অর্থনীতি
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:২১ এএম
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
গত বছর অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্টের আপডেটে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে দেশে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা এও জানিয়েছে, এমনটি প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের একটি মধ্যবর্তী পয়েন্ট বা মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি ঠিকমতো না চললে প্রবৃদ্ধি কমে হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, আর খুব ভালো করলে হবে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক নিয়ামক হতে পারে দুটি বিষয়। একটি সংস্থাটির কথায় ‘উল্লেখযোগ্য’ অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হবে। অন্য বিষয়টি হলো দেশের বিভিন্ন এলাকার বন্যা, যা কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি সীমিত করে দেবে। এ কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সার্বিকভাবে কমবে, যা গত অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ অনিশ্চয়তা অনেক বেড়েছে। বিশেষত বিদায়ি সরকারের সময় অনেকেই ছিলেন ব্যবসায়ী। তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়েছে এবং দেশের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন চালু করার বিষয়ে ভাবতে হবে। বিশেষত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সক্রিয় করতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে তা কাটানো গেলেই ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের পথে হাঁটবেন। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। যেকোনো অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা অর্থ লগ্নি করেন না। আর এ অনিশ্চয়তার পেছনে একটি বড় প্রভাবক আর্থিক খাতের দীনতা। টাকার মেকানিজম হলো, যখন দেনা বাড়বে তখন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এমন সময়ে যদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই অর্থের তারল্যসংকট থাকে তাহলে দেনা দেওয়ার সুযোগও হয় না। দেশের আর্থিক খাত অনেকাংশে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এ ভঙ্গুর ব্যবস্থায় অনেক ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, বিষয়টি এমন নয়। ব্যাংকে তারল্যের সংকট তৈরি হয়েছে কারণ গ্রাহক ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা ব্যাংকে লেনদেন করার বিষয়ে মন মানাতে পারছে না। এমন হওয়ায় বিনিয়োগ কমছে। কারণ আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকই একমাত্র বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অথচ ব্যাংকের কতিপয় অসাধুর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এখন দেশে ব্যাংক খাতের এই দীনতা দৃশ্যমান।
দেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাত বাদে আরও তিনটি ক্ষেত্র থেকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রথমত. আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যার কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি সমঝোতার পরও যা চলমান রয়েছে। দ্বিতীয়ত. আর্থিক খাতের দুর্বলতা, যা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তৃতীয়ত. জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা। অর্থনীতির সাম্প্রতিক শ্লথ গতি অবশ্য হঠাৎ আসেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্লথ হতে শুরু করে, যে ধারা চলতি বছরে আরেকটু জোরদার হতে পারে। অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখে যেসব দেশি প্রতিষ্ঠান, তারা জানাচ্ছে, টানা তিন মাস ধরেই সংকোচনের ধারায় রয়েছে অর্থনীতি।
অর্থনীতির মূল চারটি খাতের ভিত্তি কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা। দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে কেবল উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের ধারায় ফিরেছে। বাকি তিনটি খাত সংকোচনের ধারায় ছিল। অর্থাৎ সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা ‘যথেষ্ট খারাপ’। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, দুর্নীতি, প্রবৃদ্ধির হিসাবে গরমিলের কারণে অর্থনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হচ্ছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাত রাইস (চাল অর্থাৎ কৃষি), রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) ও আরএমজি (তৈরি পোশাক)। এগুলো কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে পুঁজির ব্যবস্থা করতে হবে। সারের যাতে ঘাটতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আর কর্মীদের বিদেশগমন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া দেশের আরেক সম্ভাবনাময় খাত আইটিকে জাগ্রত করতে হবে। আইটি খাতে অনেক দক্ষ ও পরিশ্রমী ব্যক্তি রয়েছে। তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য সরকারি সুযোগসুবিধা বাড়াতে হবে।
যেমনটি বলা হয়েছে, অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা এখন উৎপাদন খাতে। নানা রকম উদ্যোগের পরও সবচেয়ে বড় রপ্তানি শিল্প পোশাক খাতে উৎপাদনব্যবস্থা এখনও ভঙ্গুর রয়ে গেছে। জুলাই থেকে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের পোশাকশিল্প এলাকা শ্রমিক বিক্ষোভ দেখছে। সম্প্রতি পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও তা টেকসই হয়েছে কি না এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ পোশাকশিল্পের মালিকদের সমিতি জানিয়েছে, তাদের উৎপাদন ও রপ্তানিতে যেমন ক্ষতি হয়েছে, তেমনই কিছু ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে গেছে। এমনটি মূলত সামান্য কদিনের উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে। কারণ, যারা ক্রেতা তারাও এক ধরনের শঙ্কা থেকে বিকল্প বাজারের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এ শঙ্কা কাটিয়ে আবার ক্রেতার আগ্রহ ফেরানোর জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় দাম কমাতে হয়। এমনটি অবশ্যই ভালো বার্তা নয়। বিশেষত এই সময়ে।
আমরা দেখছি, অর্থনীতির সংস্কার কার্যক্রমে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। আবার বিজনেস রেডির কোনো কোনো সূচকে বাংলাদেশ এমনকি নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে আছে। আছে নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কখন কী নিয়ম চালু করবে, তার নিশ্চয়তা থাকে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এমনকি বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে জননিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কা বাড়ছে সেখানে বাজার তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বেশি সহায়তা দিতে পারে না।
পতিত সরকার চলতি বছর ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে বিশ্বব্যাংক আগেই তা অর্জনযোগ্য নয় বলে জানিয়েছিল। গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের জন্য সংস্থাটি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এখন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও বেশ খানিকটা কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনল। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরা যে বার্তা দিচ্ছিলেন তা অনেকাংশেই তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে বলা। বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। তারই ফল এখন দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বিশ্বব্যাংক দেশের অর্থনীতির জন্য চারটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো মূল্যস্ফীতি, যা কিছুটা কমলেও উচ্চহারে থাকবে; বহিঃস্থ খাতের চাপ, যার মূল কারণ প্রয়োজনের তুলনায় কম রিজার্ভ; আর্থিক খাতের দুর্বলতা, যা দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কাজ করছে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক গতিপথ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কেবল বাড়ছেই। যদি অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায় এবং প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত পক্ষে থাকে, তাহলে চলতি অর্থবছরে হয়তো ৫ শতাংশের একটু বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, তাকে ব্যবহার করে যদি একটি কাম্য পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। চলতি অর্থবছরের সমস্যাগুলো থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে আগামী বছর অর্থনীতিতে আবার চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবেÑ এটা আমরা আশা করতে পারি। কিন্তু তার জন্য আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। এ ধরনের সংস্কারের মাধ্যমেই মূলত সংকট সমাধান করতে হবে। বিভিন্ন খাতে বাড়তি মনোযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।