× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

সংস্কারের সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়

ড. মো. শামসুল আলম

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৭:১২ পিএম

ড. মো. শামসুল আলম

ড. মো. শামসুল আলম

গত বছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে পুলিশ বাহিনী বিশেষ এক পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। এ সময়ে অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তা ছাড়া নানা ক্ষেত্রে সামাজিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটেও ক্রমশ নাজুক হয়ে উঠছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, এমন সংবাদও মিলেছে। নতুন নতুন অপরাধের নকশা করা হচ্ছে এবং বিশেষ অবস্থায় সৃষ্ট নিরাপত্তা ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধীরগতিতে চলছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কোনো সমালোচনা হলে, সে দায় তারা নিতে চাচ্ছে না। রাজধানীতে ছিনতাই-ডাকাতি বেড়েছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের টহল বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা যে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধী ছাড়া পেয়েছে, তাদের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছেÑ এমনটি বলছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল। কেউ অপরাধ করলে দ্রুত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কথাও বলা হচ্ছে। 

সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ভাটারা, বাড্ডা, শেরেবাংলানগর, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, হাতিরঝিল, শাহবাগ, মিরপুর, পল্লবী, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেশি ঘটছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, এখন অপরাধীদের হাতে দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসবের মধ্যে ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা ও পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্রও রয়েছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে তাদের ৫ হাজার ৭৩২টি অস্ত্র খোয়া গেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ২৮৩টি। অর্থাৎ এখনও পুলিশের ১ হাজার ৪৪৯টি অস্ত্রের খবর নেই। পাশাপাশি অপরাধীদের হাতে আগে থেকেই রয়েছে অবৈধ অস্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে যারা ভুক্তভোগী তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক প্রতিবাদ গড়ে তোলাই উত্তম। আর সেটিই হতে পারে যথাযথ সামাজিক জবাব। তবে পরিস্থিতি যাচাই করে গোটা অবস্থা রাজনৈতিক ময়দানের ওপর নির্ভর করছে কি না এ প্রশ্নও থেকে যায়।

দেশের রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে, এ কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। আমরা দেখছি, নির্বাচন ঘিরে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মূল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের অনুসারী ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-কুয়েটে সংঘর্ষের ঘটনা কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাড়ছে উত্তেজনাও। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দায়ী করে প্রকাশ্যে বক্তব্যও দিচ্ছে। হামলার জন্য একপক্ষকে দোষারোপ করছে অপরপক্ষ। বিপরীতে প্রধান রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছাত্রদের একাংশ বাধা দেওয়ার কারণেই এমন ঘটনার সূত্রপাত। এ সময়ে ক্যাম্পাসগুলোয় প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টারও অভিযোগ করা হয়। 

একদম শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থানে বজায় রাখলেও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নানা কারণে বিতর্কিত। প্রধান উপদেষ্টা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো একসঙ্গে থাকলে তিনি শক্তি পান। কিন্তু কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তাতে কান না দিয়ে বরং অভিযোগ করছে, সরকার বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলের দিকে হেলে পড়েছে। বিষয়টি যে অনেকাংশে অন্তর্বর্তী সরকারকে কিছুটা বিব্রত করে তুলছে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। বিএনপি যেখানে বলছে, কেবল নির্বাচনসংক্রান্ত ‘জরুরি’ সংস্কারগুলো করেই দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে; সেখানে জামায়াত নির্বাচনের আগে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জামায়াত এও বলছে, বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য নেতাদের বিচারও নির্বাচনের আগে শেষ করতে হবে। এসব দাবি স্পষ্টত বিএনপির দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ বলেই রাষ্ট্র সংস্কার যেমন সময়সাপেক্ষ বিষয়, তেমন হত্যাকাণ্ডের বিচারওÑ অন্তত প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে তা দীর্ঘ সময় দাবি করে।

ইতোমধ্যে ছাত্রদের নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবার রাজনৈতিক দল হলেও শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করবে নাকি লেখাপড়া করবে এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। ছাত্রনেতাদের মধ্যে নতুন দলের নেতৃত্ব নিয়ে ইতোমধ্যে যে অন্তর্বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে একটি ছাত্র সংগঠনের নামও জড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এ ধারণা এক ধরনের রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি করেছে। অর্থাৎ দেশের রাজনীতি এক ধরনের মেরুকরণের মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের মেরুকরণ সংকট হিসেবেই আবির্ভূত হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক জীবনব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সন্দেহ নেই, গণঅভ্যুত্থানের মুখ ছিল শিক্ষার্থীরা। তবে এর মূল শক্তি ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। ইতোমধ্যে সমাজমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে নানা জন এ নিয়ে লিখেছেন বা বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে পরিষ্কার উঠে এসেছে, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির কে কীভাবে ওই আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে। আন্দোলনে হতাহতদের মধ্যে তাদের নেতাকর্মীর সংখ্যাও সেটা প্রমাণ করে। আন্দোলন পরিচালনাকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও স্বীকার করেছেন, এটি ছিল মূলত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে তৈরি ছাতা সংগঠন, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ছিল। তাদের ভাষায়, অভ্যুত্থানের পর এর দলীয় সদস্যরা নিজ নিজ সংগঠনে ফেরত গেছেন। যারা রয়ে গেছেন তাদের নিয়েই এখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ও শাখা কমিটিগুলো গঠিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও এর সময়সীমা, এমনকি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

ফলে নানা ইস্যুতে আপাতনিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও অন্তর্বর্তী সরকার যেন তা ধরে রাখতে পারছে না। বিশেষত সর্বশেষ জাতীয় ঐক্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যটি নানা ভাবনা উস্কে দেয়। মাঠে বিশেষ করে নির্বাচনসহ বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত বিষয়ে যেভাবে বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ও অন্যান্য বামশক্তি ধারাবাহিক বক্তব্য ও কর্মসূচি দিয়ে চলেছে, তারও একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। অন্তত সরকারের ওপর নির্বাচন বিষয়ে চাপ তৈরিতে তা ভূমিকা রাখছে। গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধে এমনটা করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পরে একই ছাতার নিচ থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ বের হয়েছে। এখান থেকেই নিজেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে আলাদা নামে হাজির থাকছে। এ ধরনের বিভাজন যদি কৌশলগতও হয়ে থাকে তবু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলে ছাত্রদের নতুন দলও তা করতে পারবে না। আবার নতুন সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হলে তারা কীভাবে তা পরিচালনা করবে এ নিয়েও জনমনে কিছু ভাবনা ও দ্বিধা রয়েছে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা একটি দল গড়ছে তাই অন্য সংগঠনের অঙ্গসংগঠনগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এবার মূলধারার রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি একত্র করে যেন ছাত্রদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছে। এজন্যই কুয়েট বা অন্য ক্যাম্পাসে আমরা এ ধরনের সংঘাত দেখেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে এর মূলে রয়েছে একদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ঘিরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা। আগামী নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক যে বিতর্ক, সেখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি. জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দ্বিতীয়টি. জাতীয় নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দল গঠনের আগেই নতুন রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে অবস্থান করা এবং ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আলাপ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাতুর্যে পরিণত হলে তা হবে হতাশার। কারণ, আমাদের সংস্কারের ভালো সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগটি হাতছাড়া করা যাবে না।

  • রাজনীতি-বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা