× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কৃষি খাত

বাজারব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি

ড. মো. হুমায়ুন কবির

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৫ ১২:৪২ পিএম

বাজারব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি

দেশে কৃষি গবেষণা এবং উন্নত জাতের ধানের জাত উদ্ভাবনের ফলে কৃষক সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে এবং প্রত্যক্ষভাবে আমাদের অর্থনীতিতে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা যেহেতু সম্পূর্ণ কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল তাই এ খাতে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বিশেষত অর্থনীতির এ কঠিন সময়ে। চলতি বছর কৃষকের অসহায়ত্ব ধরা পড়েছে প্রকৃতির কাছে। ২০২৪ সালে হওয়া দুটি বন্যাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। কারণ এ বন্যার কারণেই ফলনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমন মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ টনের বেশি। আমনে চলতি অর্থবছরে ১ কোটি ৬৮ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বন্যা। বন্যা ঘরবাড়ির সঙ্গে কৃষিজমিও নষ্ট করে। নষ্ট হয় কৃষকের ফসল। ২০২৪ সালের আগস্ট ও অক্টোবরে ভারী বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধির অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যার কারণে দেশে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হয়ে যায়। অপ্রত্যাশিত এ দুর্যোগ মোকাবিলায় দরকার ছিল পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। প্রয়োজন ছিল পরবর্তী সিজনের ফসল যেন পরিপূর্ণ হয় সেরূপ প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা। তার চিত্রও মেলেনি সরেজমিনে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১৯ দশমিক ২৩ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ৭ লাখ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১০ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বাজেটের খাদ্য হিসাবের সংক্ষিপ্তসার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন চাল ও ৭ লাখ টন গম অর্থাৎ, সাড়ে ১০ লাখ টন চাল-গম আমদানির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ১১ লাখ মেট্রিক টন। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো ১ শতাংশ বা এর আশপাশে থাকবে বলেই ধারণা করা যায়। এদিকে ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১.৩৭ ও ১.৩ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২২ ও ২০২৩)। এর অর্থ দাঁড়ায়, চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। এতে চাহিদার তুলনায় চালের ঘাটতি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু খাদ্যশস্য (চাল-গম) নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে অন্যান্য খাদ্যপণ্য যেমন ডাল, ভোজ্য তেল, দুধ, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ, আদা ইত্যাদি। চাহিদার তুলনায় এগুলোর উৎপাদন অনেক কম। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, বছরে ২৫-২৬ লাখ টন ডালের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ৮-৯ লাখ টন। বছরে চিনির ১৪-১৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কমবেশি ১ লাখ টন। পেঁয়াজের বার্ষিক ২২ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কমবেশি ১৯ লাখ টন। বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন আদার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি ২ থেকে আড়াই লাখ টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্যানুসারে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বছরে গড়ে ১৪৯.৮ কেজি খাদ্যশস্য গ্রহণ করে। বাংলাদেশে যদি এর পরিমাণ ১৮২.৫ কেজি ধরা হয় এবং শতকরা ২৫ ভাগ বীজ, পশুখাদ্য ও অপচয় ধরা হয়, তাহলে মোট খাদ্য চাহিদা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। এর চেয়ে অনেক বেশি চাল ও মোট খাদ্যশস্য প্রতি বছর আমরা উৎপাদন করছি। তারপরও কমবেশি প্রায় ১ কোটি টন চাল, গম ও ভুট্টা প্রতি বছর আমদানি করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়।

আমরা দেখছি, সাম্প্রতিক দুটি বন্যায় আমনের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় ধানের ফলন গতবারের তুলনায় কমে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। খাদ্য ঘাটতি মেটাতে সরকার ৫ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় আমনের প্রায় ২ লাখ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। আবার অক্টোবরের শুরুর দিকে শেরপুর ও ময়মনসিংহের আকস্মিক বন্যায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর আমনের ফসলি জমি ক্ষতির শিকার হয়। সব মিলিয়ে এবার আবাদি এলাকা কমেছে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর। এর ধারাবাহিকতায় কৃষিসংশ্লিষ্টরা আগেই ধারণা করেছিলেন, আমনের উৎপাদন গতবারের চেয়ে কমে নেমে আসতে পারে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে। ২০২৪ সালের আগস্ট ও অক্টোবরে ভারী বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধির অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যার কারণে দেশে প্রায় ১১ লাখ টন ধান নষ্ট হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ২৩ জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নাটোর, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট ও যশোর।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী ভয়াবহ বন্যায় আউশ, আমন ধান, শাকসবজি, আদা, হলুদ, ফলবাগান, মরিচ, পান, তরমুজ, পেঁপে, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসলের ৯ লাখ ৮৬ হাজার ২১৪ টন ফসল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল যা একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ধানের উৎপাদনে। কৃষিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার কারণে আমনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। আবার অনেক এলাকায় দেরিতে আবাদ করায় উৎপাদন হয়েছে কম। ফলনের ঘাটতি বাদেও দেখা দিয়েছে সার নিয়ে জটিলতা। চলতি বোরো ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি কৃষক, কৃষিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত. উচ্চফলনশীল (এইচওয়াইভি) ও রোগপ্রতিরোধী জাতের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল জাত যেমন ব্রি-৮১, ব্রি-৮৯ ইত্যাদি প্রচলন বাড়ানো। কৃষককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বীজ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সেচ খাল ও গভীর নলকূপ সচল রাখা। ভূগর্ভস্থ পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত এবং পানির অপচয় রোধ করা। যেহেতু আবহাওয়া এখন সব জায়গায় কৃষির জন্য জরুরি তাই, আগাম বন্যা ও খরার পূর্বাভাস কৃষকের কাছে পৌঁছানো। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বোরো ধানের বিকল্প জাত চাষ করা। শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে উপযুক্ত সময়ে চারা রোপণ করা। দরকার ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিংকের সরবরাহ নিশ্চিত করা। সারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাতে কৃষক সহজে পেতে পারে। পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

আগাম বন্যা ও খরার পূর্বাভাস কৃষকের কাছে পৌঁছানো। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বোরো ধানের বিকল্প জাত চাষ করা। শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে উপযুক্ত সময়ে চারা রোপণ করা। এমনটি সফলভাবে করতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা প্রদান। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি ও বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ। সরকারিভাবে ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষককে সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গুদাম ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কৃষক, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই উৎপাদন বৃদ্ধির চাবিকাঠি।

সমস্যা হলো, কৃষি খাতে নতুন করে মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে না। এ খাতে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। কিন্তু এখনও বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। কৃষিতে যেন মানুষ আকৃষ্ট হয় সে বিষয়টা সরকারকে দেখতে হবে। প্রতি বছরই আমাদের কৃষিঋণ বিতরণ বাড়ছে। কৃষিতে সম্ভাবনা অনেক। কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের ৩৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা বিশাল বলে আখ্যায়িত করেছেন গভর্নর। দেশের কৃষিঋণের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে ব্যাংকগুলোর জন্য এ লক্ষ্য অর্জন করা তেমন কিছু না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে কৃষিঋণ আরও অনেক গুণ বাড়াতে হবে। সরকারের নানা প্রচেষ্টার ফলে দেশের পক্ষে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে যদি প্রকৃতি সহায়ক হয়। তারপরও দেখা যাচ্ছে আমন ধানের ফলন ভালো হবে। সামনে বোরো ধানের আবাদ রয়েছে; যা থেকে সরকারের ব্যবস্থাগুলো চাষে প্রত্যক্ষ অবদান রাখবে। সরকার দেশের বাজারব্যবস্থা যতদিন না সংস্কার ঘটাবে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ততদিন পর্যন্ত দরিদ্র গোষ্ঠীকে বেশি ভোগান্তিতে ফেলবে, যা প্রত্যাশিত নয়।

  • অধ্যাপক, হর্টিকালচার বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা