বাংলার ঐতিহ্য
মো. অহিদুর রহমান, পরিবেশকর্মী
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ১৪:৫৩ পিএম
মো. অহিদুর রহমান
কোনো খাবারই যে কোনো এলাকায় হঠাৎ তৈরি হয় না। যুগের পর যুগ মানুষের চর্চা ও লোকায়ত জ্ঞানের মাধ্যমে তৈরি হয়। প্রান্তিক মানুষের জ্ঞান, লোকজ প্রযুক্তি, চিন্তা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মিলেই তৈরি হয় স্থানভিত্তিক লোকজ খাবার। সে খাবার মানুষের নিজস্ব সম্পদ। স্থানীয় খাবারগুলো নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। ঐতিহ্যগত খাদ্য বা ঐতিহ্যবাহী খাবার বলা হয় সেসব খাবারকে- যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হাত ধরে সমজনপ্রিয়তায় টিকে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতার ওপর এসব ঐতিহ্যবাহি খাবারের একটি দৃঢ় প্রভাব থাকে।
বাংলাদেশের একেকটি এলাকায় এক বা একাধিক খাবার বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। যেমন নাটোরের কাঁচাগোল্লা, বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, খুলনার সন্দেশ, পাবনার ঘি, শিবগঞ্জের চমচম, মুক্তাগাছার মন্ডা, নেত্রকোণার বালিশমিষ্টি, কিশোরগঞ্জের স্পঞ্জমিষ্টি, জামালপুরের ছানার পোলাও, ছানার পায়েস, শেরপুরের ছানার চপ, মুন্সিগঞ্জের ভাগ্যকুলের মিষ্টি, মাগুরার রসমালাই, নড়াইলের পোড়াসন্দেশ, মেহেরপুরের রসকন্দ, মিষ্টিসাবিত্রী, ভোলার মহিষের দুধের দই, নারায়ণগঞ্জের পোড়ামিষ্টি, ফেনীর মহিষের দুধের ঘি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী রসমালাই, লালমনিরহাটের রসমিষ্টি, কুড়িগ্রামের চমচম, সুনামগঞ্জের দেশবন্ধুর মিষ্টি, নীলফামারীর ডোমারের সন্দেশ, গাইবান্ধার রসমঞ্জরি, চাঁপাইয়ের আম ও পেছানো জিলাপি, ঢাকার বাকরখানি প্রভৃতি।
নরসিংদীর সাগরকলা, মধুপুরের আনারস, নওগাঁর চাল, রাঙামাটির কলা, আনারস; মৌলভীবাজারের খাসিয়া পান, কক্সবাজারের মিষ্টিপান, বান্দরবানের হিলজুস, গাজীপুরের কাঁঠাল, লক্ষ্মীপুরের সুপারি, চাঁদপুরের ইলিশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালের বড়া, রাজশাহীর আম, দিনাজপুরের লিচু, চিড়া; চট্টগ্রামের শুঁটকি, খাগড়াছড়ির হলুদ, সিলেটের চা, সাতকড়া, কমলা; নোয়াখালীর নারকেল নাড়ু, রংপুরের ইক্ষু, শরীয়তপুরের খেজুরের গুড়, বিনিয়ানা পিঠা; গোপালগঞ্জের বাদাম, বরগুনার চুইয়া পিঠা, চালের রুটি; কালাই রুটি, ঝিনাইদহের হরিধান, ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যপুরী আম, পঞ্চগড়ের ডিমভুনা, জয়পুরহাটের চটপটি, হবিগঞ্জের চা, ফরিদপুরের খেজুর গুড়, বাগেরহাটের চিংড়ি, সুপারি; যশোরের খেজুর গুড়, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, কুলফি আইসক্রিম; চুয়াডাঙ্গার পান-ভুট্টা; ঝালকাঠির লবণ, আটা; পিরোজপুরের পেয়ারা, বরিশালের আমড়া, ভোলার নারকেল, খুলনার চুই ঝাল, কুড়িগ্রামের ক্ষীরমোহন, সিরাজগঞ্জের পানতোয়া, রংপুরের শোলকা, প্যালকা ও সিঁদল।
কোনো একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া এবং ওই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাহলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৌলিক পণ্যগুলোর জিআই স্বত্ব নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন তৈরি হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৫ সালে প্রথম জামদানি শাড়ির জিআই স্বত্বের আবেদন জানায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন। পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও দুটি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে দেশের প্রথম জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায় জামদানি শাড়ি। ২০১৬ সালে ইলিশ, ২০১৭ সালে চাঁপাইয়ের ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, হাঁড়িভাঙা ও ফজলি আম, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল ও কালিজিরা ধান; ২০১৮ সালে বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলসীমালা ধান; ২০১৯ সালে বাগদা চিংড়ি, ২০২৩ সালে নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম, রাজশাহী ও চাঁপাইয়ের ফজলি আম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, মুক্তাগাছার মন্ডা, যশোরের খেজুর গুড়, নরসিংদীর অমৃত সাগরকলা, রাজশাহীর মিষ্টিপান, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, নরসিংদীর লটকন, মধুপুরের আনারস, ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই, মাগুরার হাজারীপুরি লিচু; ২০২৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি, সুন্দরবনের মধু, শেরপুরের ছানার পায়েস, গাজীপুরের কাঁঠাল, কিশোরগঞ্জের রাতা বোরো ধান, অষ্টগ্রামের পনির, বরিশালের আমড়া, দিনাজপুরের বেদানা লিচু।
আসে নবান্ন, আসে শীত, শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পিঠা বানানো ও খাওয়ার ধুম পড়ে যায় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে। এখনও নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ অঞ্চলে শত প্রকার পিঠা তৈরি হয়। প্রদর্শন করা হয় বিভিন্ন মেলায় ও উৎসবে। গ্রামের নারীরা তাদের হাতের নৈপুণ্য দিয়ে নানা জাতের, নানান বর্ণের পিঠা তৈরি করেন। কত বাহারি নামের পিঠাই না তৈরি করেন গ্রামের নারীরা।
যেমন ধামাপিঠা, পুলিপিঠা, শাহিপিঠা, মেরাপিঠা, কেকপিঠা, পাটিসাপটা, গাজরের পাটিসাপটা, নারকেলের পিঠা, মলপিঠা, মালপোয়া, চ্যাপাপিঠা, ফুলপিঠা, দুধপুলি, তালের পিঠা, কলার পিঠা, তালের পাটিসাপটা, সবজিপিঠা, ভাপা, সাচের পিঠা, ঝালপিঠা, মেরাপিঠা, মসসাপিঠা, নকশিপিঠাসহ শত জাতের পিঠা।
ঋতুর যেমন বদল ঘটছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের বৈচিত্র্য। অচাষকৃত কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার গ্রামীণ জনগণের দুর্দিন ও দুর্যোগের সাথী। শাকের মধ্যে কলশি, হেলেঞ্চা, গোল হেলেঞ্চা, আগ্রা, কচু, গিমাই, কচুর লতি, থানকুনি পাতা, কলার মোচা, দলকচু, সাঞ্চি, বেত, ডুমুর, বউটুনি, শাপলা, ঘ্যাটফল, পেপুল তেলাকচু, সানচি, কাটানটি, ব্রাহ্মি, তিতবেগুন, কাটাকচু, বনকচু, ডুমুর, কলার মোচা, বন আলু, বনকলার থোড় ও মোচা, কলমি, বাঁশের কোড়ল, তেলাকুচা, ডেফল, ডেউয়া, গিমা, ঘৃতকাঞ্চন, কালমেঘ, শতমূলীর মতো বনজ খাদ্য-ফল-ঔষধি গাছ বিক্রি হতে দেখা যায়।
বর্ষার দিনে হাওরে মেলে শালুক, পানিফল, ঢ্যাপ, কইর্যালি আর মাতুক। চৈত্রের সংক্রান্তিতে তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার নিয়ম। প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যজগতের সম্পর্কটি দিনে দিনে আর ঠিক থাকছে না। সারা দেশের প্রতিটি জেলায় এসব প্রাকৃতিক খাবার সংগ্রহ করে, রক্ষা করে জীবন চলে অনেক প্রান্তিক মানুষের।
দেশের বিখ্যাত ২০টি খাবার যা আমাদের আকৃষ্ট করে সব সময়। পুরান ঢাকার হাজি বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি, বাকরখানি, ইলিশ, কাবাব; চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি গরুর মাংস, ভুনিখিচুড়ি, চট্টগ্রামের মাংসের কালাভুনা, বরিশালের ও সাতক্ষীরার চিংড়ির মালাইকারি, বরিশালের নারকেলের পেটে চিংড়ি, চট্টগ্রাম, কুলিয়ারচর, মোহনগঞ্জের শুঁটকি, বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম, কুমিল্লার চমচম, মুক্তাগাছার মন্ডা, নেত্রকোণার বালিশমিষ্টি, পুরান ঢাকার ছানা মাঠা, শ্রীমঙ্গলের সাতরঙ চা, তা ছাড়া চটপটি, ফুচকা, পায়েস বোরহানি এবং হালিম।
স্থানভিত্তিক প্রতিটি প্রাণীর আলাদা খাবার আছে। প্রতিটি প্রাণের নিজস্ব পছন্দ করা খাবার আছে। প্রতিটি প্রাণী খাদ্যের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এক একটা এলাকায় বসবাস শুরু করে। তার খাদ্যের অভাব হলেই স্থান ত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে যায়। হাতির খাবার কলাগাছ, লতাপাতা, বাঁশের খেরুল, ফলসহ তার পছন্দের খাবারের অভাব হলেই সে কৃষি ফসলের কাছে চলে আসে। শুরু হয় মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব। বাঘের খাবার হরিণসহ বনের অন্যান্য প্রাণী। তাই সে সুন্দরবনে বসবাস করে। মাছের, গাছের, পাখির, ব্যাঙের, প্রজাপতি, মৌমাছি, গরুর প্রত্যেকের আলাদা পছন্দের খাবার আছে। যে খাবারগুলো অঞ্চলভিত্তিক বনে জঙ্গলে, জলভূমিতে, পাহাড়ে জন্মে থাকে। অনেক স্থানীয় খাবার হারিয়ে যাচ্ছে কোম্পানির বাণিজ্যিক ও প্যাকেটজাত খাবারের ভিড়ে। তা ছাড়া রাসায়নিক সার, কীটনাশক, রিফিট, আগাছানাশক, রোটানলসহ নিষিদ্ধ কীটনাশক প্রয়োগের ফলে অনেক প্রাণ ও অচাষকৃত খাদ্য দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ নানাভাবে বিনষ্টের ফলে বহু স্থানীয় খাবার হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ তার পছন্দের খাবারটা তার এলাকাতেই উৎপাদন ও গ্রহণ করতে পারে। নিজ নিজ পছন্দের খাবার গ্রহণ করতে পারার নামই খাদ্য সার্বভৌমত্ব। প্রান্তিক কৃষক নিজের জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী কৃষিপণ্য উৎপাদন করবে এবং খাদ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এটাই প্রত্যাশা হওয়া উচিত।