াহিয়া খানেরা তাই বিচারের হাত থেকে বেঁচে গেলেন, নইলে শেখ মুজিবের পরিবর্তে তারাই রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হতেন। কারণ আঘাত তারাই প্রথমে করেছেন এবং তার প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র ভেঙে গেছে। বোঝা গেছে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ জিনিসটা কেমন কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক ছিল, এবং তার সশস্ত্র রক্ষকরা কতটা অন্ধ, মূর্খ ও হৃদয়হীন ছিল। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ঘূর্ণিপাকে পড়ে সাতচল্লিশে কত মানুষ যে চরম দুর্ভোগ সহ্য করেছে তার হিসাব নেই; একাত্তরে তারই প্রকোপে আবার কতজন কী যন্ত্রণা সহ্য করল তারও হিসাব করা সম্ভব হবে না।
পাকিস্তান এক জাতির রাষ্ট্র ছিল না। সে রাষ্ট্রে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ, মোহাজেরÑ এদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা ছিল, তাদের দলিতমথিত করে এক জাতিতে পরিণত করা ছিল অসম্ভব কর্ম। করতে গেলে যেসব বিপদ ঘটা সম্ভব তার সবকটিই ঘটেছিল একাত্তরে, পূর্ববঙ্গে তো বটেই পশ্চিম পাকিস্তানেও। যুদ্ধ শেষে যে বাংলাদেশ আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি সেটাও কিন্তু এক জাতির দেশ নয়। এখানে অন্য জাতিসত্তাও রয়েছে, তা তারা সংখ্যায় যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। ভোলা অন্যায় হবে যে আমাদের রাষ্ট্র জাতিরাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র; এ যুগে এক জাতি এক রাষ্ট্র এমন বিন্যাস আর সম্ভবপর নয়।
পূর্ব যে পশ্চিম থেকে আলাদা হবে এটা অনিবার্য ছিল। তার কারণগুলো আমরা জানি। ভৌগোলিক দূরত্ব, এককেন্দ্রিক শাসন, কেন্দ্রের শোষণ, নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য, এসব কারণ মোটেই অপ্রত্যক্ষ ছিল না। কিন্তু জাতীয়তার প্রশ্নটিও যে নির্ধারকের ভূমিকায় ছিল সেটা যেন না ভুলি। অবিভক্ত বঙ্গে শোষিত বাঙালি মুসলমান নিজের মুসলমান পরিচয়টি প্রধান হিসেবে দেখতে পেয়েছে, কেননা স্থানীয় শোষক হিসেবে যারা দৃশ্যমান ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। সেটাই ছিল কৃত্রিম পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ তৈরির ভিত্তি। ওটিকে তৈরি করা বিশেষভাবে দরকার হয়ে পড়েছিল শ্রেণিচেতনা দমিয়ে রাখার জন্য। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর বাঙালি মুসলমান দেখল সে শোষিত হচ্ছে একদল মুসলমানের দ্বারা, যারা অবাঙালি; তখন তার ভেতর যে চেতনাটি বড় হয়ে দেখা দিল সেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের। ওটি সব সময়ই ছিল, বলা যায় সুপ্ত না থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল। জাতীয়তাবাদের এ বিষয়টি বিবেচনার মধ্যে না নিলে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। আইয়ুবি শাসনামলে বাঙালি অর্থনীতিবিদরা দুই অর্থনীতির বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকরা তাতে বিব্রত তো অবশ্যই, বিচলিতও বোধ করেছেন। কারণ ওই তত্ত্ব পূর্ববঙ্গ কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে বিষয়ে বাঙালিদের সজাগ করে দেয়। সত্তরের নির্বাচনে ‘পূর্ববঙ্গ শ্মশান কেন’ এ প্রশ্ন তুলে বৈষম্যের যে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল তা ভোটারদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবনিকাশে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটিই ছিল নির্ধারক। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধ জেগে উঠেছিল, এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে তার মীমাংসা সম্ভব ছিল না। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সে কথাটাই জানিয়ে দিচ্ছিল। এটা বললে তাই অসঙ্গত হবে না যে, জাতি প্রশ্নের মীমাংসার প্রয়োজনীয়তাতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে হয়েছে। ব্যাপারটা স্মরণ করা জরুরি এজন্য যে- একে সাধারণত অবজ্ঞা করা হয়। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া অবান্তর হবে না। দুই অর্থনীতির জোরালো প্রবক্তা ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার ওই সময়ের লেখার সংকলন করে একটি বই বের হয়েছে যেটির তিনি নাম রেখেছেন, ‘ফ্রম টু ইকোনমি টু টু নেশনস’। ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক ওই রকমের নয়। প্রথমত দুই ইকোনমি দুই নেশনের জন্ম দেয়নি, বাঙালির একটি স্বতন্ত্র নেশন আগেও ছিল, ঐতিহাসিকভাবেই ছিল, যে জ্ঞান ঘা খেয়ে জেগে উঠেছে মাত্র। দ্বিতীয়ত একাত্তরে বাঙালি নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঁচটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা যে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তা তো নয়। জাতি প্রশ্নের মীমাংসা করতে ব্যর্থ হলে পাকিস্তান আবারও ভাঙবে, যেমন একই কারণে ভাঙবে ভারতও। হিন্দি ভাষা ও হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় ঐক্যের জন্য যথেষ্ট নয়।
জাতীয়তাবাদের দুর্বলতা আছে। হিটলার, মুসোলিনি খুব বড় মাপের জাতীয়তাবাদী ছিলেন। আগ্রাসি হলে সে জাতীয়তাবাদ কতটা যে নৃশংস হতে পারে আমাদের দেশে একাত্তরের হানাদাররা তার নতুন করে জ্বলন্ত প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে জাতিগত পরিচয় যে নিছক কল্পনার ব্যাপার তা নয়। এ পরিচয় গড়ে ওঠে ভাষা, অর্থনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ, সামাজিকভাবে পাশাপাশি বাস করার অভিজ্ঞতা, সবকিছুর বাস্তবিক সংমিশ্রণে। আশ্রয় দেয়, একাত্তরে যেমন দিয়েছিল বাঙালিদের। জাতীয়তাবাদ আবার পারে আহত বন্য প্রাণীর মতো হিংস্র হতে, ওই সময়ে যেমনটা হয়েছিল হানাদার পাকিস্তানিদের জাতীয়তাবাদ।