সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৫ ১১:১৭ এএম
প্রবা গ্রাফিক্স
কিডনির সমস্যা বিশ্বজুড়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এই রোগের প্রাদুর্ভাব। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্ব কিডনি দিবস। একটি সমীক্ষা বলছে, দেশে ২০১০ সালে কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি এবং ২০২৩ সালে রোগটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ। এ পরিসংখ্যান থেকেই অবস্থার অবনতির চিত্র অনুমেয়। কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে রোগীর ব্যক্তিগত জীবনই শুধু বিপর্যস্ত হয় না, তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ মেটাতে না পেরে রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন।
কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা দেহের ক্ষতিকর দূষিত পদার্থ বের করে দেয়। সম্প্রতি পালিত বিশ্ব কিডনি দিবস সামনে রেখে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের জনসংখ্যার শতকরা ১০ শতাংশ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। শিশুরাও কিডনি সমস্যায় ভোগে। শিশুদের কিডনি রোগের চিকিৎসা বয়স্কদের কিডনি রোগের চিকিৎসা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, তাদের অসুস্থতার ধরন বড়দের থেকে আলাদা। এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে হাসপাতালে আসা শিশুদের মধ্যে প্রতি ২০ জনে ১ জন কিডনি রোগে আক্রান্ত। শিশুদের কিডনি রোগের এক বড় অংশই জন্মগত কিডনি রোগ।
১৬ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে বিপাকে অভিভাবকরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিডনি রোগে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশেই নিম্নবিত্ত পরিবারের। অনেক পরিবারই চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত। একে তো এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তার ওপর কোনো সরকারি হাসপাতালেই শিশুদের কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা নেই। আর শিশু হাসপাতালে থাকলেও সেখানে রয়েছে সিটের অপ্রতুলতা। সেখানেও অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা ব্যয় মেটানো কঠিন। ফলে শিশুদের চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই অনেক পরিবার চলে যেতে বাধ্য হয়। কিডনি রোগীর চিকিৎসায় ডায়ালাইসিস অন্যতম অনুষঙ্গ। হিমোডায়ালাইসিসের জন্য শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে শিশুদের জন্য রয়েছে ৬টি বেড আর শিশুদের কিডনি আইসিইউ আছে ৮টি, যার সাতটি পেইড আর একটি নন-পেইড। অথচ শিশুদের কিডনি আইসিইউর ব্যবস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো হাসপাতালে নেই। সেখানেও রয়েছে মাত্র দুটি বেড। সাধারণ রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো হয়, শিশুদের বেলায় তা কিছুটা ভিন্ন। কারণ অনেক সময়েই শিশুর ওজন, বয়স অনুযায়ী ক্যাথেটার পাওয়া যায় না, যা আনতে হয় বিদেশ থেকে। ফলে শিশুদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও জটিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শিশুদের ডায়ালাইসিস সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আমরা শিশু হাসপাতালে যেমন বেডের সুবিধা বাড়ানোর জন্য বলি, তেমনি সরকারি হাসপাতালগুলোতেও সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিই। দেশে কিডনি রোগীর তুলনায় কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা কম। আবার দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যত ডায়ালাইসিস কেন্দ্র রয়েছে তার অধিকাংশই রাজধানীতে। প্রান্তিক পর্যায়ে এই সেবা অপ্রতুল। অথচ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কিডনি রোগী রয়েছে, তাদের সেবা প্রয়োজন। শিশুদের মাঝেও কিডনি রোগ বাড়ছে। সব পরিবারের পক্ষে রাজধানীতে এসে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও যাতায়াতের ধকলও এক্ষেত্রে বিবেচ্য। তাই আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের জেলা শহরের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে কিডনি রোগের চিকিৎসা ও ডায়ালাইসিস সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে তাগিদ দিই।
নীরব ঘাতক কিডনি রোগের চিকিৎসা সহজ করার উদ্যোগ নিতে বলি। আমরা চাই না, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে কোনো রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ুক। এজন্য সরকারকে কিডনি রোগ প্রতিরোধে একটি সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জারি রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশুরা যেন কিডনি রোগে আক্রান্ত না হয়, আক্রান্তরা যেন সুলভে সঠিক চিকিৎসা পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সে অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের জন্যও আমরা বলি।