সামাজিক অস্থিরতা
ড. মো. নুরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:২৫ এএম
ড. মো. নুরুল ইসলাম
জননিরাপত্তা বর্তমানে একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত। জননিরাপত্তাজনিত সংকট নিয়ে প্রতিনিয়ত জমছে নানা প্রশ্ন। তবে জননিরাপত্তাজনিত সংকটের ক্ষেত্রে যে সামাজিক অস্থিরতাই বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে, তা অনেকাংশেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। সামাজিক অস্থিরতা বলতে বোঝায় সেই পরিস্থিতি যেখানে সমাজের বিভিন্ন অংশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অসন্তোষ ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এটি একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক সমস্যা যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কারণের ফলে হতে পারে। সামাজিক অস্থিরতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব এবং সাংস্কৃতিক সংঘাত। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মূলত সাংস্কৃতিক সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার অভাব, বেকারত্বÑ এ চারটি ক্ষেত্রই বেশি অস্থিতিশীলতার প্রভাবক।

প্রথমত, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। এমনকি দেশে দীর্ঘদিনের যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে গেছে, সেটিও সামাজিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলছে। সাংস্কৃতিক সংঘাতের মূল কারণ পটপরিবর্তনের পর অধিকাংশ মানুষই নিজেদের মতাদর্শিক অবস্থান সঠিক মনে করছে। এভাবে মূলত বিভাজন বাড়ছে। সামাজিক পর্যায়ে এ বিভাজন দূর করে সবাইকে একত্র করার রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগ জরুরি। অথচ এমন কিছুই দৃশ্যমান হয়নি এখন পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক সংঘাতের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন সমাজের কিছু অংশ সম্পদে পরিপূর্ণ এবং অন্য অংশটি দারিদ্র্যপীড়িত থাকে, তখন সমাজে অসন্তোষ ও হতাশা সৃষ্টি হয়। ধনী-গরিবের এ পার্থক্য সমাজের অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য ও দ্বন্দ্বের সূত্রপাত করে। অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং বেকারত্বও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখা যায়। যখন যুবসমাজ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
রাজনৈতিক সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামাজিক অস্থিরতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ফলে সমাজে একটি বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও সংলাপের অভাব এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে মতবিরোধ সমাজে অসন্তোষের আবহ সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দেশে সামাজিক অস্থিরতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধনী ও গরিবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পার্থক্য সমাজে অসন্তোষ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে নগর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে আয় ও সুযোগের বৈষম্য সমাজে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। উচ্চমূল্যের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা দেখছি, সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট বেড়েই চলেছে। তাছাড়া শহর-মফস্বলে সামাজিক অপরাধও বাড়ছে। এর মূল কারণ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন দেশে কর্মসংস্থান গড়ার ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতাও সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতা এবং সুশাসনের অভাব সমাজে অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সমাজের আইনশৃঙ্খলা ব্যাহত করে এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এছাড়া সমাজের কিছু অংশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং তাদের অধিকারবঞ্চিত করাও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। নারীর প্রতি বৈষম্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার এবং জাতিগত বৈষম্য সমাজে অসন্তোষের জন্ম দেয়।
সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। প্রথমত. এটি সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। সামাজিক অস্থিরতার ফলে সমাজে অপরাধমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। দ্বিতীয়ত. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসাবাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং বিনিয়োগকারীরা সমাজে বিনিয়োগ করতে ভীত থাকে। এটি সামাজিক বন্ধন দুর্বল করে দেয়। সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়, যা সামাজিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত করে। দেশে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অস্থিরতা বিরাজমান রয়েছে যা স্থিতিশীলতা ও শান্তি হুমকির মুখে ফেলেছে। এ অস্থিরতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক বৈষম্য। এ ছাড়া ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাত, শ্রমিক অসন্তোষ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এসব সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে অন্যতম।
সামাজিক বৈষম্য এবং নারীর প্রতি সহিংসতাও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর প্রতি বৈষম্য, শিশুশ্রম এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা সমাজে একটি গভীর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিক্ষার অভাবও সামাজিক অস্থিরতার একটি কারণ। অনেক অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং শিক্ষার মান কম হওয়া, যুবসমাজের মধ্যে হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। শিক্ষার অভাব সমাজে অপরাধমূলক কার্যকলাপ এবং উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতার একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের অসন্তোষ এবং তাদের আন্দোলন অনেক সময়ই সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে, যা সমাজের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হলে সুশাসন, অর্থনৈতিক সমতা, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ ছাড়া নারীর অধিকার রক্ষা, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাত নিরসনেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলার জন্য কয়েকটি করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত. অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ন্যায্য বণ্টননীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তৃতীয়ত. সামাজিক বৈষম্য দূর করতে শিক্ষার প্রসার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা সমাজের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন সমাজে সমন্বয় ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সামাজিক অস্থিরতা দূর করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সমাজে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এসব সমস্যা সমাধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় করা জরুরি। কিন্তু একই সময়ে এও মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা কম। আমাদের দেশে অনিয়মই এক ধরনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে সমন্বিতভাবে সামাজিক পর্যায়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক পর্যায়ে সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রে আইন মেনে চলার প্রবণতা যেন বাড়ে সে উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকাঠামো এবং সামাজিক সংস্কৃতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে মেলবন্ধন করার কাজটি এ সময়ে কঠিন। তবু উদ্যোগ যদি অন্তত শুরু না করা যায়, তাহলে সমস্যা বেড়েই চলবে।