নারী নির্যাতন
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৫ ১১:২৬ এএম
শেলী সেনগুপ্তা
কেউ কি কখনও বলেছে নারীকে কাঁদিয়ো না, নারীর কান্না মানুষ সহ্য করে, প্রকৃতি নয়। না, কেউ বলেনি, হয়তো বলবেও না। শুধু প্রকৃতি জানে নারীর দহন পৃথিবীকেও দাহ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। হয়তো তাই আজ বসুন্ধরা বড়ই রুষ্ট। প্রকৃতির সন্তানরা কেউ ভালো নেই, শুধু ভালো থাকার ভান করছে। মানুষ ছুটছে সুখের পেছনে কিন্তু সুখপাখিটা ধরা দিচ্ছে না, মায়াজালে আটকে আছে মানুষ নামের প্রাণী। এর মূল কারণ মানবিক চরিত্রের অবক্ষয়। নারী জাতির প্রতি অসম্মান, নারীকে শুধু ভোগের বস্তুতে পরিণত করার অপপ্রচেষ্টা। আজকাল নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি অনেকটা মহামারি রূপ ধারণ করেছে। একসময় শুধু যুবতী নারীরা এর শিকার হতো। অথচ এটি এখন এমন এক মহিমায় চলে গেছে যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত এর হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। এখন ধর্ষণ যেন একটি সুপরিকল্পিত শিল্প, প্রতিদিনের অবশ্যই করণীয় একটি কর্মপদ্ধতি, যা গৃহকোণ থেকে শুরু করে গণপরিবহনেও ঘটাতে হবে। এটি যখন ঘটবে তখন চারপাশের মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেখবে যেন কালজয়ী কোনো অস্কারপ্রাপ্ত চলচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। সম্প্রতি গণপরিবহনে অন্তত পঞ্চাশ জন যাত্রীর সামনে দুজন নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা এমনই বলে।

প্রশ্ন আসতেই পারে, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ কী? ধর্ষণ হলো এক ধরনের যৌন সহিংসতা, যা একজন ব্যক্তি অন্য জনের সম্মতি ছাড়া দৈহিক মিলনে বাধ্য করে। এটি একটি বিশাল অপরাধ এবং তীব্রভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি যখন ঘটে তখনও কেউ প্রতিবাদ করে না, এগিয়ে আসে না অসহায় মানবসন্তানটিকে রক্ষা করতে, অধিকন্তু পরবর্তী সময়ে তাকে নানাভাবে বদনামের শিকারে পরিণত করা হয়। আমাদের সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের ভূমিকন্যারা কেউই নিরাপদ নয়। যে এখনও পৃথিবী চেনেনি, সবাইকে যে আপন ভাবে, যার এখন শুধুই পুতুল খেলার বয়স, সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে কে দেবে নিরাপত্তা। পিতা কিংবা পিতৃতুল্য কার কাছে আশ্রয় চাইবে এ অসহায় মানবসন্তান।
কেন এমন হয়, কেন এমন হবে? এটি এখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়, সমগ্র সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেন এমন হয় জানতে হলে যেতে হবে সামাজিক অচলায়তনের মূলে। নারী শ্লীলতাহানির মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক মূল্যবোধের ক্রম অধঃপতন। এর মূলে আরও রয়েছে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে আসার আনন্দময় সুবিধা। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ জাগিয়ে দেয় নতুন করে অপরাধ করার প্রবণতা এবং একই সঙ্গে নতুন নতুন অপরাধীও সৃষ্টি করছে। কাজটিকে তারা রোমাঞ্চকর একটি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে।
আমাদের সমাজে এখনও অনেকে মনে করে নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুই পুরুষের সেবা করার জন্য। এ ধারণা থেকে এক ধরনের হেয় দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী স্বাধীনতার অপব্যাখ্যাও মানুষকে নারীকেন্দ্রিক অপরাধে এগিয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য দরকার বিশাল সামাজিক পরিবর্তন। এজন্য নারীর প্রতি সম্মান দেওয়ার মানসিকতা ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। নারীর সমঅধিকারের বিষয়টিও মনে রাখতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।
সহিংসতার বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে সমাজমাধ্যম। তা ছাড়া নারীর শ্লীলতা রক্ষায় সবার আগে দরকার সচেতনতা বৃদ্ধি। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরে নারীর প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। থাকতে হবে আইনের কঠোর প্রয়োগ। যারা এমন ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আমাদের চারপাশের পরিবেশ নিরাপদ করার দায়িত্ব একযোগে সবাইকেই নিতে হবে। গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে সিসিটিভি স্থাপন করতে হবে। পারিবারিকভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে। নারীদের যেমন আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তেমন আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
কখনও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটলে মিথ্যা আত্মসম্মানের কথা ভেবে কিংবা কারও প্ররোচনায়ও যেন রুখে দাঁড়াতে ভুলে না যায়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে যেন অপরাধীকে ছাড় দেওয়া না হয়। অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিয়ে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ধর্ষকের শাস্তির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সব অব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস এবং শক্তি জাগিয়ে তুলতে হবে নিজের মধ্যে। মনে রাখতে হবে, এ লজ্জা নারীর নয়, নারীকে রক্ষা করতে না পারা সমাজব্যবস্থার।
ধর্ষককে শাস্তি এবং অসহায় নারীকে ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করার জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে গণমাধ্যমকে। অপরাধীকে সবার সামনে নিয়ে আসার পবিত্র দায়িত্ব নিতে হবে গণমাধ্যমকে। অপরাধীর ছবি বারবার বিভিন্ন দিক থেকে সমাজমাধ্যমে বা গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। সমাজের সবাই যেন অপরাধীকে চিনতে পারে। পালিয়ে থাকার কোনোই সুযোগ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অপরাধীর ছবি পোস্টার আকারে দেয়ালে, লাইটপোস্ট, বাসস্টেশন, রেলস্টেশন ও জাহাজঘাটে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
ধর্ষকের জন্য আইন আরও শক্তিশালী এবং দ্রুত কার্যকর করতে হবে। ধর্ষণের মামলাগুলো যেন ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে, একই সঙ্গে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শ্লীলতাহানিকারী প্রত্যেকের শাস্তি প্রদানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন সম্মানিত আইনজীবীরা। আইনের ধারক ও বাহক হিসেবে তাদের উচিত কোনো ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে শামিল না হওয়া। বরং একযোগে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা রাখা উচিত। এমন দিন কি আমরা কখনও দেখতে পাব? বিনীত প্রশ্ন এবং আকুল অনুরোধ রাখলাম শ্রদ্ধেয় আইনজীবীদের কাছে।
আমাদের দেশে আইন করে বন্ধ করা উচিত সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ, যেমন পর্নোগ্রাফি এবং জুয়া। এগুলো আমাদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ধ্বংসের কারণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করার এখনই সময়। পরিবার থেকেও এগিয়ে আসতে হবে সন্তানকে সঠিক শিক্ষাদানে।
বর্তমান বিক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের দেশের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পবিত্র দায়িত্ব জাতি-ধর্ম-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবার। তাই আর নয় পেছনে পড়ে থাকা। নতুন দিনের কথা মনে রেখে সুন্দর ও সফল জীবনের জন্য নারীকে এগিয়ে যেতে হবে শিক্ষায়, এগিয়ে যেতে হবে কর্মে এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে। এখন আর ভয়ে নয়, দাঁড়াতে হবে মাথা তুলে, বাঁচতে হবে আত্মবিশ্বাসে। তবেই বাংলাদেশ হবে উন্নয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন থেকে শুরু হোক এমন দিনটির জন্য আমাদের অপেক্ষা।