আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
মোহীত উল আলম, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫০ পিএম
মোহীত উল আলম
এ লেখাটি লিখতে বসেছি একটি ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ দেখার পর। ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই’-এর অমর গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মৃতদেহ শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও, সঙ্গে বাজছিল অবশ্যম্ভাবী ওই গানটির রেকর্ডিং। এ গানটির লিরিক এবং সুর; আমার মতে, একুশের দীপ্ত চেতনা সবচেয়ে বেশি ধরে রেখেছে। এর আগের একটি ভিডিওতে দেখেছিলাম তিনি হাসপাতালের মৃত্যুশয্যায় শুয়েও ওই গানটি সম্পূর্ণ আবেগ দিয়ে, শরীরের অঙ্গভঙ্গি করে গাইছেন। কেউ একজন তার রোগাক্রান্ত শরীরের কথা মনে করিয়ে সতর্ক করে দিলে, তিনি তুবড়ি মেরে বললেন, তার কিচ্ছু হবে না। আমরা জানতাম, তিনিও জানতেন, তার সময় বেশি বাকি নেই এবং তিনি চলে গেলেন, গানটি রয়ে গেল। যে রকম বরকত, জব্বার, সালাম, রফিক চলে গেলেন কিন্তু অমর একুশে রয়ে গেল। প্রতুলের গানটির মতো একুশের মরমি গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ যেমন কথা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর, তেমন সুর শহীদ আলতাফ মাহমুদের। এ সুরটা যখনই শুনি কি যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে, কি বাঁশির সুরে মন মধুর বিষাদে ভরে যায়।
উল্লিখিত দুটি গানের আকর এক করলে বোঝা যায় একুশে ফেব্রুয়ারি হলো বাংলাদেশের আঁতুড়ঘর। এখান থেকে জন্ম নিয়ে বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বসমাদৃত। সম্প্রতি আমার এক মার্কিন প্রফেসর বন্ধু, যিনি ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক, বাংলা ভাষায় শেকস্পিয়র অনূদিত হয় জেনে লিখেছেন, যে বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ভাষাগুলোর একটি এবং সে ভাষায় যে শেকস্পিয়র অনূদিত হচ্ছে এটা তার খ্যাতির জন্য বিরাট গৌরবের।
কিন্তু এ গৌরবময় আখ্যানের পরও বাস্তবতার নিরিখে আমি দেখছি ভাষা আন্দোলনের নিহিত গুরুত্ব আমরা এখনও ঠিক অনুধাবন করতে পারিনি। পৃথিবী এখন প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের সিঁড়ির একেবারে প্রায় উচ্চ ধাপে আছে। সেজন্য সম্ভব হয়েছে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ২২ ফেব্রুয়ারি ’৫২ সালের সংখ্যাটার স্ক্যান্ড কপি মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পাওয়া। প্রথম পৃষ্ঠার আট কলামের মধ্যে একেবারে শীর্ষে ছয় কলামব্যাপী শিরোনামে বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছে, ‘ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলীবর্ষণ’। এ শিরোনামের গুরুত্ব হলো ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। অর্থাৎ, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন্য এখন আমরা যে দাবি তুলি এবং সেটি হয়নি বলে যে মনোবেদনায় ভুগি, এটি প্রকৃত অর্থে ভাষা আন্দোলনের মূল প্রেরণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরও স্বচ্ছভাবে দেখলে বলতে হয়, ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার আন্দোলন ছিল না, এটা ছিল একটি প্রচ্ছন্ন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন।
তার পরও ২১ ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের বেদনা বাড়ে। বেদনা, সব জায়গায় বাংলা ভাষা ব্যবহার না হওয়ার অর্থে। পাকিস্তান আমলে আমরা পরাধীন ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম স্বাধীন হতে। সে সময় ভাষার প্রশ্নটা বলা যায় আমাদের হাতে প্রকারান্তরে স্বাধীনতার মশাল ধরিয়ে দেয়। আসলে পেছনে ফিরে দেখলে বুঝতে পারি, ভাষার প্রশ্নটা ছিল হিমবাহের দৃশ্যমান ওপরের অংশটার মতো। কিন্তু এর তলায় লুকিয়ে ছিল গুরুতর অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ক্রমে আরেকটা কথা পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল। যে মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্য লড়াই করতে করতে একটি দেশ স্বাধীন হল, দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর দেখা গেল ভাষার প্রশ্নটির চরিত্রই বদলে গেছে। যে ভাষার প্রশ্নটি বাংলাদেশ হওয়ার আগে ছিল আন্দোলনের মূল অস্ত্র, বাংলাদেশ হওয়ার পর দেখা গেল সে ভাষার জায়গাটা ঠিক কীভাবে নির্ধারিত হবে সে প্রশ্নটি দিন গেলে জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে, কিন্তু সমাধান আসেনি।
ব্যাপারটা এমন যে আমরা এ কথন সৃষ্টি করেছি যে অমর একুশের একমাত্র দাবি হলো বাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, কিন্তু আমরা একটি আহত বোধ নিয়ে দেখছি যে এটা এখন একটা আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে। সবাই বলছে এবং লিখছে এ কথাটা, কিন্তু বাস্তব জীবনে এ কথাটার কোনো প্রতিফলন বা অনুসরণ নেই। তাই কঠিন প্রশ্নটার মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে। প্রকৃত অর্থে সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা সম্ভব কি না, সে প্রশ্নটাও যেন একটি উত্তর খুঁজছে।
সাধারণভাবে বলতে গেলে বাংলা ভাষার কোনো বিকল্প নেই আমাদের জাতীয় জীবনে এবং সমাজ জীবনে। যেহেতু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং জাফলং থেকে বেনাপোল পর্যন্ত সবাই বাংলা ভাষাভাষী, সেজন্য বাংলার কোনো বিকল্প নেই। সংখ্যালঘু জাতিসত্তা বলে আমরা যাদের চিহ্নিত করেছি সেই চাকমা, মারমা, গারো, খাসি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষ করেছি নিজেদের লিখিত ও মৌখিক ভাষা থাকলেও বাংলাই তাদের শিক্ষার ভাষা। তাই বলতে পারি যে বাংলা ভাষা বাংলাদেশের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ভারতে যেমন ইংরেজি লিঙ্ক ভাষা বা সংযোগকারী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং ইংরেজি না হলে সেখানে দুটি দূরবর্তী অঞ্চলের লোকের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হতে পারে না, সে অর্থে বাংলাদেশে একক একটি ভাষার সর্বত্র অস্তিত্ব থাকার কারণে সংযোগকারী ভাষার দরকার হয় না। আবার আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, যতই আমাদের ব্যুৎপত্তি থাক না কেন, আমরা আরবি, উর্দু, হিন্দি বা ইংরেজিতে এতটা সড়গড় কখনও হতে পারব না যে বাংলা ছাড়া আমাদের চলবে।
বস্তুত বাংলা ভাষার বিচরণক্ষেত্র বাংলাদেশের জমিতে ব্যাপক, পশ্চিমবঙ্গে এবং ত্রিপুরাতেও অবাধ এবং দেশের বাইরে বাঙালি-অধ্যুষিত পশ্চিমা শহরগুলোতে, মধ্যপ্রাচ্যের বাঙালি শ্রমিক, কিংবা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার একেবারে শতভাগ নিশ্চিত।
তাই বলতে হয়, সমস্যাটা সম্ভবত ব্যবহারের দিক থেকে নয়, সমস্যাটা হচ্ছে মর্যাদার দিক থেকে। যদিও সরকারিভাবে আদেশ আছে সব দলিল-দস্তাবেজ, চিঠিপত্র বাংলায় লিখতে হবে, কার্যত বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি প্রভাবশালী সব প্রতিষ্ঠানে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি কিংবা ইংরেজির সঙ্গে বাংলা মিলিয়ে কার্য সম্পাদন করা হয়। লিখিত তো বটেই, কিয়দংশ মৌখিকও। যা হোক, রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজনের সীমানা ও প্রয়োগের ব্যাপ্তি এবং মাতৃভাষার প্রয়োজনের সীমানা ও প্রয়োগের ব্যাপ্তির মধ্যে ব্যাখ্যাতীত পার্থক্য আছে। মাতৃভাষা বিস্তারে বড়, ব্যবহারে সর্বজনীন, কিন্তু ক্ষমতা ও প্রভাবে রাষ্ট্রভাষার চেয়ে খাটো।
যেমন উচ্চশিক্ষার মাধ্যম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে বাংলা নয়, ইংরেজি। স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই শিক্ষা প্রদানের সিদ্ধান্ত থাকলেও বিভিন্ন অনুষদ ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম পুরোপুরিই ইংরেজি। সরকারের দাপ্তরিক নির্দেশে সরকারের সকল পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়, কিন্তু লক্ষ করেছি পলিসি-ম্যাটারগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ইংরেজিতেই রচিত হয়ে থাকে। নিম্ন-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার চালু থাকলেও উচ্চ-আদালতে ইংরেজির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এবং উচ্চ আদালতের রায় লেখা হয় ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত নিয়ম অনুসারে। এ ছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলোর সব যোগাযোগ হয় ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে।
আসলে বাংলাদেশের ব্যাপক ভৌত ও প্রযুক্তিগত উন্নতিই মনে হয় বাংলা ভাষার সর্বত্র ব্যবহারের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে। ব্যাপারটা খাপছাড়া মনে হলেও সত্য। কেননা আমাদের শিল্প, শিক্ষা ও বাণিজ্যের প্রসারের কারণে বিশ্বমেলায় যতই আমাদের সড়গড় উপস্থিতি বাড়বে, ততই বাংলা ভাষার সর্বত্র ব্যবহারের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা কমে আসতে বাধ্য। বিশ্বের এখন সবচেয়ে আদৃত ভাষা ইংরেজি, কিংবা এর পরপর ফরাসি কিংবা স্প্যানিশ কিংবা জার্মান, কিন্তু বাংলা ভাষার চেয়ে অনেক দাপুটে ভাষা হিন্দি বা আরবি পর্যন্ত বিশ্ব আঙ্গিকে জায়গা করে নিতে পারছে না। তাহলে, দেশ তো আর ভাষার জন্য বসে থাকবে না। সে একটা আপসমূলক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে এগিয়ে যায় : তার প্রসারণের জন্য ইংরেজি ভাষার দরকার হলে সে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করবে, কিংবা চীনের সঙ্গে ব্যবসায়ী-কারবার বেড়ে গেলে হয়তো সে চীনা ভাষা ব্যবহার করবে। অর্থাৎ, ভাষার ক্ষেত্রে আমরা যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি এগিয়ে এলে একটি জবরদস্তিমূলক মনোভাব তৈরি করি যে, সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন করতে হবে, সেটি আসলে বাস্তবে টিকবে না।
আসলে যে ভুলটি আমরা করি, সেটি হলো পোশাকি একটি চর্চাকে প্রাধান্য দিতে থাকি, বাস্তবে যার সমর্থনযোগ্য ভিত্তিভূমি নেই। বাস্তবে যেটা আছে সেটা হলো রাষ্ট্র ও সমাজের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অগ্রসরমানতায় ভাষার প্রাধান্য এবং ব্যবহার হচ্ছে আরও অনেক উপাদানের মধ্যে একটি। সেজন্য ভাষা একটি মৌল উপাদান নয়, এটি অন্যতম একটি উপাদান। কিন্তু রাজনীতি (সব ধরনের রাজনৈতিক শাসন) এবং অর্থনীতি হলো মৌল উপাদান। এবং ধর্মও সে কারণে মৌল কোনো উপাদান নয়। ভাষার নাব্যের কথা যদি আমরা স্বীকার করি, তাহলে দেখব যে ভাষার মতো ক্ষণস্থানিক প্রয়োজনীয়তা মেটানোর ক্ষমতা আর কোনো উপাদানের মধ্যে নেই। কিন্তু ভাষাকে স্থায়ী ও অব্যয়িত বা অত্যাবশ্যকীয় ধরে নিলে সমস্যা হয়। ভাষা যোগাযোগের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম, কিন্তু এটা অব্যয়ী উপাদান নয়। এটা ব্যয়িত এবং বিকল্প-সম্ভব এবং বিকল্প-গ্রহণেচ্ছু একটি মাধ্যম। ভাষা যে কোনো অব্যয়িত বা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান নয়, তা বোঝা যায় ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে। ভারতে বহু মাতৃভাষা, কিন্তু দেশ একটা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিন্দি এবং সম্ভবত ইংরেজি, যে দুটির কোনোটিই পুরো ভারতের মাতৃভাষা নয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর সাধারণভাবে মাতৃভাষা একটিÑ আরবি, কিন্তু দেশ হচ্ছে অনেক।
যে অর্থে রাষ্ট্র একটি অত্যাবশ্যকীয় অস্তিত্ব, সে অর্থে ভাষা নয়। রাষ্ট্র এবং ভাষাকে তুল্যমূল্য করা যাবে না। তাই পাকিস্তানের সময় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ অত্যাবশ্যকীয় স্লোগান ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন করার নিমিত্ত, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন যথোপযুক্ত দাবি বলে আমার মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে ভাষার সৃজনশীল নাব্যের কথা স্মরণ রেখে এ দাবিটির নিরিখে একটি আপসমূলক ব্যবহাররীতি চালু রাখাই আমার মনে হয় বাস্তবসম্মত।