× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উন্নয়ন

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেকে আনবে বিপর্যয়

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৫ ১৫:২৭ পিএম

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নগরায়ণে যে মাত্রায় দূষণ যোগ হয়েছে; পানি, মাটি, বায়ু সবই দূষিত হয়ে পড়েছে। এককথায় নগরগুলো বসবাসের যোগ্যতা হারিয়েছে। আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত নগরায়ণ ও নগর পরিকল্পনা প্রাধান্য পাওয়ারই কথা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, নগর পরিকল্পনা, নগরায়ণ বা অসম উন্নয়ন নিয়ে যে তামাশা বিগত সময়গুলোয় হয়েছে, তা নিয়ে কোনো ধরনের সংস্কার কমিশন সরকার  করেনি। নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটা বিষয় পরিবেশ। নগর ও পরিবেশ দুটো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু পরিবেশ নিয়েও কোনো কমিশন হয়নি। একটি দেশের মূল বিষয় হলো নগরায়ণÑপরিবেশ, যার সঙ্গে অবকাঠামো ও উন্নয়ন সরাসরি সম্পৃক্ত। অথচ সরকারের ফ্রেমে আমরা দেখিনি যে নগর-পরিবেশ নিয়ে আলাদা কোনো চিন্তা করেছে। যদিও অর্থনীতি সংস্কার কমিশন, তাদের রিপোর্টে নগরায়ণের বিষয়ে কিছু নীতিমালা বা কিছু প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু সেটা তাদের মূল কাজ ছিল না। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হতো, নগরায়ণ-সংক্রান্ত একটা কমিশন খুবই জরুরি ছিল।

এটা দুঃখজনক বাস্তবতা যে, সরকার যেভাবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশকে দেখে, বিশ্বের আর কোথাও এভাবে দেখা হয় না। সারা পৃথিবীতেই পরিকল্পনা, পরিবেশ ও অর্থনীতি এক দৃষ্টিতে দেখা হয়। কেবল অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে একটা দেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। সেখানে পরিবেশ, পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার সে অর্থে নগরের পরিকল্পনা নিয়ে যেমন কোনো কমিশন করেনি তেমনি পরিকল্পনাবিদদের জ্ঞান কাজে লাগানোরও খুব বেশি প্রচেষ্টা নেই। বরং আমরা দেখছি উল্টো চিত্র। পরিকল্পনাবিদদের যেসব সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো আগেও বিভিন্ন সরকারের সময় দেওয়া হয়েছে, এ সরকারের কাছেও দিয়েছি আমরা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির দেশে পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ যেভাবে বাস্তবায়ন হওয়া উচিত, তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা, তাদের কথা শোনার মানসিকতা আগের সরকারগুলোর মধ্যে ছিল না। বর্তমান সরকারও পরিকল্পনাবিদদের প্রেসক্রিপশন নিতে চায়নি। পরিকল্পনাবিদরা ব্যবস্থাপনার কথা বলেন। ব্যবস্থাপনার কথা বললেই ব্যবসায়ীরা মানতে চান না। ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চান। পরিকল্পনা হলো এক ধরনের রেগুলেশন ও নিয়ন্ত্রণ। ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ চান না। এ সরকার যদি পরিকল্পনাকে সেভাবে গুরুত্ব দিত, তাহলে বাংলাদেশকে আমরা যে জায়গায় নিতে চাই, সে জায়গায় যাওয়ার মতো পথরেখা তৈরি হতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুষম পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি।

একটা কথা জোর দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ ছোট। ঢাকায় জমি কম। এখানে সুউচ্চ ভবনই জনভারে নুয়ে পড়া ঢাকার জন্য আদর্শ সমাধান। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর হলো সিটি স্টেট। আর বাংলাদেশ বিশাল বিস্তীর্ণ একটা দেশ। সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের উদাহরণ বাংলাদেশে সরলভাবে খাটে না। এক্ষেত্রে যেটা বলা হয়, আপনি যদি মানুষকে অ্যাকোমোডেট করতে চান, জনঘনত্ব বাড়াতে চান, এজন্য সুউচ্চ ভবনই একমাত্র সমাধান, সেটি পুরোপুরি ভুল তথ্য। আমরা সারা পৃথিবীর নগরায়ণ বিশ্লেষণ করি। কড়াইল বস্তি, সেখানে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি, সেখানে কিন্তু লো রাইজ। আপনি যদি আবাসনের সমস্যা সমাধানের জন্য অপটিমাম ডেনসিটি পেতে চান, তাহলে মিড রাইজই টেকসই সমাধান। সারা পৃথিবীতেই এ ফর্মুলা ফলো করা হয়। নগর এলাকার ভবন চারতলা থেকে আটতলাÑ এটা হলো মিড রাইজের সংজ্ঞা। সুতরাং পরিকল্পনামাফিক নগর গড়লে মিড রাইজের মাধ্যমের অপটিমাম ডেনসিটি পাওয়া সম্ভব। হাই রাইজের সঙ্গে ডেনসিটির কোনো সম্পর্ক নেই। হাই রাইজ ভবন বানাতে হলে প্রচুর জায়গা ছাড়তে হবে। সিঙ্গাপুর ছেড়েছে। তারা যেহেতু সিটি স্টেট, তাদের ল্যান্ড কম। হংকংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। সিঙ্গাপুর অনেক হাই রাইজ বানানোর পরও তাদের ফ্লোর এরিয়া রেশিও আড়াই-পৌনে তিনের মধ্যে আছে। অর্থাৎ তারা হাই রাইজের শর্ত কঠোরভাবে মেনেছে। কিন্তু আমাদের দেশে প্লটের চরিত্র হলো, ছোট ছোট প্লট। এসব ছোট ছোট প্লটে আপনি কখনই হাই রাইজ ভবন বানাতে পারেন না। এটা করলে সুপার ডেনসিটি তৈরি হবে। যেটা ঢাকায় এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। তার পরও কেউ যদি আবাসিক এলাকায় হাই রাইজ ভবন বানাতে চায়, তাহলে তাকে ব্লক ডেভেলপমেন্টে যেতে হবে। সেটা আরেক প্রসঙ্গ। হাই ডেনিসিটি এলাকায় যদি চাহিদা থাকে, তাহলে ব্লকভিত্তিক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে হাই রাইজ ভবন বানানো যাবে। আর বাণিজ্যিক এলাকায় হাই রাইজ ভবন বানানো যাবে। আমরা শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট প্লটে হাই রাইজ ভবন বানানোর অযৌক্তিতা নিয়ে বলছি। পরিকল্পনাবিদরা হাই রাইজ বিল্ডিংয়ের বিরুদ্ধেÑ এটা একটা ভুল বার্তা। যেখানে প্ল্যান হাই রাইজ করতে বলে সেখানে হাই রাইজ করবেন, যেখানে ছোট প্লট সেখানে হাই রাইজ করতে দিতে পারেন না। এটাই নগরায়ণের সূত্র। আমাদের স্পষ্ট কথাও এটাই। এমনকি সিঙ্গাপুরেও ১০ কাঠার নিচে জমি হলে সেখানে দোতলার বেশি ভবন বানানোর অনুমোদন নেই।

জমির ব্যবসার সঙ্গে পরিকল্পনার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আবারও বলছি, আপনি হাই রাইজ বানাতে চাইলে যে পরিমাণ জমি লাগবে, মিড রাইজেও একই পরিমাণ জমি লাগবে। ভবন যত উঁচু হবে চারপাশে তত জায়গা ছাড়তে হবে। হাই রাইজে জমি কম লাগবে আর মিড রাইজে জমি বেশি লাগবে ব্যাপারটা এ রকম নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১০ শতাংশ জমিতে আপনি আটতলা করে দুটি ভবন অথবা ১৬ তলার একটি ভবন বানাতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে একই পরিমাণ জমিতে একবারে ১৬ তলা ভবন বানাতে পারেন। ১৬ তলা বানালে আশপাশের জমি ছেড়ে বানাতে হবে। সমসংখ্যক মানুষকে হাই রাইজে জায়গা করে দেওয়া হবে, না মিড রাইজে জায়গা করে দেওয়া হবে, সেটা হলো প্ল্যানিংয়ের বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে মনে করা হয়, হাই রাইজ বানাব, কিন্তু জায়গা ছাড়ব না। এমন অদ্ভুত বেআইনি কাজ বিশ্বের কোনো সভ্য শহরে পাবেন না। ১০ শতাংশ জায়গায় কেউ যদি ২০ তলা দুটি করে ভবন বানায় আর বলে এখানে বেশি মানুষ বসবাসের সুযোগ হয়েছে, সেটা ভুল হবে।

এভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ চলতে থাকলে নগরায়ণের দৃষ্টিতে বলতে হয়, ঢাকার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। এখানে যত বেশি আবাসন ইউনিট বাড়বে, শহরটা তত বেশি ভাড়াক্রান্ত হবে। তেমনিভাবে কৃষিজমিতে যত বেশি শিল্পায়ন হবে, তত বেশি পরিবেশ ধ্বংস হবে। আরও বেশি মানুষ কাজের সন্ধানে আসবে। আরও বেশি ট্রাফিক বাড়বে। জনপরিষেবার ওপর চাপ পড়বে। এখন সরকার ঢাকায় এফএআর বাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। এখন আলাপ হওয়া জরুরি ছিল, ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য কী করণীয় কিংবা কীভাবে ঢাকায় মানুষের স্রোত বন্ধ করা যায় তা নিয়ে। ঢাকায় মানুষের স্রোত বন্ধ করতে চাইলে কোনো পলিসি করে বলা যাবে না যে, এখন থেকে নতুন মানুষ ঢাকায় আসা বন্ধ। এজন্য ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। যেমন ঢাকায় নতুন করে কোনো শিল্প এলাকা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান হবে না। যেমন আমরা কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তর ঢাকা থেকে সরাতে পারতাম। এটা ঢাকায় হওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। খাদ্য, কৃষি ও মৎস্য এ-সংক্রান্ত অধিদপ্তরগুলো আমরা ঢাকার বাইরে করতে পারতাম। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার বাইরে তৈরি করা যেত। এগুলো করতে পারলে ঢাকায় আবাসনের চাহিদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমত। পাশাপাশি ঢাকায় যে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আছে যেমন হকার, অবৈধ অটোরিকশাÑ এগুলোর সংখ্যা একটা যৌক্তিক মাত্রায় নিয়ে আসা যেত। সরকার সে পথে হাঁটছে না। বরং ঢাকায় এখনও শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, নতুন নতুন সরকারি দপ্তরের কার্যালয় নির্মাণ, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ঢাকার দুয়ার পুরোপুরি খুলে দেওয়াÑ এ চক্রের কারণেই ঢাকায় আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। এগুলো যত বাড়বে, তত কৃষিজমি ভরাট করে শিল্পায়নের চাহিদা তত বাড়বে।

এরই মধ্যে স্থবির শহরে যত মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়েই করা হোক, ঢাকা নিশ্চলই থাকবে। ঢাকার বাসযোগ্যতার কোনো উন্নতি হবে না। বায়ুদূষণ ঢাকার এমন পর্যায়ে চলে গেছে, এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য সাংঘাতিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে আমাদের উন্নয়ননীতি জড়িত। জনস্বাস্থ্য আর নগর পরিকল্পনা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সরকার সে বিষয়টি এখনও ধরতে পারছে না। এ কারণেই সরকার নগরীর পরিকল্পনানীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশীজন করে নগরীকে মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা একটা বড় ফ্যাক্টর। ঢাকা যদি পরিকল্পনায় ভুল করে, সারা বাংলাদেশের পরিকল্পনায় এর প্রভাব পড়বে। ইমারত বিধিমালা ২০০৮-এর প্রভাব দেখা গেছে ঢাকার বাইরেও। বাংলাদেশের পৌর এলাকার অলিগলিতে ১০ ফুট রাস্তার পাশে ১০-১২ তলা ভবন উঠে গেছে। এটা ঢাকার ভুলের ফসল। ঢাকা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারত, তাহলে অন্য এলাকার নগর পরিকল্পনাও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পরিকল্পনাবিদদের বাদ দিয়ে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন হলে বাসযোগ্যতার তলানিতে থাকা ঢাকার বাসযোগ্যতা আরও তলিয়ে যাবে।

  • অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এবং নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা