সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৫ ০৯:৫৭ এএম
প্রবা গ্রাফিক্স
নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সুস্বাস্থ্যের জন্য এর বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে আমরা যে খাবার খাচ্ছি, তা কতটা নিরাপদ? খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি কারও অজানা নয়। এ নিয়ে প্রতিনিয়তই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পাচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জই বটে। কারণ, আমরা যা খাচ্ছি সে খাদ্যপণ্যগুলো কি ‘খাদ্য পরীক্ষাগার’ থেকে অনুমোদিত? সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের একজন খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। তথ্যটি রীতিমতো উদ্বেগের।
১১ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ “বেকার’ পড়ে আছে খাদ্য পরীক্ষার ল্যাব” শিরোনামের প্রতিবেদনটি সে উদ্বেগ আরও জোরালো করেছে। প্রতিবেদনে খোদ ঢাকা সিটি করপোরেশনের খাদ্য পরীক্ষার ল্যাবের অব্যবস্থাপনার চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার কাজী আলাউদ্দীন রোডের পরীক্ষাগারটিতে খাদ্যের রাসায়নিক পরীক্ষার কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক না থাকায় হচ্ছে না খাদ্য পরীক্ষা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরবাসীর নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে এ পরীক্ষাগারে পাঠালে খাদ্যের নমুনাগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও এখানে খাদ্যের মাইক্রোবায়লজিক্যাল পরীক্ষা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য পরীক্ষানিরীক্ষার পর সনদে স্বাক্ষর দেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। জানা গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পদটি শূন্য। ফলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে ল্যাবরেটরির সব কার্যক্রম। বসে বসে সময় কাটাচ্ছেন ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বেকার বসে আছেন সিটি করপোরেশনের খাদ্য পরিদর্শকরাও। ফলে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজও বন্ধ। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সহযোগিতায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ইউপিইএইচএসডিপি)-এর অধীনে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার নির্মাণ করা হয়। নগরবাসীর নিরাপদ খাদ্যের জন্য জার্মান প্রযুক্তিতে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে পরীক্ষার ল্যাবে। ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ল্যাবরেটরিটি উদ্বোধন করা হয়। বলা হচ্ছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের অভাবে খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরীক্ষা করতে পারে না প্রতিষ্ঠাটি। ল্যাবরেটরিটি বন্ধের ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. জিল্লুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘আমি আজই প্রথম আপনার থেকেই অবহিত হলাম। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব কী অবস্থায় আছে। এরপর পদক্ষেপ নেব।’ রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটি ঠুনকো অজুহাতে বন্ধ থাকার বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে খাদ্যে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো অণুজীব থাকলে বমি, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, হজমের সমস্যা ও অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পেশি দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল থাকলে অসুখবিসুখ বাড়বে; রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হবে। মানুষের কর্মক্ষমতা কমতে থাকবে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জরিপ বলছে, বাংলাদেশের কমবেশি প্রতি চারজনের একজন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। এটা সত্য, আমাদের দেশে নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করাই বিশাল একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। কিন্তু তাই বলে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি কোনোভাবে উপেক্ষিত হওয়া ঠিক নয়। কারণ জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক হলেও আমাদের নীতিনির্ধারকদের নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে সচেতনতা, দায়িত্বহীনতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বচ্ছতারও অভাব রয়েছে।
ফলে দায়িত্বশীল সংস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও খাদ্যপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণনের নানা স্তরে রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদান থেকে নিরাপদ রাখার কোনো ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি।
এ কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে। সহজ করে বললে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামে একটি সরকারি সংস্থা কাজ করছে, এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা একেবারেই দৃশ্যমান নয়। শুধু খাদ্যের জোগানই নয়, নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নাগরিকের অধিকারের মধ্যে পড়ে। নীতিনির্ধারকদের এখানে মনোযোগী হতে হবে। আমরা মনে করি, নিয়মিত জীবাণু পরীক্ষা ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশ্বের বহু দেশে খাদ্যের রাসায়নিক ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। সিটি করপোরেশনে খাদ্য পরীক্ষাগার বন্ধ রাখা উচিত হয়নি। অর্গানোগ্রামে পদ না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ
পদে নিয়োগ দিতে না পারার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নিরাপদ খাদ্য শুধু পুস্তক বা স্লোগানের বিষয় নয়। আমরা দ্রুত পরীক্ষার ল্যাবটি সচল করার জন্য বলি। খাদ্যপণ্যে সব ধরনের ল্যাব পরীক্ষা নিশ্চিত করা হবেÑ এটাই প্রত্যাশিত।