নিত্যপণ্য
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৫ ১০:৫৫ এএম
আমাদের দেশে রমজান মাস এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার প্রবণতা বরাবরই লক্ষ করা যায়। প্রায় প্রতি বছর রমজানের আগমুহূর্ত থেকেই কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহের ঘাটতির অজুহাতে নানা প্রকারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে তোলেন। চাল, ডাল, চিনি, তেল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি লেবু, শসা, কাঁচা মরিচ, বেগুনের দামও যেন পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
এ বছর রমজান শুরু হওয়ার আরও আগে থেকেই বাজারে চলছে অস্থিরতা। সরকারের পক্ষ থেকে ক্রমাগত বলা হচ্ছে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক, অথচ বাজারে গেলে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ দোকান থেকেই উধাও পণ্যটি। বহু দোকান খুঁজে পণ্যটি পাওয়া গেলেও কিনতে গিয়ে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। সারা দিন রোজা শেষে বেশিরভাগ মানুষই শরবত দিয়ে ইফতার শুরু করে। সেই শরবতের অপরিহার্য অনুষঙ্গ লেবুর দাম এবার মাত্রাতিরিক্ত চড়া। আগে যে লেবু ৩০ থেকে ৪০ টাকা হালি ছিল, তা এখন বাজারভেদে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারা, আঙুরের মতো ফলমূলের দামও কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানে ঘরে এবং হালিম, কাবাব, তেহারি, বিরিয়ারি ইত্যাদি নানা পদের মুখরোচক ইফতার আইটেমের জন্য মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মুরগির বাজারেও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। কেজিতে ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। গরুর মাংসের দামও রোজার আগমুহূর্ত থেকেই কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
তবে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুর এবার চিরাচরিত প্রথা ভেঙেছে। প্রতি বছর রোজার আগে থেকেই খেজুরের বাজার চড়া হতে শুরু করে। তবে আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে গতবারের তুলনায় এবারের রমজানে খেজুরের দাম অন্তত ২০ শতাংশ কম যা ক্রেতাকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। দেশে ছোলার চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন। এবার যথেষ্ট পরিমাণে ছোলা আমদানি হওয়া সত্ত্বেও দামের ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব পড়েনি।
এ ছাড়া এবার দেশে আলু ও পেঁয়াজের ফলন ভালো হওয়ায় এ দুটি পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের মধ্যেই আছে। দীর্ঘদিন ধরেই বাজারব্যবস্থা চরম অনিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলছিল। তারপর বিগত সরকারের পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। বাজারব্যবস্থা সেই পুরাতন সিন্ডিকেট চক্রের হাত থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বিস্তৃত। সরকারের উচিত ছিল প্রথম থেকেই বাজারব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করবার, কিন্তু বাস্তবে সেভাবে কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। পণ্যের বাড়তি দাম থেকে যেন কোনোভাবেই মুক্তি মিলছে না ক্রেতাসাধারণের। যেমন চালের বাজার বেশ কয়েক মাস ধরেই অস্থির হয়ে আছে। পাশাপাশি ডাল, সয়াবিন তেলসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। বাজার করতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে ডাল-ভাত খেয়ে টিকে থাকাটাও ক্রমান্বয়ে কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে। মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সংকুলান হচ্ছে না। অস্থিতিশীল বাজারব্যবস্থার প্রকোপে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নিদারুণ আতঙ্কের মধ্যে আছে। একে তো রমজানের অস্থিতিশীল বাজার, পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ দিনদিন বেড়েই চলেছে। চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্যে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। সাধারণ ক্রেতারাও উৎকণ্ঠায় আছেন। মানুষের জীবনজীবিকা বিপন্ন হয়ে উঠেছে। রমজান এলে ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় দোকানের বিক্রি ও ব্যবসা চাঙা হয়ে ওঠে। তবে এবার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্রেতারা বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে বাজারে যেতে এবং সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করতেও ভয় পাচ্ছেন। ফলে সার্বিকভাবে বেচাকেনা কমে এসেছে। এবার রমজানে মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী সবার একই অভিযোগ। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে তারা আরও লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তাই রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সচেষ্ট হতে হবে, কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রোজার মাসের অধিক চাহিদার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন পণ্য সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নিতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে টিসিবিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে যদি আরও সক্রিয় করা সম্ভব হতো তবে দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো অনেক উপকৃত হতো। যদিও সাধারণ মানুষ যাতে আমিষের প্রয়োজন মেটাতে পারে সেজন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সুলভে ডিম, দুধ ও মাংস বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় নেহাত অপ্রতুল বটে। রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সমাজের সবারই দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে ব্যবসায়ী ও সরকার পরস্পরকে দোষারোপের সংস্কৃতি অতীতের মতো বহাল রয়েছে। এতে জনগণের কোনো উপকারের দৃষ্টান্ত দেখার সুযোগ হয়নি। এ দোষারোপের সংস্কৃতি দেশের সার্বিক স্বার্থেই বন্ধ করা জরুরি। অসাধু ব্যবসায়ী শ্রেণি যাতে পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি থেকে অধিক মুনাফার আশায় বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে- সে ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আবার রমজানে অনেক উচ্চবিত্ত শ্রেণির ক্রেতা সারা মাসের বাজার একসঙ্গে করেও বাজারের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করেন। এ মানসিকতা থেকে বিত্তবান ক্রেতাদের বেরিয়ে আসা দরকার।
মনে রাখতে হবে, রমজান সংযম-সাধনা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। আমরা নিজের ভোগবাদিতায় লিপ্ত হয়ে যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়াই।
সমাজে অনেকেই আছে সারা দিন না খেয়ে কেবল ইফতারের সময় তিন বেলার আহারই যেন এক বেলায় খাবে। সচ্ছল কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোয় ইফতার টেবিলে নানা পদের বাহারি ইফতারি আইটেমের সমাগম ঘটে। অথচ দেশের সমষ্টিগত দরিদ্র কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার আছে যারা সামর্থ্যের অভাবে কেবল ছোলা, মুড়ি ও শরবতসহকারে ইফতার করার যোগ্যতা রাখে না। এসব পরিবারের জীবনযাপন প্রণালি যদি আমাদের মানবিক মূল্যবোধে স্থান পেত তাহলে এমন ভোগবিলাসিতা আমাদের স্পর্শ করতে পারত না। ইফতারের ফর্দ কাটছাঁট করে খাদ্যবিলাসী তৎপরতা থেকে বিরত থেকে সাধারণের পাশে দাঁড়াতাম। জীবনযাপনে কৃচ্ছ্রসাধন তখন রমজানের উদ্দেশ্য হয়ে উঠত। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ভোগবাদ মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে আমরা আত্মকেন্দ্রিকতায় আটকে পড়েছি। সমষ্টিগত চিন্তাচেতনার অবকাশ থাকছে না। এ অবস্থার অবসানে অপরিহার্য বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। সেটা তো মানতেই হবে।