ফিলিস্তিন
হালা এইচ ডুরাহ
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৫ ১২:২০ পিএম
হালা এইচ ডুরাহ
গাজায় ইসরায়েলের অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে গত ১৬ মাসে আমার পরিবার ও নিকটাত্মীয়ের অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছে। প্রতিবারই সমাজমাধ্যমে আমি আহাজারি করে পোস্ট করেছি। অথচ একজন কনসালট্যান্ট হিসেবে আমাকে প্রতিনিয়ত অপরিচিত অনেককে সান্ত্বনা দিতে হয়। সেগুলোও আমি প্রচার করেছি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিবারের সদস্যদের অনেকেই তাদের আতঙ্কের কথা জানাচ্ছেন। আস্তে আস্তে আমার মনেও তা ছায়া বিস্তার করতে শুরু করেছে। এ চাপের মধ্যেও সকালে আমাকে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে বাচ্চাদের একটি স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। সময় এগোয়, ১০ জন তা কয়েকদিনে ২০, তারপর ৩০ এবং একসময় তা বাড়তেই থাকে। এখন শুধু আমার ব্যক্তিগত জীবনেও স্বজন হারানোর বেদনা ১০০ ছুঁয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক এ চাপ বিবেচনা করলে গাজায় এখনকার যাপিত জীবনকে বোঝা সহজ হবে। গাজায় এখন প্রতিদিন আমাদের শোক আর আহাজারি করতে হয়। কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত তো তা করা যায় না। অবস্থাটি অনেক ভারবহ হয়ে ওঠে। আমার প্রিয়জনদের মধ্যে যারা জীবিত বা মৃত তাদের অবস্থার খবর এখন কেমন যেন স্বাভাবিকই মনে হয়। অনেকটা ডিস্টোপিয়ান কোনো উপন্যাসের মতো।
-67c3f8880ac6a.jpg)
গাজায় আমার সন্তানতুল্য শিশুদের অনেক ছবি আর ভিডিও প্রতিদিনই দেখেছি। অনেক ভিডিওতে মায়েরা তাদের মৃত সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে কান্না করতে থাকে। চিরবিদায়ের আগে তারা একটানা কেঁদে নিচ্ছে। এ দৃশ্য আমাকে প্রতিবার ভীষণ আবেগতাড়িত করে তোলে। অনেক ভিডিওতে শিশুরা মায়েদের কবর আঁকড়ে কান্না করছে। এমন অমানবিক দৃশ্য গাজা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও রয়েছে কি-না সন্দেহ। প্রতিবার চোখ মুছে ভাবি, এটাই আমার স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু মনের ভেতর আমি জানি, আমার জীবন আর কোনো দিন স্বাভাবিক হবে না।
অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এ রাষ্ট্রে ডায়াস্পোরার মতো অবস্থান করে। তাদের মধ্যে এক ধরনের বেঁচে যাওয়ার আত্মগ্লানি রয়েছে। আমরা সব সময় ট্রমাটাইজড থাকি। আস্তে আস্তে ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এভাবেই এটুকু ভেবেই আমরা বুঝতে পারি, যদি এখনও মুদ্রার পিঠ পাল্টায় তাহলে আমরা সবাই অদৃশ্য হয়ে যাব। গাজায় গণহত্যা পরিচালনা এক বিষয়। কিন্তু এ গণহত্যা ফিলিস্তিনিদের মানসপটে যে ভয়াবহ ছাপ ফেলেছে সেটি কোন আঙ্গিকে বিচার করতে হবে? আপনার পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যুই মনের ওপর ভারি ছাপ ফেলে। আর এমনটি আমাদের অকূল পাথারে ফেলে দেয়। আমার প্রথম সন্তান দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। ওই সময়কার অসহায়ত্ব এখন আমার মনে থিতু হয়েছে। কিন্তু বিগত ১৬ মাসে যে অত্যাচার আমাদের ওপর পরিচালিত হয়েছে, তা আমাদের যন্ত্রণাকে অস্বীকার করাতে পারেনি। এ হত্যাগুলো ন্যায়বিচার পায়নি; তার কোনো চেষ্টাই হয়নি। বরং আমাদের যন্ত্রণাকে নানাভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। আমাদের মানুষকে অমানবেতর হিসেবেই উপস্থাপনের নেতিবাচক প্রক্রিয়া চালু ছিল। আমার কাজিন নিসরিনের দারুণ সুন্দর নীলচে চোখ ছিল। এক এয়ার স্ট্রাইকে সে নিহত হয়। আমি প্রায়ই ওর শেষ মুহূর্তের কথা ভাবি। সে কি মরে যাওয়ার আগে বিকট চিৎকার করেছিল? ওর সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল। ভাগ্যের চক্রান্তে তা আর সম্ভব হয়নি।
আমার আরেক কাজিন ওয়াসিম সব সময় হাসিখুশি ছিল। তাকে সর্বশেষ ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিওতে মিসরীয় সীমান্তরক্ষী গার্ডদের উদ্দেশে চিৎকার করে কিছু বলতে দেখেছি। সে আর্তচিৎকার করে জানাচ্ছিল, ‘ওরা আমাদের মেরে ফেলছে। আপনারা দয়া করে সীমান্ত খুলে দিন। না হলে আমাদের কেউ বাঁচবে না।’ এ রকম ইনস্টাগ্রামের অনেক কিছুই আমাকে আজীবন আতঙ্কগ্রস্ত রাখবে। গত বছর ডিসেম্বরে এক ফিজিশিয়ানের সঙ্গে পরিচিত হই, যিনি তার তাঁবুতে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে মৃত্যুবরণ করেন। গাজায় বিষণ্নতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র শীত। গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গ এলেও এখনও মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। তাই মানুষ কতটা অপুষ্টিহীনতায় ভুগছে বলাই বাহুল্য।
ইসরায়েল নানাভাবে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাউকেই নির্মূল করছে। এ ক্ষেত্রে তারা সিভিলিয়ান, সামরিক কর্মী কাউকেই বাছাই করছে না। সম্প্রতি গাজার স্বাস্থ্যকর্মী বা প্রধান হাসপাতালের পরিচালক আহমাদের অন্তরিন হয়ে যাওয়ার ঘটনাটিও করুণ। কোথায় না কোথায় যেন মানুষ তাঁবুতে বরফশীতল হয়ে একা মরে পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের আড়ালেও আছে অনেকে। এমন অমানবিক অবস্থা কি কোনো জাতির ভাগ্যে ঘটা উচিত? ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। আমি নিজেও এ খাতের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি, আমাদের কোনো চেষ্টাই এখন পর্যন্ত কাউকে বাঁচাতে পারত না।
গত ১৬ মাস ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধি এ বিষয়গুলো নিয়ে কোনো দাবি তুলে ধরতে পারেনি। এ সময় মানবাধিকার সংস্থাগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষত স্থানীয় শিক্ষার্থীদের যারা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তাদের সুরক্ষার জন্যও তারা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ সবকিছুই নানাভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গাজায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের ওপরও আঘাত বেড়েছে। এমনটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। সার্বিক পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধবিরতি পেলেও মানসিকভাবে তাদের অবসন্নতা কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না। এমনটি দীর্ঘদিন তাদের মনে থিতু হয়ে থাকবে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে অবশেষে। তবু আমার প্রতিদিনের রুটিন আগের মতোই রয়েছে। কিন্তু আমি একটি নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি। আমার আসলে কোথায় কাজ করা উচিত? আমি কি আমার পরিবারের সদস্যদের মানসিক অবস্থা নিয়ে কাজ করব? নাকি আমার উচিত গাজার মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষ নিয়ে কাজ করা। এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের আচরণে মনে হয়েছে, শিশুদের নিয়ে তারা বাড়তি কিছুই ভাবছে না। কিন্তু আমার প্রিয়জনদের স্মৃতি প্রায়ই আমায় তাড়া করে। তাই আমি অন্যদের ভালোবাসার স্পর্শে সহযোগিতার কাজ থেকে পিছু হটতে পারি না। গাজায় ডা. আহমাদও তার রোগীদের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাকেও এখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। গাজায় আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য কাজ করার বিষয়টিও আমি এড়িয়ে যেতে পারব না। আমি সবকিছু মানবিক করার কাজ করব। অবশ্য মানবতার ছোঁয়া আমাদের থেকে কেড়েই নেওয়া হয়েছে। যারা হারিয়ে গেছেন, তাদের স্মৃতি আমি বুকে আঁকড়ে রাখব। সামনে আমার গল্পে তারা থাকবে। আমি জানি, গাজায় যে সুনামি বয়ে গেছে, তা যেন আবার না ফেরে তার জন্য প্রার্থনা করব। আমরা আবার সব স্বাভাবিক করে তুলতে চাই। বিগত ১৬ মাসে যারা নিহত হয়েছে তাদের জন্য আমার সমবেদনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি। এ ত্যাগীদের ভাবনাকেই আমরা অনুপ্রেরণা হিসেবে ধারণ করে এগোবো। ফিলিস্তিনিরা সহজে হাল ছাড়ে না। সামনেও তারা সহজে হাল ছাড়বে না। রক্তাক্ত এক প্রান্তরে তাদের অবস্থান। এখানেই আবার সব স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া হবে শুরু। এ যাত্রায় আমার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার। তা করব সৎভাবে। তবে আমরা আবার সংঘাত চাই না। আরও রক্ত আমরা চাই না।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন