বিচারক নিয়োগ
কাজী লতিফুর রেজা
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:১৭ এএম
আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:২২ এএম
কাজী লতিফুর রেজা
দেশে দীর্ঘদিন বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়, বিশেষত উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ ছিল। এক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও যোগ্য বিচারক নিয়োগের কাঠামো সুসংহত ও বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যদিও অধ্যাদেশটি যুগান্তকারী, তবে এটি বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা পুরোপুরি দূর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। একে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে সংবিধানসম্মত ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ যেমন জরুরি তেমনি বিচারপতি নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট করাও জরুরি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার স্বার্থে এ অধ্যাদেশ আরও গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বিভিন্ন সময় নীতিমালা বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের দাবি উঠেছে। সম্প্রতি অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মতোই ২০০৮ সালের ১৬ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করে সুপারিশের উদ্দেশ্যে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ’ গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এই অধ্যাদেশটি সংসদে পাস হয়নি।

অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এ কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই ও প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘পরামর্শ’ শব্দটি নিছক আভিধানিক অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা জানি, জুডিসিয়াল স্কিমে শব্দটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শব্দটি অবশ্যই সাংবিধানিক ও বিচার বিভাগীয় ধ্যানধারণায় পড়তে ও বুঝতে হয়। তবে এটি অর্থবহ ও কার্যকর হবে। এজন্য অধ্যাপক শাহ আলমের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রস্তাব করেন, ‘রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতির পরামর্শ চাওয়া এবং প্রধান বিচারপতির পরামর্শ প্রদান প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ ও লিখিতভাবে যাতে তার ওপর সামাজিক পর্যবেক্ষণ সম্ভবপর হয়।’ যাতে জাজেস কলিজিয়াম ব্যবস্থা ও তার সুপারিশ রাষ্ট্রপতির গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীন অবস্থা দেখা না দেয়।
অধ্যাদেশ-২০২৫-এর ধারা-৬ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৪(২) ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক উপযুক্ত বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করবেন। তবে ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যা’ কত হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এখানে প্রশ্ন নিশ্চিতভাবে দেখা দেবে ‘প্রয়োজন এবং ‘সংখ্যা’ কে এবং কীভাবে নির্ধারণ করবে, কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে। যদিও অধ্যাদেশ অনুসারে কাউন্সিলকে নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু কীভাবে এবং কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে উচ্চ আদালতের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক, তা নিশ্চিতভাবে অস্পষ্ট। যদিও পাশের
দেশ ভারতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। এমনকি যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াতেও সংসদ বিচারকের সংখ্যা নির্ধারিত করে দিয়ে থাকে।
বর্তমানে জারিকৃত অধ্যাদেশে বিচারক নিয়োগের পূর্বশর্তে এখনও অস্বচ্ছতা রয়েছে। সংবিধানের ৯৫ এবং অধ্যাদেশের ধারা-৬-এ বিচারক হিসেবে ন্যূনতম যোগ্যতার বিমূর্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; যা কোনোভাবে আগের সাংবিধানিক অভাব পূরণ করেনি। সংবিধানে শুধু ১০ বছর আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার ন্যূনতম নির্ধারিত। যদিও ১০ বছর গাণিতিকভাবে অপর্যাপ্ত মনে হওয়ার কারণ, দীর্ঘদিনের বিস্তৃত অনিয়ম। তাই ১০ বছরকে বিচারিক বন্দোবস্তে ১০ বছর বুঝতে হবে। বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ২০০৮ সালে ১০ বিচারক মামলায় বলেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট হিসেবে ১০ বছরের গণনা নিছক এনরোলমেন্টের তারিখ গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।’ ওই বেঞ্চ অভিমত দেন, ‘বিচারক পদপ্রার্থীদের আপিল বিভাগে অবশ্যই দুই বছর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত।’ বছর গণনায় প্রতিবেশী ভারতের অভিজ্ঞতা ও ১০ বিচারক মামলার রায় অনুসরণ করা উচিত। যদিও অধ্যাদেশটি এ অস্বচ্ছতা রেখে পাস হয়েছে।
আসলে ১০ বছরে জেলা জজ হওয়ার নজির প্রায় কল্পকষ্ট। সেখানে ১০ বছরে নিম্ন আদালতে বিচারক হিসেবে অভিজ্ঞতায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার ন্যূনতম মাপকাঠি রাখা বাস্তবতা অস্বীকার করার শামিল। বর্তমান অধ্যাদেশ অবাস্তবতা দূর করেনি। এ ছাড়া ১০ বছরের গণনায় শুধু বিচারক হিসেবে কার্যকাল হিসাব করা উচিত। কোনোভাবে অন্য সরকারি সংস্থায় প্রশাসনিক কার্যকাল নয়। বর্তমান আইনটিতেও অতীতের এ অস্বচ্ছতা রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কাউন্সিলের সদস্যপদে আইনের অধ্যাপক বা বিশেষজ্ঞদের সুযোগ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে উদ্যোগটি অসাধারণ ও প্রশংসনীয়। তবে শর্ত সাপেক্ষে বিচারপতি নিয়োগে আইনের অধ্যাপক বা বিশেষজ্ঞদেরও আনা উচিত। অনুচ্ছেদ ৯৫(২)(গ) অনুযায়ী নতুন আইটিতে এটি সংযোজন করা যেতে পারে। যদিও সুপ্রিম কোর্ট বিচার পরিচালনায় আইনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি না থাকলে বিচারকার্য পরিচালনা কঠিন। আইন কমিশনের তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক শাহ আলম প্রস্তাব করেছিলেন, শর্ত সাপেক্ষে প্রথিতযশা, আইন বিশেষজ্ঞ ও আইনের অধ্যাপকদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে তার পরামর্শ অভিনব হলেও একেবারে দৃষ্টান্তহীন নয়। যুক্তরাজ্যে বিচারপতি লর্ড সুম্পশন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন।
প্রার্থী বিবেচনায় প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ছাড়াও গবেষণার অভিজ্ঞতা, গবেষণাকর্ম কাউন্সিলের বিবেচনার হাতে ছেড়ে না দিয়ে ন্যূনতম মান ঠিক করে দেওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগে ক্ষেত্রে সব সময় আইনজীবীদের প্রাধান্য থাকে। তবে আইনজীবী ও বিচারকের মধ্য থেকে নিয়োগে একটা সমানুপাতিক
হার নিশ্চিত করা উচিত। জেলা জজ বা সমপর্যায়ের জজদের থেকে
বিচারক নিয়োগ করলে তাদের বিচারিক অভিজ্ঞতা সুপ্রিম কোর্টকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৯৮ মতে এবং সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি সত্ত্বেও এক বা একাধিক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি অনধিক দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারক নিযুক্ত করতে পারবেন, কিংবা তিনি উপযুক্ত বিবেচনা করলে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বিচারককে যেকোনো অস্থায়ী মেয়াদের জন্য আপিল বিভাগের আসন গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে এ সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীন বিচারকরূপে নিযুক্ত হতে কিংবা বর্তমান অনুচ্ছেদের অধীন আরও এক মেয়াদের জন্য অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত হতে বর্তমান অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই নিবৃত্ত করবে না। এ ব্যবস্থার বিধানগুলো বিচার বিভাগীয় পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভবিষ্যতের স্থায়ীকরণের মানবিক দুর্বলতা এড়িয়ে, এত উচ্চ পর্যায়ের নিয়োগ স্থায়ীভাবে হওয়া উচিত।
কাউন্সিল গঠনে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে দুই ভাগে দুজন বিচারক থাকবেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, যা কোনোভাবে যৌক্তিক হতে পারে না। এ ছাড়া রেজিস্ট্রার জেনারেলকে করা হয়েছে কাউন্সিলের সদস্য সচিব। তিনি প্রার্থী হলে সেখানে স্বার্থগত সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অনিয়ম দূরীকরণে মুক্ত আবেদনে অধ্যাদেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কাউন্সিল নিজ উদ্যোগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে যেকোনো মানুষ, যেকোনো আইনজীবী যাতে নিজের ইচ্ছায় আবেদন বা কারও নাম প্রস্তাব করতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে। তবে প্রক্রিয়াটি আর স্বচ্ছ ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ন্যূনতম যোগ্যতা ও শূন্যপদের সংখ্যা উল্লেখপূর্বক প্রার্থীর আবেদন আহ্বান করার সুযোগ রাখা যুক্তিযুক্ত। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ; যা নীতিগতভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, যোগ্য ও দক্ষ বিচারক মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে অধ্যাদেশটি এখনও কিছু পূর্ববর্তী সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করেনি। যেমন ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যা’ নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই, বিচারকের ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ডের আগের অস্পষ্টতা বহাল রয়েছে এবং যেখানে উন্নত বিশ্ব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার সুযোগ রয়েছে।
অধ্যাদেশটি যুগান্তকারী হলেও এটি বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বহাল রেখে বিচারক নিয়োগ সঠিকভাবে সম্পন্ন করবে কি না, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। একে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে সংবিধানসম্মত ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বিচারপতি নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট করা জরুরি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার স্বার্থে এ অধ্যাদেশের প্রয়োগ ও ভবিষ্যৎ সংস্কারের বিষয়ে আরও গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।