× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস

বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জরুরি

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:২৭ এএম

আনু মুহাম্মদ

আনু মুহাম্মদ

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সংগত কারণেই এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। ইতোমধ্যে সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পূরণ করছে। ফলে সংগতভাবেই সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের করণীয় কাজগুলো কী ছিল এবং তা বাস্তবায়নে সরকারের সফলতা কতটুকু, তাও আলোচনায় থাকা জরুরি। পরিবর্তিত যে প্রেক্ষাপটে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে প্রধান চারটি কাজ করণীয় ছিল। এর প্রথমটি গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে জরুরি ছিল আহত-নিহতদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা। বিশেষত আহত যারা এখনও হাসপাতালের বিছানায় তাদের জন্য সরকারি খরচে চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই কাজটিই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অন্যতম। আহত ও নিহতদের বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কারণ তাদের অধিকাংশেরই পরিবার অসচ্ছল কিংবা দরিদ্র। কিন্তু এক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা দেখা দিয়েছে বিধায় আহতদের মধ্যেও নানা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও করছেন। অথচ এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। 

শুধু আহতরাই নয়, গণঅভ্যুত্থানে অনেক পরিবার তাদের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন অসহায়। আবার আহতদের অনেকের পরিবারে কর্মজীবী মানুষটি এখন পঙ্গু বা চিকিৎসার অভাবে রয়েছেন। ফলে তাদের দুই ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এক্ষেত্রে গুছিয়ে আহত-নিহতদের তালিকা করে তাদের ক্ষতিপূরণ কিংবা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা, কিন্তু তা করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসে এটিই ছিল তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। কিন্তু এ কাজ এখনও সম্পন্ন করতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় দায়িত্ব ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বিশেষত জুলাই-আগস্টে গণহত্যা কিংবা সহিংসতার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল; যারা অন্যায়ভাবে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর আঘাত করেছে; তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা। অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। এমনকি বিগত বছরগুলোয় যারা অন্যায় সুবিধা নিয়েছে কিংবা দেশের সম্পদ পাচার করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা দেখছি, দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হচ্ছে। কিন্তু মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা যে তৎপরতা লক্ষ করছি, তাতে দেখা যাচ্ছে নাম না জানা অনেক মানুষকে মামলায় তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। অর্থাৎ অনেককে এজাহারভুক্ত করা হয়েছে তদন্ত না করেই। এতে ন্যায়বিচারের পথ সংকুচিত হচ্ছে সেই সঙ্গে জনদুর্ভোগও বাড়াচ্ছে। যখন সুনির্দিষ্টভাবে ও স্পষ্টভাবে নাম এজাহারভুক্ত করা হবে না, তখন মামলাগুলো দুর্বল হবে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। জুলাই-আগস্টে যারা সহিংসতা ও গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তারা বড় শাস্তির মুখোমুখি হবে না। মামলা যত দুর্বল হবে, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা তত বাড়বে। এমনটি তো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বরং মানুষ প্রত্যাশা করে, অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। গণতালিকাভুক্ত মামলার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, তারা এ মামলা দেয়নি। বিভিন্ন ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে এসব মামলা দিচ্ছে। ফলে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, যদি বিচ্ছিন্নভাবেই ব্যক্তিরা সক্রিয় থাকে, তাহলে সরকার আসলে কী করছে? যারা সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে শক্ত, স্পষ্ট এবং তাদের করা অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপনসহ মামলা ও বিচারকাজ শুরু করার বিষয়টি কোথায়? আমরা দেখছি, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 

অনেকে যারা কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তারাও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, এ সময়ে এক ধরনের আটক বাণিজ্যও চলমান। 

অন্তর্বর্তী সরকারের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তিশালী করা। যাতে করে জননিরাপত্তা উন্নত করা। তা তো হয়নি। বরং আমরা দেখছি, দেশের অনেক মানুষ নানা ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় এখনও ‘মব ভায়োলেন্স’ হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা স্থানে নির্দিষ্ট পদ দখলের জন্য মবকে উস্কে দিচ্ছে কেউ কেউÑ এমন অভিযোগও রয়েছে। স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলগত সহিংসতার মাধ্যমে পদ দখলের প্রবণতা জননিরাপত্তায় সরাসরি অভিঘাত ফেলছে। আমরা দেখছি, সংখ্যালঘু জাতিসত্তাও এক ধরনের নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে পড়েছে। বিষয়টি শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মধ্যেই নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও দুর্বল একটি অংশের ওপর সহিংসতা বাড়ছে। আমরা দেখছি, মাজার ভাঙা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধার খবরও আসছে। এসব বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তার জন্য সংকট। এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে খুন, ডাকাতি, রাহাজানিও বেড়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের দাপট বেড়েছে। এসব সমস্যা দেশের জন্য অবশ্যই বড় সংকট। 

আবার দেশের বাজারের অবস্থাও অস্থিতিশীল। মূল্যস্ফীতি রক্ষার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি মোটেও দৃশ্যমান নয়। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। সরকার যেকোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কিংবা এ বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনায় আন্তরিক, তা আমরা এখনও দেখতে পারছি না। এ চারটিই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করণীয় কাজ। কিন্তু সেই কাজগুলো যথাযথভাবে কতটা হয়েছেÑ সে প্রশ্ন তো রয়েই গেছে।

এসব প্রধান করণীয়র বাইরেও তাদের আরও কিছু কাজ রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে যেভাবে কাজ হয়েছে, সেগুলোর অসংগতি চিহ্নিত করে তার সমাধান করাও অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি দায়িত্ব ছিল। কিছু বিষয় এ সরকার সরাসরি প্রয়োগ করতে পারত না। এজন্যই তারা কিছু কমিশন গঠন করেছে এবং এসব কমিশনের মাধ্যমে তারা সংস্কার প্রস্তাবনা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে যে পরিবর্তনের সূচনা করা, এ কাজটিতেও আমরা আশাবাদী হতে পারছি না। বিগত সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল, তার সূচনাই ঘটেনি এখনও। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় নজরে পড়ে অর্থাৎ সরকারের তিন ধরনের পদক্ষেপ বলে দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বতন সরকারেরই কিছু স্বার্থ রক্ষা করছে। যেমনÑ এক অধ্যাদেশে জ্বালানি চুক্তি বাতিল করা হলেও সেখানে এও বলা হয়েছে, অধ্যাদেশের আগে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তা জারি থাকবে। অর্থাৎ দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যে চুক্তি ছিল তা অব্যাহতই থাকবে। 

এ ছাড়া দেখা গেল, কোনো কোনো উপদেষ্টা বলেছেন রামপাল বা রূপপুরের মতো প্রকল্প বাতিল করা যাবে না। এটিও হতাশাজনক। পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ এ প্রকল্পগুলো বাতিল করা সরকারের উচিত ছিল। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারেই অনেকে আছেন যারা রামপাল পরিকল্পনাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। রামপাল কতটা ক্ষতিকর এবং সেটি কীভাবে বাতিল করা যায়, এসব বিষয়ে চেষ্টা না করে সরাসরি বাতিল করা যাবে না বলে দেওয়া খুবই দুঃখজনক। তৃতীয়টি হলো, অন্তর্বর্তী সরকার এলএনজি আমদানির জন্য একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করল এবং চুক্তিটি করা হলো কোনো বাছবিচার না করেই। এমনটি উদ্বেগজনক। চুক্তিগুলো যদি আগের মতোই অব্যাহত থাকে, তাহলে যে পরিবর্তন ও সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তাতে কাজের কাজ হবে না।

ছয় মাসে একটি সরকার বিগত দিনের সব অনিয়ম-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা ঠিক করবেÑ এমনটি আমরা আশা করি না। তবে তারা উদ্যোগগুলো দৃশ্যমান করবেÑ এমনটি প্রত্যাশা করি। অন্তত তারা যে অন্য সরকার থেকে ভিন্ন, তা প্রমাণ করার সুযোগ তাদের সামনে রয়েছে। তা ছাড়া আমাদের প্রত্যাশা তারা প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করবে। এ সরকারের একটি সফলতা, তারা সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশনগুলো তাদের প্রস্তাবনা দিয়েছে। তবে সেই প্রস্তাবনাগুলো যে ভিন্ন এবং যথোপযুক্ত, সেটি প্রমাণ করতে সুপারিশগুলো জনগণের কাছে দৃশ্যমান করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনাকে ধারণ করে। ফলে তাদের কার্যক্রমে ধর্মীয়, জাতিগত, শ্রেণিগত বৈষম্য দূর করার চিত্রও প্রতিফলিত হয়ে উঠতে হবে। বৈষম্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সব উপাদানের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত। সেই সঙ্গে যেসব অসংগতি রয়েছে সেগুলো দূর করার বিষয়েও তাদের মনোযোগ জরুরি।

  • অর্থনীতিবিদ, সমাজ-বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা