× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ

দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

ড. দিলারা জাহিদ

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:৪০ পিএম

ড. দিলারা জাহিদ

ড. দিলারা জাহিদ

যতই দিন যাচ্ছে, দেশের নগরীতে বায়ুদূষণ বাড়ছেই। গত বছর নভেম্বরে দেশের বায়ুর মান গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে অনিষ্টকর পদার্থের সমাবেশ যখন মানুষ ও তার পরিবেশের ক্ষতি করে, সেই অবস্থাকে বায়ুদূষণ বলে।’ প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বায়ু বা বাতাস। অন্যান্য যেকোনো দূষণের চেয়ে বায়ুদূষণের পরিধি এবং ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি। কারণ বাতাস স্বল্প সময়ে দূষিত পদার্থকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিতে পারে। বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ঝুঁকিগুলোর একটি। পুরো বিশ্বে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষণযুক্ত বায়ুতে শ্বাস নেয়। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ।

বৈশ্বিক উন্নয়ন, ক্রমাগত শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি পরিবেশদূষণ বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ওজোন স্তর হ্রাস, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের কারণে সৃষ্ট দূষণ আর তীব্র দাবদাহের কারণে মানুষের মধ্যে কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বায়ুদূষণে অ্যাজমা, নিউমোনিয়ার মতো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তা ছাড়া মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা, গর্ভপাত, জন্মত্রুটি, শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশেও বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বায়ুদূষণ। ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসে প্রদাহ, নিউমোনিয়াসহ ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এ ছাড়া কার্ডিওভাস্কুলার স্বাস্থ্যের সমস্যা, ক্যানসার এবং অকালমৃত্যু বেড়েছে। গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই হাসপাতালের শয্যা, মেঝে ছাড়িয়ে বারান্দায়ও রোগীকে জায়গা দিতে হচ্ছে।

বিপজ্জনক ও বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে ঘটে পরিবেশদূষণ। এ ধরনের দূষণ বেশিরভাগ শিল্প কার্যক্রম, কৃষি রাসায়নিক ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য নিষ্পত্তির কারণে হয়। দূষণের পেছনে দায়ী রাসায়নিক হলোÑ পেট্রোলিয়াম হাইড্রোকার্বন, দ্রাবক, কীটনাশক, সিসা, পারদ ও অন্যান্য ভারী ধাতু। এসব রাসায়নিক মানবস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে মাথাব্যথা, চোখের জ্বালা ও ত্বকে ফুসকুড়ি থেকে শুরু করে আরও অনেক গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মাটিতে উচ্চমাত্রার সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে পারদের সংস্পর্শে অঙ্গের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এমনকি কিডনি ও লিভারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ে একাধিক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে কমছে দেশের মানুষের গড় আয়ু। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণের কারণে দরিদ্র নারী ও শিশুরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কারণ, তারা বেশিরভাগই দূষিত এলাকায় বসবাস করে। ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ও স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বাদের শারীরিক ক্ষতির অন্যতম কারণ হলো বায়ুদূষণ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, দূষিত এলাকায় বসবাসের ফলে অন্তঃসত্ত্বাদের গর্ভপাত ও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের কারণে বছরে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যেসব অসংক্রামক রোগে মানুষের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে তার অধিকাংশই বায়ুদূষণজনিত। একই সঙ্গে ফুসফুসের নানা জটিলতা যেমন— ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমাসহ নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে বায়ুদূষণে পুরুষের শুক্রাণু তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটছে। এমনকি শুক্রাণুর মানও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নারীদের ডিম্বাণু কল্পনাতীতভাবে কমে গেছে। আবার যেসব ডিম্বাণু আছে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্যানসার ও হৃদরোগের জন্যও দায়ী বায়ুদূষণ। দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকলে বা এ রকম পরিবেশে কাজ করলে ফুসফুসের ক্যানসার ও হৃদরোগ হতে পারে। এমনকি সেটি মস্তিষ্ক, লিভার বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু মারাত্মকই নয়, সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। পরিবেশগত কারণে ও গৃহস্থালি সংক্রান্ত কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাব প্রতি বছর ৬৭ মিলিয়ন অকালমৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। বায়ুদূষণ মানব শরীরের সব প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমনÑ মস্তিষ্ক, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, কিডনি ইত্যাদিকে আক্রান্ত করে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে; যা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। বায়ুদূষণ অসংক্রামক রোগগুলোর অন্যতম কারণ। শ্বাসনালি সংক্রমণের অন্যতম কারণ গৃহস্থালি সংক্রান্ত বায়ুদূষণ; যা পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যু প্রায় ৪৪ শতাংশ। প্রসবপূর্ব বায়ুদূষণের কারণে প্রায়ই নবজাতকের নানা রোগ দেখা দেয়, যার মধ্যে অকাল জন্ম, কম জন্মের ওজন এবং বিকাশগ্রস্ত ফুসফুসের ত্রুটি উল্লেখযোগ্য। বায়ুদূষণ ফুসফুসের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের অ্যালার্জিজনিত শ্বাসযন্ত্রের রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ ফুসফুস ক্যানসারের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ থেকে আসা কার্সিনোজেন।

বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে গত কয়েক দশকে বায়ুদূষণ মৃত্যুর জন্য একটি অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুদূষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, এটা চীনের মতো দেশগুলোতে যেখানে দ্রুত নগরায়ণ ও গ্রামীণ থেকে শহুরে অভিবাসন ব্যাপক হারে হয়েছে, সেখানে মনোরোগ দ্রুত বৃদ্ধি দ্বারা বোঝা যায়। সূক্ষ্ম কণা যা বায়ুদূষণ ঘটায় কিছু স্বাভাবিক মানসিক সমস্যা যেমনÑ হতাশা, উদ্বেগ এবং কর্মহীনতার সঙ্গে জড়িত। তবে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব এখনও খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না বা এ ব্যাপারে আরও অধিকতর গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেসব মানসিক রোগ বায়ুদূষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তার মধ্যে রয়েছে ডিমেনশিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, ডিপ্রেশন/বিষণ্নতা ইত্যাদি। বাতাসে বেনজিন ও কার্বন মনো অক্সাইডের উপস্থিতি সিজোফ্রেনিয়া রোগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কোরিয়ান একটি গবেষণাপত্রে বাতাসে নাইট্রিক অক্সাইডের অত্যাধিক মাত্রায় উপস্থিতি ডিপ্রেশনে/বিষণ্নতায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখা গেছে। সাউথ কোরিয়ার এক গবেষণায় আত্মহত্যার প্রবণতার সঙ্গে বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও ওজোনের মাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছেÑ রাজধানী ও বন্দরনগরীর বায়ুদূষণের মূল কারণ কী? এক্ষেত্রে একাধিক কারণ রয়েছে। রাজধানীতে চলাচল করা ১৬ লাখ গাড়ির এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ পাঁচ লাখের বেশি গাড়ি দূষণের জন্য দায়ী। জীর্ণশীর্ণ গাড়িগুলো চলতে দেওয়ায় দূষণ বাড়ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারায় দূষণ নির্মূল হচ্ছে না। মাতুয়াইল, আমিন বাজার ময়লার ভাগাড়সহ ঢাকার অন্তত ১০০ স্থানে বর্জ্য পোড়ানো হয়। ঢাকার আশপাশ ইটভাটায় সয়লাব। শহর থেকে গাছ হারিয়ে গেছে। নদ-নদী, খাল ও জলাধার ভরাট হয়েছে। এসব কারণে দেশের বায়ুমান খুব নিম্নমানের। অন্যদিকে যোগ হয়েছে দাবদাহ। এসব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নয়তো জনস্বাস্থ্যে আরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে বাসযোগ্য নগরীর সব সূচকে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব না হলে টেকসই উন্নয়ন ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বৃক্ষ নিধন, জ্বালানি তেলের মান বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও কালো ধোঁয়া, যত্রতত্র বর্জ্যের ছড়াছড়ি। ঢাকার চারপাশের ইটভাটা, জলাধার, খাল ভরাট— এসব এখনই রোধ করতে হবে। এসব খাতে মনোযোগ নেই বলেই বায়ুর মান দূষণের শীর্ষে। রোগাক্রান্ত হচ্ছে জাতি।

পরিবেশের সুরক্ষায় সরকারের কিছু দায় রয়েছে অবশ্যই। কিন্তু সবকিছু সরকার বা রাষ্ট্রের আশায় থাকলে ঢাকা বাসযোগ্য নগরী হয়ে উঠবে না। নিজেদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। পাড়ামহল্লার ফাঁকা জায়গায় পর্যাপ্ত গাছ লাগাতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ধোঁয়ার বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ হলো বায়ুমণ্ডলে নির্গমনের আগেই বায়ুদূষক উৎসের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা। এক্ষেত্রে যানবাহন থেকে নির্গত বায়ুদূষক যেমন কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড প্রধান। সিএনজিচালিত যানে এ দূষণ কম হয়। কল-কারখানার ধোঁয়া নির্গমন নল ও চিমনি থেকে বস্তুকণা পৃথক করার জন্য ছাকনি বা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিমাণ হ্রাস করে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ইত্যাদির ব্যবহার বৃদ্ধি করা যায়। পরিত্যক্ত বর্জ্য না পুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা যায়। কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প উপায়ে শস্যের রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হাটবাজার, বসতবাড়ি থেকে পচনশীল দ্রব্য দ্রুত অপসারণ করতে হবে। ডাস্টবিনের ময়লা দ্রুত শোধনাগারে পাঠাতে হবে। নগরে বসতি, শিল্প-কারখানা পরিকল্পিতভাবে স্থাপন করতে হবে। উদ্ভিদ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। উদ্ভিদ অক্সিজেন ত্যাগ করে ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে ভারসাম্য বজায় রাখে। এসব পদক্ষেপে প্রকৃতি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।

  • পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা