× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি

সংকট নিরসনে দরকার সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা

ড. এম শামসুল আলম

প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ১৪:৩২ পিএম

ড. এম শামসুল আলম

ড. এম শামসুল আলম

দেড় দশক ধরে জ্বালানি খাতে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে লুণ্ঠন করা হয়েছে। সেসময় অলিগার্কদের শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে হাতিয়ার ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০। আইনটি দুই বছরের জন্য করা হলেও বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টেনে আনা হয়। এই আইনের মাধ্যমে যেমন দুর্নীতি, লুণ্ঠন, আত্মসাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত ও লুণ্ঠনকারীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়; তেমনি এই আইন দিয়ে পছন্দমাফিক বিনিয়োগকারী ও ঠিকাদারকে বাছাই করা হয়। সেজন্য এই অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত ছিল সবাই অপরাধী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অবাধ লুণ্ঠনের সুরক্ষাকবচ হিসেবে আইনটি করা হয়। বিগত ৫ আগস্ট অবধি আইনটি বলবৎ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সে আইন স্থগিত করায় ভোক্তারা খুশি। ভোক্তারা বছরের পর বছর লুণ্ঠিত হয়েছে। পুঞ্জীভূত সেই লুণ্ঠনের পরিমাণ কত হতে পারে, তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। এই আইনের আওতায় বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগে উন্নয়ন হওয়ায় এই ব্যাপক লুণ্ঠন সম্ভব হয়।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিবিড়ভাবে জড়িত। আর এই মূল্যবৃদ্ধি ন্যায্যতার ভিত্তিতে যৌক্তিক পন্থায় করা হয়নি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে যে যেখানে যেভাবে পারছে পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে। সরকার বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বেঁধে দেয়। কিন্তু সেই দামে বিক্রি হয় না। জ্বালানি খাতকে সরকার তার বড় আয় ও লাভের খাত হিসেবে দেখে। দেশের শিল্প ও কৃষি খাত যেভাবে জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার শিকার এবং সরকার ভর্তুকি দেবে না বলে সেসব জায়গায় যেভাবে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হচ্ছে, তাতে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই চূড়ান্ত সর্বনাশের শিকার হতে পারে সরকার ও জনগণ উভয়েরই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে। তাদের নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে আমাদের নির্মাণ ব্যয় তুলনা করলে দেখা যায়, এ দুই ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য আকাশপাতাল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে আমরা অনুধাবন করতে পারি, জ্বালানির সুবিচার থেকে বাংলাদেশের মানুষ কতটা বঞ্চিত। আর এ সুবিচার বঞ্চিত করা বা হওয়ার মাত্রা পরিমাপের একটাই প্যারামিটার, তা হলো লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও লুণ্ঠনমূলক মুনাফা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যয় অপেক্ষা যতটা অধিক বৃদ্ধি করা হবে, ততটাই হবে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়/মুনাফা। কিন্তু জ্বালানি সুবিচার বিবেচনা করার বিষয়টি একেবারেই গত সরকারের ভাবনা ছিল না। ফলে দেশের জনগণ জ্বালানির সুবিচার নয় বরং অবিচারের শিকার হয়েছে। তাই জ্বালানি সুবিচার সুরক্ষিত না হলে জনগণের সার্বিক অধিকার সুরক্ষিত হতে পারে না।

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন চরমে। লুণ্ঠনের অর্থ জোগানোর কারণে এমনটি হয়েছে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে জ্বালানি সংকট দূর করার জন্য এই ব্যয় করত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকৃত উন্নয়নে সেই ব্যয় হলে আজ এই অবস্থা হতো না। লোডশেডিংও দেশে থাকত না। মূল্যস্ফীতি বা দেনার দায়ে দেশকে ডুবতে হতো না। অলিগার্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সেসময়ের ক্ষমতাসীনরাই লাভবান হয়েছেন। এমনকি তারা নিজেরাও এর অংশ। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা যেমন চিহ্নিত তেমনি লুণ্ঠনের সুবিধাভোগী ও দায়ভার মন্ত্রী এবং আমলাদের ওপরও বর্তায়। সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে কিছু করণীয় প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে ‘সংস্কার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশন সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করবে। সে প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলে দেখা যাবে, লুণ্ঠনের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, মূল্যবৃদ্ধি করেও যেগুলো সমন্বয় করা যায়নি, সেই ঘাটতিগুলো দ্রুত কমে আসবে।

বিগত সরকার জ্বালানি খাতে যে গভীর সংকট তৈরি করে গেছে, তা সমাধানে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দরকার হবে। আশা করি, অন্তর্বর্তী সরকার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ভোক্তাদের অন্তর্ভুক্তিতে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন শুরু হলে, তিন মাসের মধ্যে এর সুফল দৃশ্যমান হবে। এর ফলে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় হ্রাস পাবে। মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা প্রশমিত হবে। বিনিয়োগ না করে এত দিন সরকার জ্বালানি খাতকে রাজস্ব আহরণের বিশেষ খাত মনে করত। সরকার এ খাতকে লাভজনক করেছে। অর্থাৎ যত বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তত বেশি সরকারের লাভ হয়েছে। সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট পেয়েছে, বিভিন্ন কোম্পানি থেকে মুনাফার ভাগ নিয়েছে। এখন বর্তমান সরকারকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, রাষ্ট্র এ খাতকে রাজস্ব বা মুনাফা আহরণের খাত হিসেবে দেখবে না। জনগণের কোম্পানি হিসেবে যতটুকু খরচ হবে, ততটুকুই ভোক্তা দেবে। তাতে মুনাফা বা লাভ থাকবে না অর্থাৎ সরকার ব্যবসায়ী হবে না। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটেছে। সরকার বদল হয়েছে। তাই এটি বাস্তবায়নের এখনই সময়।

মুনাফাবিহীন কার্যক্রম ও সরকারের রাজস্ব আহরণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে মূল্যবৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার প্রায়শই ট্যাক্স-ভ্যাট কমায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে তা কখনও হয়নি; যা লুণ্ঠন সুরক্ষার শামিল। দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির অজুহাতে দ্রুত লুণ্ঠন বৃদ্ধির জালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন আটকা পড়েছে। গণআন্দোলনের মুখে জ্বালানি রপ্তানি প্রতিহত হলেও নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নে আগ্রহী না হয়ে সরকার আমদানিতেই বেশি আগ্রহী হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ বা সংশয় নেই। তেল, গ্যাস, কয়লা, এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। সেই সঙ্গে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান মুনাফামুক্ত হয়। ঘাটতি সমন্বয় হয় এবং মূল্যবৃদ্ধির অবকাশ থাকে না।

আমাদের চাহিদা বেড়েছে। কাজেই আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। তেল আমদানি বৃদ্ধি না করে, নিজস্ব গ্যাসের মজুদ ও উত্তোলন বৃদ্ধি করা যেত। পর্যায়ক্রমে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধিতে অগ্রসর হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকত। জনগণকে মূল্যবৃদ্ধি ও চরম জ্বালানি সংকটের অভিঘাতের শিকার হতে হতো না। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে সরকার নিজস্ব গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি না করে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির ফলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিকল্প নেই। দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়। উৎপাদন ব্যয় জরুরি বিবেচ্য বিষয়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে তা আর্থিক ঘাটতি বৃদ্ধিতে অন্যতম নিয়ামক হবে। সৌরবিদ্যুতের সুফল ভোক্তা পাবে না। মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতের শিকার হবে।

বিদ্যুৎ আমদানি বাজার তৈরিতে সহায়ক হবে। পরিবেশ সুরক্ষার আওয়াজে পরিণত হবে। ছাদ ও অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে ৫০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তাতে খরচ কম পড়ে। প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগে উৎপাদন হলে ৬-৭ টাকা বিক্রয় মূল্যহারে এ বিদ্যুৎ বাজার উন্নয়ন সম্ভব। তেমনটা হলে সৌরবিদ্যুৎ খুব ভালো বিকল্প। পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দামের বিষয়টি আগে আলোচনায় আসা দরকার। পারমাণবিক বিদ্যুতের দাম যদি আদানির বিদ্যুতের মতো বেশি হয়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ বিদ্যুতের ভূমিকা কী হবে? বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয় তথা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েইবা কতটা ভূমিকা রাখবে? এমন সব প্রশ্নের মীমাংসার ওপর নির্ভর করছে এই বিদ্যুতের ওপর কতটা নির্ভর করা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারকে খাদ্য নিরাপত্তার মতোই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্যই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন বাণিজ্যিক খাত হিসেবে নয়, কৃষি খাতের মতো সেবা খাত হিসেবে হতে হবে। এই বিবেচনায় ক্যাবের প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে যদি সরকার জ্বালানি রূপান্তর বিবেচনায় নেয়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি ব্যতীত ঘাটতি সমন্বয় হবে, একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

  • জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা