সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩০ এএম
সারা দেশে সরকারিভাবে ধান ও সেদ্ধ চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে ১৭ নভেম্বর। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এবার গত বছরের চেয়ে কেজিপ্রতি ৩ টাকা দাম বাড়িয়ে ১০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সংগ্রহের গতি এতটাই ধীর যে, বেশিরভাগ সরকারি গুদামের সংগ্রহ হতাশাজনক। দেশের কোনো গুদামেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ধান-চাল ঢোকেনি। জানা গেছে, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৫ টন। প্রায় দুই মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যের এক-তৃতীয়াংশও সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার। কৃষকের ধান সরবরাহে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে জটিলতা, মাঠপর্যায়ে প্রচারের অভাব, সর্বোপরি ধান উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দামের অসঙ্গতিতেই সংগ্রহ অভিযান সফল করা যাচ্ছে না।
দেখা যাচ্ছে, কোনো কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে চাইলে তাকে প্রথমে কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে আবেদন করতে হবে। একবার নিবন্ধন করলে পরবর্তী সময়ে প্রতিবার আবেদন করতে হয়। আবেদনের পর অনলাইনে লটারি হয়। লটারিতে নাম এলেই কেবল সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কৃষক। সমস্যাগুলোর পাশাপাশি রয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে চরম অবহেলা। খাদ্য অধিদপ্তর থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম তদারকির জন্য
আট বিভাগে আট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে কার্যত কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘অফিসে “পা গুটিয়ে” কর্মকর্তারা ধান-চাল সংগ্রহে ভাটা’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব প্রতিবন্ধকতার নানা চিত্র। কৃষক বলছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য খোলাবাজারের চেয়ে কম। আবার বিক্রির জন্য তাদের ধান নিজ উদ্যোগে গুদামে দিয়ে আসতে হয়। রয়েছে অনলাইন নিবন্ধন জটিলতাও। এসব বাধা ও আইন সহজ না করলে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করা তাদের জন্য কঠিন। প্রতিবেদন বলছে, সরকার ঘোষিত ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সারা দেশের চিত্র মোটামুটি একই। বেশিরভাগ খাদ্য কর্মকর্তা পা গুটিয়ে অফিসে বসে থাকছেন। আর করপোরেট কোম্পানি, চাতাল, অটোরাইস মিল ও ফড়িয়া অথবা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মাঠপর্যায় থেকে ধান কিনে নিচ্ছেন। জানা যায়, সরকারি দামের চেয়ে বাজারে প্রতি মণে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দরে ধান বিক্রি হয়। তাতে কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রির চেয়ে খোলাবাজারকেই প্রাধান্য দেন। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই ধান সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারকে কৃষকের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ধান-চাল কেনার কথা বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষক। সকল অজুহাত অগ্রাহ্য করে মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ধান ও চাল সংগ্রহের কর্মসূচিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, এ পর্যন্ত সংগ্রহের ব্যবধানটা কোনোভাবেই সুখকর বলা যাবে না। একদিকে বাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় মিল মালিকরা সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেও চাল দিচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য যাচাই না করে ওপর থেকে জোর করে ধান ও চালের দর তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, চাল সংগ্রহ অভিযান নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। খাদ্য উপদেষ্টা সম্প্রতি বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ অভিযান চলবে, এ সময়ের মধ্যেই টার্গেট অনুযায়ী সংগ্রহ চূড়ান্ত হবে।
ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে খাদ্য খাতে একটা সংকট তৈরি হবে বৈকি। তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হচ্ছে না কেন? কেন সংগ্রহে এ বিপত্তি। সমস্যাটা কোথায় তা চিহ্নিত করা দরকার। কোনো কোনো এলাকায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে হলে খাদ্য কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও উঠছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন অবহিত কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। উঠে আসছে সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার শিডিউলগত ভোগান্তির কথাও। দেখতে হবে এখানে সমন্বয়ের কোনো ঘাটতি ছিল কি না? ক্রয় অভিযানে সেদ্ধ চালের দাম প্রতি কেজি ৪৭, আতপ ৪৬ আর ধানের দাম ৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬০ টাকায়। তাহলে মিল মালিকরা বেশি দাম দিয়ে কিনে লোকসান গুনে সরকারকে চাল দিতে যাবেন কেন? আসলে ধান-চালের দাম নির্ধারণের আগে কৃষকের উৎপাদন খরচসহ এসব বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার ছিল। মনে রাখতে হবে, এ সংগ্রহ অভিযানে গতি আনতে না পারলে ভরা মৌসুমে সরকারের খাদ্য মজুদ বাড়ানো কঠিন হবে। আর ধান-চালের অভ্যন্তরীণ মজুদ না বাড়ালে আপদকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এতে ভিন্ন সংকটও দেখা দিতে পারে। তাই জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে ধান-চাল সংগ্রহের ভাটা কাটাতে হবে।