আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:০৯ পিএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৪৯ পিএম
মযহারুল ইসলাম বাবলা
ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতবর্ষ কখনও এককেন্দ্রিক শাসনাধীন কিংবা একক রাষ্ট্র ছিল না। ছিল না একটি দেশ এবং এক জাতির অস্তিত্বও। অতীত শাসকরা কেন্দ্রীভূত শাসনের অধীনে ভারতবর্ষকে একীভূত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধজয়ের পর একে একে দখলে নেয় গোটা ভারতবর্ষ। যুদ্ধবিগ্রহ, শঠতা-কৌশলতা, স্থানীয়দের বিশ্বাসভঙ্গের সুযোগে ভারতবর্ষকে এক রাষ্ট্রাধীনে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনাধীনের বাইরে করদরাজ্য ছিল কয়েকশ। সেসব করদরাজ্য স্থানীয় শাসকদের শাসনাধীনে ছিল। এক রাষ্ট্রাধীন ভারতে অজস্র রাজ্যের ভাষা-সংস্কৃতিগত পার্থক্য ছিল বহুবিভাজিত। প্রতিটি জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতি ছিল পৃথক এবং স্বতন্ত্র। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল ছিল না।
ভারতের মানুষের মাতৃভাষা এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪১৫টি। এ ৪১৫টি ভাষার উপভাষার সংখ্যা ১ হাজার ৫৭৬টি (১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে)। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ভারতে ২৯টি কথ্য ভাষায় ১০ লাখ মানুষ কথা বলে। ১২২টি কথ্য ভাষা ১০ হাজার মানুষের মুখের ভাষা। এছাড়া অজস্র উপভাষা রয়েছে, যেগুলোর লিপি নেই। সেসব ভাষার অস্তিত্ব টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে। বর্তমান ভারতের রাজ্যগুলোর ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। একই রাজ্যে একাধিক ভাষাও যেমন রয়েছে, তেমনি একই ভাষা অন্য রাজ্যেও প্রচলিত। ভারতের প্রাদেশিক সরকার স্বীকৃত ভাষা অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মিরি, কোঙ্কনী, মৈথিলী, মালয়ালম, মৈত্রৈ (মণিপুরী), মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতাল, তামিল, তেলুগু, উর্দু, মিজো, ককবরক। ইংরেজি ভাষাও অনেক প্রদেশের সরকারি ভাষার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, যেমন অরুণাচল, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, চণ্ডীগড়। ভারতের প্রাদেশিক ভাষাসমূহের তালিকাই প্রমাণ করে অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার মতো হিন্দিও প্রাদেশিক ভাষা।
প্রশ্ন থাকে, বহু ভাষাভাষীর দেশ ভারতে প্রাদেশিক হিন্দি ভাষা কেন সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে! এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পেছনে ফিরে যেতে হবে। ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণি এক রাষ্ট্রের সুবিধায় ভারতে বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার-প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। ব্রিটিশদের মুৎসুদ্দিরূপে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুযোগও পেয়েছিল। তাদের মনস্কামনা পূরণে অন্তরায় ছিল ভাষার বিভক্তি। ব্রিটিশ ভারতেই ভারতীয় বুর্জোয়ারা স্বীয় স্বার্থে এককেন্দ্রিক শাসনের পাশাপাশি এক ভাষা ও এক জাতির আওয়াজ তুলেছিল। জাতি হিসেবে ভারতীয় এবং ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিল তারা হিন্দি ভাষা-দেবনাগরী লিপি। নিজেদের কায়েমি স্বার্থে হিন্দি ভাষা ভারতের সমগ্র জাতিসত্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল; অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতি, স্বাজাত্যবোধ বিলীন করে দেওয়ার মতলবে। ব্রিটিশ ভারতে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সুবিধাভোগ সম্ভব হলেও, তাদের পক্ষে হিন্দি ভাষা সর্বভারতীয় ভাষায় পরিণত করা সম্ভব হয়নি।
১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দেখতে পান ভারতীয় মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা গোরক্ষা এবং হিন্দি ভাষা প্রচলনে নানাবিধ পন্থায় মদদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। তিনিও গোরক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি হিন্দি ভাষা সমগ্র জাতিসত্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বুর্জোয়া শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ তৎপরতার মধ্য দিয়েই ভারতে গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। গান্ধীর সভাপতিত্বে ১৯১৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে ‘সর্বভারতীয় এক ভাষা ও এক লিপি সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে হিন্দি ভাষা প্রচারে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে উপকমিটির সভাপতি হয়েছিলেন গান্ধী। সিন্ধু ন্যাশনাল কলেজে ১৯২০ সালের জুলাইতে গান্ধী বলেছিলেন, ‘হিন্দিই হবে সমগ্র ভারতের ভাষা এবং সেজন্য হিন্দি শেখা অন্য সব প্রদেশের কর্তব্য।’
১৯২১ সালে এক চিঠিতে গান্ধী মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে ফিরে আসার পর থেকেই আমি আপনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হচ্ছি। আমার কাজে আপনারা প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং আমাকে প্রচুর সাহায্য করেছেন। হিন্দি প্রচারের আন্দোলন আপনারা কার্যকরভাবে সমর্থন দিয়েছেন।’ গান্ধীর হিন্দি ভাষা প্রচারাভিযানে মাড়োয়ারিদের পাশাপাশি গুজরাটি, পার্সি বণিকশ্রেণিও আর্থিক সহায়তা প্রদানে পিছিয়ে ছিল না। বাংলা ও আসাম প্রদেশে হিন্দি প্রচারাভিযানে ১৯২৮ সালে হিন্দুত্ববাদী বুর্জোয়া ধনশ্যামদাস বিড়লাকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে কলকাতায় হিন্দি প্রচারের সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালে হিন্দি ভাষা জাতীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজেন্দ্র প্রসাদকে সভাপতি করে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে ‘রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি’ গঠিত হয়। পরে স্বয়ং রাজেন্দ্র প্রসাদ লিখেছিলেন, ‘এর নীতি স্বয়ং গান্ধীজি নির্ধারণ করেছিলেন এবং আমাদের শিল্পপতি বন্ধুরা অর্থের জোগান দিতেন।’
হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপি সমগ্র ভারতীয়র ওপর চাপানোর এ উদ্যোগে উত্তর প্রদেশের মুসলিম সম্প্রদায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। উর্দুভাষী মুসলমানের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চারে তারা উপলব্ধি করে হিন্দির দৌরাত্ম্যে তাদের উর্দু ভাষা-সংস্কৃতির বিলোপ ঘটবে। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে লক্ষ্ণৌতে মুসলিম লীগ অধিবেশনে সমস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানান।
১৯২৭ সালের জুলাইতে গান্ধী লিখেছিলেন, ‘সব ভারতীয় ভাষার একটি লিপি হওয়া উচিত এবং কেবল দেবনাগরীই হতে পারে সে লিপি।’ ধর্মের ভিত্তিতে ভাষার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন গান্ধী। পাঞ্জাবি হিন্দুরা দেবনাগরী লিপি গ্রহণ করবে এবং মুসলিমরা ফারসি লিপি। একইভাবে বাঙালি হিন্দুর লিপি হবে দেবনাগরী এবং বাঙালি মুসলমানের লিপি হবে বাংলা অথবা ফারসি। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভক্তি ব্রিটিশরা করেছিল তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং দখলদারি স্থায়ী করার লক্ষ্যে। গান্ধীও হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপির পক্ষে সম্প্রদায়গত বিভাজনের নীতি অনুসরণ করে সে বিভাজনই সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক বিভাজন-বিভক্তি ব্রিটিশের সৃষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভাজন নতুন মাত্রা পেয়েছিল হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপির জাতীয় ভাষা ও লিপির আন্দোলন অভিযানে। এতে দ্রুতই মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মুসলমানের বিরোধিতার মুখে গান্ধী-নেহরুরা মত পরিবর্তন করলেও উর্দুভাষী মুসলিম সম্প্রদায় হিন্দি-উর্দু ভাষা বিতর্কে সরব হয়ে ওঠে এবং ভাষা নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিরোধেরও সূচনা ঘটে। ১৯৩৭ সালের জুলাইতে কংগ্রেস সভাপতি নেহরু বলেন, ‘অবশ্যই হিন্দি অথবা হিন্দুস্থানি হচ্ছে জাতীয় ভাষা এবং হওয়া উচিতও। লিপি সম্পর্কে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা দরকার যে, হিন্দি ও উর্দু দুই লিপিই সহাবস্থান করা উচিত।... এ বিতর্ক বন্ধ করার জন্য ভালো হবে যদি আমরা কথ্য ভাষাকে হিন্দুস্থানি এবং লিপিকে হিন্দি অথবা উর্দু আখ্যা দিই। ইউরোপের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর হিন্দিতে অনুবাদ হওয়া একান্ত দরকার।’ নেহরুর বক্তব্যটির সারকথা হচ্ছে লিখিত ভাষা হিন্দিই হবে ভারতের জাতীয় ভাষা। সেটা দেবনাগরী কিংবা উর্দু দুই লিপিতেই লিখিত হতে পারে। ‘ভাষাপ্রশ্ন’ গ্রন্থে নেহরু লিখেছিলেন, ‘একমাত্র হিন্দুস্থানিই সমগ্র ভারতের ভাষা হতে পারে।’ লিপির ক্ষেত্রে দেবনাগরী এবং উর্দু লিপির কথাও মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভ প্রশমনে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।
উত্তর ভারতে কথ্যভাষারূপে হিন্দুস্থানি ছিল বটে, তবে সেটি হিন্দি ও উর্দুর সংমিশ্রণে। লিপি না থাকায় লিখিত ভাষারূপে হিন্দুস্থানি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনের আগে ভারতের সংবিধান সভায় গান্ধী প্রস্তাব করেছিলেন, তারাই সংবিধান সভার সদস্য হতে পারবেন যারা হিন্দি ভাষার সঙ্গে পরিচিত। গান্ধী আরও দাবি করেন, ভারতের সংবিধান হিন্দুস্থানি ভাষায় লিখিত হতে হবে।
১৯৪৭ সালে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার আগে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে কোনো ধারা রাখা হয়নি, হিন্দি ভাষা উত্থাপনে বিতর্ক-বিভক্তির আশঙ্কায়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান বি আর আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস হিন্দি ভাষার ধারা নিয়ে যতটা বিতর্ক করেছে, অন্য কোনো ধারা নিয়ে অতটা বিতর্ক করেনি।’ সংবিধান সভার কংগ্রেসের সদস্যদের মনোনীত করেছিলেন জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল। জাতীয় ভাষা নির্ধারণের ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৮ এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৮ ভোট পড়ে। সমাধানের লক্ষ্যে পুনরায় ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৮টি এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৭টি। মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে হিন্দি ভাষা জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সভায় হিন্দি-অহিন্দি কংগ্রেস সদস্যরা নির্বিচার হিন্দির পক্ষেই ভোট প্রদান করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতির সচিব সি এস ভেঙ্কটাচার লিখেছেন, ‘হিন্দি ভাষার প্রশ্নে চরমপন্থার অশুভ তাৎপর্য মুসলিম সম্প্রদায়কে যথার্থই আতঙ্কিত করেছিল। মুসলমানরা উপলব্ধি করেছিল তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন। এ বিশ্বাস দ্রুত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনের ওপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপেই পাকিস্তান সৃষ্টিতে এটি অন্যতম মুখ্য কারণ হয়েছিল।’
সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে হিন্দি ভাষা বহু ভাষাভাষী ভারতীয় জনগণের ওপর নির্লজ্জ শঠতায় চাপানো হয়েছিল। ভারতের বুর্জোয়াশ্রেণি এবং শাসকশ্রেণি একাকার হয়েছিল এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ও হিন্দি ভাষা প্রতিষ্ঠায়।
ভাষার দ্বন্দ্বে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বিভক্তি সাম্প্রদায়িক বিভক্তিরই আরেক অনুষঙ্গ। অপরিণামদর্শী দেশভাগ, রক্তাক্ত দাঙ্গা, উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনের ট্র্যাজেডি আজও উপমহাদেশের সর্বাধিক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ভারত-পাকিস্তান দুই দেশে হিন্দি-উর্দু জাতীয় ভাষা হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রাধীন পূর্ব বাংলায় উর্দু ভাষা চাপানো সম্ভব হয়নি। ত্যাগ-আত্মত্যাগে মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ বৃহৎ ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা কোণঠাসা করে হিন্দির একক দৌরাত্ম্যের অধীন করা হয়েছে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী উন্মেষ নিষ্ঠুর হাতে দমনপীড়নে স্তব্ধ করা হয়েছে, বারবার। জাতিসত্তার আন্দোলন আখ্যা দেওয়া হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী অভিধায়। স্বীকার করতে হবে, দক্ষিণ ভারত ছাড়া সমগ্র ভারত হিন্দির আগ্রাসনের কবলে। এমনকি আমাদের দেশেও হিন্দি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজ নিজ ভাষা-সংস্কৃতি এতে চরম সংকটের কবলে। বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক মোরেস বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের ঐক্য যদি কৃত্রিম ছিল তো ভারতবর্ষের দেশভাগও তাই। ভারতবর্ষকে যদি বিভক্তই হতে হয়, তবে জনতত্ত্বগত এবং সাংস্কৃতিক সংহতি ও ভাষার ভিত্তিতে যুক্তিসম্মতভাবে ভাগ হওয়া উচিত ছিল।’ আয়তনে অখণ্ডিত ভারতবর্ষ ইউরোপের সমতুল্য। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো ল্যাটিন ভাষা পরিত্যাগ করে নিজ ভাষা ও জাতীয়তার ভিত্তিতে পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুরো ইউরোপে ইংরেজিভাষী রাষ্ট্র মাত্র ইংল্যান্ড। যুক্তরাজ্যেও একমাত্র ইংল্যান্ডের ভাষাই ইংরেজি। যুক্তরাজ্যভুক্ত আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলসের ভাষা ইংরেজি নয়। তাদের প্রতিটির পৃথক ভাষা।
স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তিন পৃথক রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী জনগণের ওপর অভিন্ন পন্থায় শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা অব্যাহত রেখে শ্রেণি শোষণকেই স্থায়ী করে তুলেছে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, পাকিস্তান আন্দোলন, রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-দেশভাগ, আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সব ক্ষেত্রেই সমষ্টিগত জনগণ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু জনগণের মুক্তি অর্জিত হয়নি, জনগণের মুক্তিসংগ্রাম উপমহাদেশের খণ্ডিত তিন রাষ্ট্রেই চলছে এবং চলবে, জনগণের মুক্তি অর্জন অবধি।